প্রতীকী ছবি
একটি স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্রের পতন সব সময় বাহ্যিক যুদ্ধ, মহামারি, দুর্ভিক্ষ কিংবা আকস্মিক কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ দিয়ে শুরু হয় না।
ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, একটি সমাজ বা জাতির সবচেয়ে বড় ও দীর্ঘমেয়াদি সংকটটি তখনই সূচিত হয়, যখন তার অবয়বজুড়ে আদর্শের জায়গা দখল করে নেয় স্থূল সুবিধাবাদ; সামষ্টিক নীতির জায়গায় জেঁকে বসে অন্ধ ব্যক্তিস্বার্থ, আর জনকল্যাণের সুমহান ব্রতের পরিবর্তে কেবলই ক্ষমতা রক্ষা কিংবা ক্ষমতার অলিন্দে প্রবেশ করাটা হয়ে ওঠে রাজনীতির প্রধানতম ব্যাকরণ। ইতিহাস আরও সাক্ষ্য দেয়Ñ যে সমাজে নৈতিকতার মানদণ্ড দুর্বল হয়ে পড়ে, সেখানে রাষ্ট্রের মৌলিক প্রতিষ্ঠানগুলোও ধীরে ধীরে তাদের কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলে। আর যখন একটি রাষ্ট্রের রেগুলেটরি প্রতিষ্ঠানগুলো ভেঙে পড়ে, তখন তার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ খেসারত দিতে হয় সাধারণ নাগরিককে। এর ফলে শুধু যে রাজনীতি কলুষিত হয় তা নয়, বরং রাষ্ট্রীয় অর্থনীতি, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এক চরম অনিশ্চয়তার দিকে ধাবিত হয়।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাস মূলত এক সুদীর্ঘ আত্মত্যাগ ও গৌরবময় সংগ্রামের ইতিহাস। ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং পরবর্তী সময়ে নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, ২০২৪-এর জুলাই গণঅভ্যুত্থানসহ প্রতিটি ঐতিহাসিক মোড়ে এদেশের সাধারণ মানুষ, ছাত্র ও মেহনতি জনতা অকাতরে রক্ত দিয়েছে, নিজের জীবন বিলিয়ে দিয়েছে। তাদের এই আত্মত্যাগের মূল উদ্দেশ্য ছিল একটি সাম্যবাদী, মানবিক, বৈষম্যহীন এবং জবাবদিহিতামূলক স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। যেখানে প্রতিটি নাগরিক তার মৌলিক অধিকার নিয়ে মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারবে। কিন্তু স্বাধীনতার এতগুলো বছর পেরিয়ে এসে আজ যখন আমরা পেছনে তাকাই, তখন অত্যন্ত প্রাসঙ্গিকভাবেই একটি প্রশ্ন আমাদের বিবেককে তাড়িত করেÑ আমাদের সেই আজন্ম লালিত স্বপ্নের ঠিক কতটুকু আমরা বাস্তব রূপ দিতে পেরেছি?
আজকের বাংলাদেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক বাস্তবতার দিকে তাকালে অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে এমন একটি সর্বগ্রাসী সংস্কৃতি ক্রমশ দৃশ্যমান হয়ে উঠছে, যেখানে ব্যক্তি ও দলীয় সমীকরণ অনেক সময় রাষ্ট্রের মৌলিক নীতি ও সামষ্টিক আদর্শের চেয়ে বহুগুণ বড় হয়ে দাঁড়ায়। ক্ষমতার এই পালাবদলের খেলায় আদর্শিক অবস্থান রাতারাতি বদলে ফেলা, দীর্ঘদিনের লালিত রাজনৈতিক বিশ্বাসকে ক্ষমতার গুটি হিসেবে ব্যবহার করা, দূরদর্শী নীতির চেয়ে তাৎক্ষণিক সুবিধার হিসাবকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং মেধা ও যোগ্যতার পরিবর্তে অন্ধ আনুগত্যকে মূল্যায়নের মাপকাঠি বানানোÑ এসব ক্ষতিকর প্রবণতা নিয়ে আমাদের নাগরিক সমাজ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা দীর্ঘদিন ধরেই গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছেন। সবচেয়ে বড় সত্য হলো, এটি কোনো একক রাজনৈতিক দল, নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা নির্দিষ্ট শাসনকালের একচ্ছত্র সমস্যা নয়; বরং এটি আমাদের সামগ্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি গভীর ও দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত দুর্বলতা।
