আন্তর্জাতিক জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী দিবস আজ
বিশেষ প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৯ মে ২০২৪ ১৩:১৬ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে সর্বোচ্চসংখ্যক শান্তিরক্ষী পাঠানো ১১৯টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ দীর্ঘ সময় ধরে মর্যাদাপূর্ণ স্থান অক্ষুণ্ন রেখে আসছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুসারে, বাংলাদেশ ২০২০ সালের জুলাই মাস থেকে গত বছরের অক্টোবর মাস পর্যন্ত প্রথম স্থানে ছিল। তার আগেও কখনও প্রথম, কখনও দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল।
জাতিসংঘের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ৩১ মার্চ জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে শান্তিরক্ষী পাঠানো দেশগুলোর মধ্যে প্রথম স্থানে ছিল নেপাল। এ সময় মিশনে নেপালের মোট শান্তিরক্ষী ছিল ৬৮৩ নারীসহ ৬ হাজার ১২৪ জন। বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ৫০২ জন নারীসহ ৫ হাজার ৯৬১ জন শান্তিরক্ষী নিয়ে তৃতীয়। আর ভারতের অবস্থান ছিল ১২৪ জন নারীসহ ৬ হাজার ৬৩ জন শান্তিরক্ষী নিয়ে দ্বিতীয়।
সর্বোচ্চসংখ্যক শান্তিরক্ষী পাঠানো ১০টি দেশের মধ্যে নেপাল, ভারত ও বাংলাদেশের পরের অবস্থান যথাক্রমে রুয়ান্ডা, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, ঘানা, চীন, মরক্কো ও মিশরের।
দেশের জন্য এই সম্মানজনক অবস্থানে থাকার মধ্য দিয়ে আজ ২৯ মে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হতে যাচ্ছে আন্তর্জাতিক জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী দিবস। দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও জাতিসংঘ মহাসচিব বাণী দিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ১৯৮৮ সালে ইরাক-ইরানে সামরিক পর্যবেক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের অংশ নেওয়া শুরু। এরপর ৩৬ বছরে বাংলাদেশ জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রম বাস্তবায়নের এক গর্বিত অংশীদারে পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশ নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনী এই মিশনে দায়িত্ব পালন করছে ১৯৯৩ সাল থেকে। বাংলাদেশের পুলিশ সদস্যরা এ মিশনে অংশ নিচ্ছেন ১৯৮৯ সাল থেকে। ওই বছর নামিবিয়া মিশনের মাধ্যমে বাংলাদেশ পুলিশ জাতিসংঘ পরিবারের সদস্য হয়।
২০১০ সালে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ নৌবাহিনীর দুটি যুদ্ধজাহাজ লেবাননে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে যোগ দেয়। বর্তমানে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর জাহাজ ‘সংগ্রাম’ ভূমধ্যসাগরে মেরিটাইম টাস্কফোর্সের অংশ হিসেবে লেবাননে অবৈধ অস্ত্র এবং গোলাবারুদের অনুপ্রবেশ রোধ, দুর্ঘটনাকবলিত জাহাজ উদ্ধার তৎপরতাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অপারেশনাল কার্যক্রমে নিয়োজিত রয়েছে। এ ছাড়া বাংলাদেশ নৌবাহিনীর একটি নৌ কন্টিনজেন্ট ২০১৫ সাল থেকে দক্ষিণ সুদানে মোতায়েন রয়েছে। এই কন্টিনজেন্টটি জাতিসংঘের নিত্যপ্রয়োজনীয় জ্বালানি, খাদ্যসামগ্রী, ওষুধ ও মানবিক সাহায্য বহনকারী নৌযানগুলোর নিরাপদ চলাচলের নিশ্চয়তা দিতে কাজ করছে। পাশাপাশি স্থানীয় জনগণকে জরুরি চিকিৎসা দেওয়া, মিশনে নিয়োজিত সামরিক এবং অসামরিক সদস্যদের রসদ সামগ্রী পরিবহনে সহায়তা করে আসছে।
বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর তিনটি স্বতন্ত্র কন্টিনজেন্ট জাতিসংঘের দুটি অঞ্চলে নিয়োজিত আছে। এর মধ্যে ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোতে (ডিআর কঙ্গো) এমআই সিরিজ হেলিকপ্টারসহ একটি ইউটিলিটি এভিয়েশন ইউনিট ও সি-১৩০ পরিবহন বিমানসহ একটি এয়ার ট্রান্সপোর্ট ইউনিট এবং সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিকে এমআই সিরিজ হেলিকপ্টারসহ একটি বাংলাদেশ আর্মড মিলিটারি ইউটিলিটি হেলিকপ্টার ইউনিট মোতায়েন রয়েছে। এ ছাড়া জাতিসংঘের চলমান শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বিমানবাহিনীর সদস্যরা স্টাফ অফিসার এবং মিলিটারি অবজারভার হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।
বাংলাদেশ পুলিশ সূত্র জানায়, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে এ পর্যন্ত পুলিশের ২১ হাজার ৪৪৪ জন সদস্য তাদের দায়িত্ব সম্পন্ন করেছেন। এর মধ্যে নারীর সংখ্যা ১ হাজার ৮০৩ জন। বর্তমানে ৩১৮ জন নারীসহ মোট ৩৭১ জন পুলিশ সদস্য শান্তিরক্ষা মিশনে দায়িত্ব পালন করছেন।
আইএসপিআর জানায়, বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা বিশ্বের ৪৩টি দেশ ও স্থানে ৬৩টি জাতিসংঘ মিশন সফলতার সঙ্গে সম্পন্ন করেছেন। এসব মিশনে সর্বমোট ১ লাখ ৯৪ হাজার ৮৫৬ জন শান্তিরক্ষী দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে ১৩টি দেশে বাংলাদেশের ৪৯৩ জন নারীসহ ৬ হাজার ৯২ জন শান্তিরক্ষী জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে ও কার্যক্রমে নিয়োজিত আছে। শুরু থেকে এ পর্যন্ত জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের ১৬৮ জন শান্তিরক্ষী শহীদ হয়েছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন সেনাবাহিনীর ১৩১ জন, নৌবাহিনীর ৪ জন, বিমানবাহিনীর ৯ জন এবং পুলিশের ২৪ জন। আহত হয়েছেন ২৬৬ জন। এ বছর তিনজন আহত শান্তিরক্ষীকে সম্মাননা দেওয়া হচ্ছে।
দিবসের কর্মসূচি
আইএসপিআর জানায়, বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও আজ বুধবার আন্তর্জাতিক জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী দিবস যথাযোগ্য মর্যাদায় পালন করা হবে। সকালে শান্তিরক্ষীদের স্মরণে ‘শান্তিরক্ষী দৌড়-২০২৪’-এর মাধ্যমে দিবসের কর্মসূচি শুরু হবে। বেলা ১১টায় বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে শহীদ শান্তিরক্ষীদের নিকটাত্মীয় ও আহত শান্তিরক্ষীদের সংবর্ধনা এবং জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের ওপর বিশেষ উপস্থাপনার আয়োজন করা হবে। সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন। বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বিটিভি ওয়ার্ল্ড অনুষ্ঠানটি সরাসরি সম্প্রচার করবে।
দিবসটির তাৎপর্য তুলে ধরার লক্ষ্যে বিশেষ জার্নাল ও জাতীয় দৈনিকসমূহে বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশিত হবে। বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ বেতারসহ বিভিন্ন বেসরকারি চ্যানেলে বিশেষ টকশো প্রচারিত হবে। শান্তিরক্ষায় বাংলাদেশের কার্যক্রমের ওপর নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র বাংলাদেশ টেলিভিশনসহ অন্যান্য বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে প্রচারের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত থাকবেন মন্ত্রিপরিষদের সদস্যরা, বাংলাদেশে নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনাররা, বাংলাদেশে নিযুক্ত জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারী, তিন বাহিনীর প্রধানরা, সংসদ সদস্যবৃন্দ, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার (পিএসও), পুলিশের মহাপরিদর্শক, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বসহ ঊর্ধ্বতন সামরিক ও অসামরিক কর্মকর্তারা।