ফাইল ফটো
গত মাসে আমেরিকার একটি মাসিক প্রকাশনায় তৈরি পোশাক রপ্তানির ওপর একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে, যেখানে উল্লেখ করা হয়েছে যে আমেরিকার বাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশ দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছে। এই সময়ে বিষয়টি নিঃসন্দেহে খুশির খবর হবে, এটাই স্বাভাবিক। কেননা তৈরি পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে আমেরিকা সবচেয়ে বৃহত্তম বাজার।
আর সেই বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানিতে দ্বিতীয় স্থানে উঠে আসা আমাদের দেশের অর্থনীতির জন্য খুব ভালো বার্তাই বয়ে আনার কথা। কিন্তু সংবাদটা শুনতে যতটা ভালো লেগেছে, বাস্তবে ততটা খুশি হওয়ার মতো নয়। কেননা আমেরিকার বাজারে বাংলাদেশে তৈরি পোশাক রপ্তানির পরিমাণ প্রকৃত অর্থে হ্রাস পেয়েছে।
প্রকাশিত আমেরিকার সেই মাসিক প্রকাশনার তথ্য অনুযায়ী এ বছর জানুয়ারি এবং ফেব্রুয়ারি মাসে আমেরিকার বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির পরিমাণ ছিল ১.৩৭ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারির তুলনায় ৮.৫৩% কম। মোট রপ্তানির পরিমাণ হ্রাস পাওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশ আমেরিকার বাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছে মূলত চীনের তৈরি পোশাক রপ্তানি ব্যাপক হারে হ্রাস পাওয়ার কারণে। একই সময়ে আমেরিকার বাজারে চীনের তৈরি পোশাক রপ্তানি ৫৭.৬৫% হ্রাস পেয়ে ১.১৭ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে।
আমেরিকার বাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে ভিয়েতনাম প্রথম স্থানে অবস্থান করছে। একই সময়ে আমেরিকার বাজারে ভিয়েতনামের তৈরি পোশাক রপ্তানির পরিমাণ হচ্ছে ২.৭০ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের থেকে ২.৮৮% বেশি। তৈরি পোশাক রপ্তানিতে ভিয়েতনাম কেবল প্রথম স্থানেই রয়েছে, তেমন নয়- তাদের রপ্তানি বৃদ্ধি পেয়েছে। সেখানে আমাদের দেশের রপ্তানির পরিমাণ হ্রাস পেয়েছে। অথচ হওয়ার কথা ছিল উল্টা।
গত জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসে আমেরিকার বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির যে তথ্য, তার ক্রয় আদেশ দেওয়া হয়েছিল গত বছরের প্রথমার্ধে, তখনও বাংলাদেশে পোশাক কারখানা বন্ধ হওয়ার খবর সেভাবে ঘটেনি। এমনকি রপ্তানি আদেশ অন্যত্র সরে যাওয়ার খবরও সেভাবে শোনা যায়নি। কিন্তু বিগত এক বছরে দেশে ব্যবসা-বাণিজ্য, বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতের অবস্থা খুবই খারাপ হয়েছে। তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক এবং রপ্তানিকারকদের সংগঠনের নেতৃবৃন্দ বিভিন্ন সময় তাদের অসহায় অবস্থার কথা তুলে ধরেছেন।
অসংখ্য পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। আরও অনেক কারখানা বন্ধ হওয়ার উপক্রম। বিপুলসংখ্যক রপ্তানি আদেশ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে চলে গেছে মর্মেও বিভিন্ন সময় খবর প্রকাশিত হয়েছে। তাই আমেরিকার বাজারে এখনকার তৈরি পোশাক রপ্তানির তথ্য নিলে আমাদের দেশের অবস্থা যে কি দাঁড়াবে, তা এই মুহূর্তে বলা কঠিন। এমনকি আগামী ছয়/সাত মাস পরে আমেরিকার বাজারে আমাদের তৈরি পোশাক রপ্তানির পরিমাণ কোথায় নেমে আসবেÑ সেটি একটি উদ্বেগের বিষয়।