রাজনীতি তখনই একটি রাষ্ট্রের জন্য কল্যাণকর এবং শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে, যখন তার তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক মতাদর্শ থাকে পাহাড়ের মতো দৃঢ়, কিন্তু তার আচরণ ও কর্মপদ্ধতি হয় পুরোপুরি গণতান্ত্রিক ও সহনশীল। কিন্তু যদি আদর্শ কেবলই বক্তৃতার জাঁকজমকপূর্ণ মঞ্চ, নির্বাচনী ইশতেহারের চকচকে পাতা কিংবা টকশোর আলোচনার টেবিলেই সীমাবদ্ধ থাকে, আর পর্দার আড়ালের বাস্তব সিদ্ধান্তগুলো যদি কেবলই ক্ষমতার অন্ধ সমীকরণ আর সংকীর্ণ গোষ্ঠীস্বার্থ দিয়ে পরিচালিত হয়, তাহলে রাষ্ট্র পরিচালকদের ওপর থেকে সাধারণ জনগণের আস্থা ধীরে ধীরে ক্ষয় হতে বাধ্য, যা একটি টেকসই রাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে বড় বিপর্যয়ের সূত্রপাত করতে পারে।
বিশ্বের সফল ও উন্নত রাষ্ট্রগুলোর ঐতিহাসিক অগ্রগতির ধারা যদি আমরা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করি, তাহলে একটি পরম সত্য অত্যন্ত স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়Ñ তাদের এই অভাবনীয় সাফল্যের মূল ভিত্তি কোনো একক ব্যক্তি বা জাদুকরী নেতৃত্ব ছিল না, বরং তার মূল কারিগর ছিল রাষ্ট্রের স্বাধীন ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানসমূহ। সেসব দেশে ক্ষমতার হাতবদল হয়, নিয়মিত সরকার পরিবর্তিত হয়, কিন্তু রাষ্ট্রের মৌলিক পররাষ্ট্রনীতি, অর্থনৈতিক ধারাবাহিকতা, প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসন এবং আইনের শাসন কখনও এক চুলও টলে না। কিন্তু আমাদের মতো উন্নয়নশীল রাষ্ট্রে যখন প্রতিটি সাংবিধানিক ও প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক চশমা দিয়ে দেখার এবং প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করা হয়, তখন স্বভাবতই সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা ও সামগ্রিক পেশাদারত্ব নিয়ে জনমনে প্রশ্ন দেখা দেয়। এর প্রত্যক্ষ নেতিবাচক প্রভাব পড়ে রাষ্ট্রের সবচেয়ে সংবেদনশীল স্তম্ভগুলোর ওপর।
যখন একজন সাধারণ নাগরিক তার চারপাশের সমাজকে পর্যবেক্ষণ করে দেখে যে, সততা ও নীতিতে অটল থাকার চেয়ে সাময়িকভাবে নিজের অবস্থান বা রঙ বদলে নেওয়াটা অনেক বেশি লাভজনক, তখন সমাজে ধীরে ধীরে একটি মারাত্মক ভুল এবং বিষাক্ত বার্তা প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়Ñ ‘যদি তোমাকে সফল হতে হয়, তবে আদর্শের নয়, সুবিধাজনক ক্ষমতার পাশে দাঁড়াতে হবে।’ এই মানসিকতা যখন প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে সেবে ছড়িয়ে পড়ে, তখন রাষ্ট্রের সামগ্রিক নৈতিক ভিত্তিটি তাসের ঘরের মতো দুর্বল হয়ে যায়।
এই জটিল ও সংকটময় জাতীয় বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আমাদের আজ সবচেয়ে বড় প্রয়োজন সস্তা কাদা ছোড়াছুড়ি কিংবা অন্ধ দোষারোপের সস্তা রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে একটি নির্মোহ আত্মসমালোচনার সংস্কৃতি চালু করা। কেবল এক দল অন্য দলকে ব্যর্থ, সুবিধাবাদী কিংবা বেইমান বললেই সংকটের প্রকৃত সমাধান কোনোদিন হবে না। বরং দেশের প্রতিটি রাজনৈতিক শক্তি, নাগরিক সমাজ এবং নীতিনির্ধারকদের নিজেদের বিবেকের কাছে প্রশ্ন তুলতে হবেÑ আমরা কতটা গণতন্ত্র চর্চা করছি? আমাদের প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্তগুলো কতটা স্বচ্ছ এবং আমরা ব্যক্তি ও দলের ঊর্ধ্বে উঠে মেধা ও যোগ্যতাকে কতটা মূল্যায়ন করছি? এই আত্ম-অনুসন্ধান ছাড়া আমাদের মুক্তির আর কোনো বিকল্প পথ নেই।
বাংলাদেশের আজকের এই তরুণ প্রজন্ম এক উন্মুক্ত তথ্যপ্রযুক্তির যুগে বড় হচ্ছে। তারা বৈশ্বিক উন্নয়ন দেখছে, তারা অধিকারের সীমানা বোঝে। তারা প্রাচীন ধ্যানধারণার বশবর্তী হয়ে অন্ধ অনুকরণ করতে রাজি নয়; তারা প্রশ্ন করতে জানে, তারা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে তুলনা করতে জানে এবং তারা রাষ্ট্রের কাছে তাদের ন্যায্য অধিকারের হিসাব ও জবাব চায়। এই বিপুল যুবশক্তিকে যদি আমরা একটি সুশাসনভিত্তিক, ন্যায়বিচারপূর্ণ, মেধা ও সততার সুস্থ পরিবেশ উপহার দিতে না পারি, তাহলে রাষ্ট্র তার ইতিহাসের সবচেয়ে মূল্যবান ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বা জনমিতিক লভ্যাংশ চিরতরে হারাবে।তবে আমরা যদি তাদের সৃজনশীলতা ও দেশপ্রেমকে সঠিকভাবে কাজে লাগানোর মতো একটি উন্মুক্ত ও বৈষম্যহীন প্লাটফর্ম তৈরি করে দিতে পারি, তাহলে সুবিধাবাদের অবসান ঘটিয়ে তারা আগামী দিনের সবচেয়ে বড় ও অপরাজেয় শক্তি হয়ে উঠতে পারে।
আমাদের আশার মূল জায়গাটিও ঠিক এখানেই। মানুষের সম্মিলিত আকাঙ্ক্ষা কোনোদিন পরাস্ত হয়নি এবং ইতিহাসের পাতায় কোনো দীর্ঘস্থায়ী অন্ধকারই শেষ পর্যন্ত জেতেনি। তবে সেই কাঙ্ক্ষিত বিজয় তখনই আসবে, যখন দেশের সচেতন নাগরিক, প্রধান রাজনৈতিক দলসমূহ সবাই সাময়িক সুযোগ বা সুবিধাকে পরিহার করে নীতি ও নৈতিকতাকে সর্বোচ্চ আসনে স্থান দিতে শিখবে। সুবিধাবাদের পিঠে চড়ে হয়তো সাময়িকভাবে ক্ষমতার সর্বোচ্চ শিখরে আরোহণ করা যায়, কিন্তু কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে ভালোবাসার স্থায়ী আসন লাভ করা যায় না। ইতিহাসের নির্মম বিচার হলো, আত্মস্বার্থে বিভোর হয়ে জাতির সঙ্গে যারা বেঈমানি করবে, প্রকৃতির নিয়মে একদিন জনসমক্ষে তা উন্মোচিত হবে। সেদিন ইতিহাসের কাঠগড়ায় সবচেয়ে বড় ও অমোঘ প্রশ্নটি হবেÑ কে তার নীতি দিয়ে রাষ্ট্র ও সমাজকে কতটা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শক্তিশালী করেছে, আর কে নিজের ক্ষণস্থায়ী ব্যক্তিস্বার্থ ও সুবিধাবাদের জন্য রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি ও নৈতিকতাকে দুর্বল করেছে।
বাংলাদেশ আজ এক নতুন সময় পার করছে। সময় এসেছে দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে নবতর এক রাজনৈতিক ও সামাজিক সংস্কৃতির বিকাশ ঘটানোর। অন্ধ দলীয় আনুগত্য নয়, ব্যক্তির প্রকৃত যোগ্যতা ও মেধা সর্বোচ্চ মূল্য পাবে; আর সস্তা সুবিধাবাদ নয়, সুদৃঢ় নীতি ও নৈতিকতাই হবে জাতীয় নেতৃত্বের একমাত্র পরিচয়।
লেখক:জাহিদ ইকবাল (সাংবাদিক ও সভাপতি, বাংলাদেশ অনলাইন জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন-বিওজেএ)