আমাদের দেশের অর্থনীতিতে তৈরি পোশাক রপ্তানির গুরুত্ব নতুন করে বলার কিছু নেই। বাংলাদেশে রপ্তানি পণ্যের তালিকার প্রথমেই আছে এই খাত। বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনের সিংহভাগ আসে তৈরি পোশাক রপ্তানি থেকে। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, তৈরি পোশাক খাত হচ্ছে অত্যন্ত শ্রমঘন ইন্ডাস্ট্রি। প্রায় পাঁচ থেকে সাত মিলিয়ন বা পঞ্চাশ থেকে সত্তর লাখ সাধারণ শ্রমিকের কর্মসংস্থান হয়েছে এই খাতে। এই শিল্পকে কেন্দ্র করে আরও অনেক ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্প গড়ে উঠেছে, যেমন স্পিনিং মিলস। এখন এই গার্মেন্টস শিল্প যদি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে দেশের মারাত্মক ক্ষতি হবে। অর্থনৈতিক ক্ষতি যেমন হবে, তেমনি আর্থ-সামাজিক খাতেও বড় ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে।
দেশের বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনের পরিমাণ কমে যাবে। অনেক ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্প বন্ধ হয়ে যেতে পারে। ইতোমধ্যে বেশ কিছু স্পিনিং মিল বন্ধ হয়ে গেছে। এর ফলে অনেক ব্যবসায়ী পুঁজি হারাবে এবং আরও অনেক শ্রমিক বেকার হয়ে যাবে। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টায় বাংলাদেশি তৈরি পোশাক বিশ্বে, বিশেষ করে আমেরিকার বাজারে ভালো জায়গা করে নিয়েছিল।
নিজস্ব ব্র্যান্ড সৃষ্টি করতে না পারলেও পশ্চিমা বিশ্বের শপিং মল বা রিটেইল স্টোরে বাংলাদেশি প্রডাক্টের নাম জানে না, এমন গ্রাহক খুঁজে পাওয়া মুশকিল। এ রকম একটি প্রতিষ্ঠিত বাজার যদি ক্রমান্বয়ে হাতছাড়া হতে থাকে, তাহলে এর সুদূরপ্রসারী ফল মোটেই ভালো হবে না। এই বাজার পুনরায় ফিরে পেতে যথেষ্ট বেগ পেতে হবে এবং আদৌ সেটা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ আছে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে কেন এমন হলো। আমেরিকার বাজারে সম্প্রতি বাংলাদেশি তৈরি পোশাক রপ্তানির পরিমাণ যে হ্রাস পেয়েছে, তার পিছনে আমেরিকার অভ্যন্তরীণ বিষয় এবং আমাদের নিজস্ব দুর্বলতা, উভয়েরই ভূমিকা রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে আমেরিকায় তৈরি পোশাকের চাহিদাও হ্রাস পেয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের উচ্চ শুল্ক হারের প্রভাবে আমেরিকার বাজারে পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় অভ্যন্তরীণ বাজারে চাহিদা হ্রাস পেয়েছে। কিন্তু এটাই একমাত্র কারণ নয়।
উচ্চ শুল্ককে কেন্দ্র করে চীন থেকে তৈরি পোশাক রপ্তানি কমে যাওয়ায়, অন্যান্য দেশের আমেরিকাতে তৈরি পোশাক রপ্তানির সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল। চীনের তৈরি পোশাক রপ্তানি যে ৫৭.৬৫% হ্রাস পেয়েছে, তার সিংহভাগ বিশ্বের আরও অনেক দেশ থেকে আমেরিকার বাজারে প্রবেশ করেছে। ভিয়েতনাম এই সুযোগের কিছুটা ধরতে পেরেছে জন্য আমেরিকার বাজারে তাদের রপ্তানি বৃদ্ধি করতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু আমরা তো এই সুযোগ কাজে লাগাতে পরিনি, উল্টো আমাদের নিজেদের তৈরি পোশাক রপ্তানির পরিমাণও কমে গেছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের শাসনামলে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দেশের ব্যবসায়ীদের মনোবল ভেঙে দেওয়া হয়েছে। এই অব্যবস্থা থেকে বাদ যায়নি দেশের রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক খাতও। সে সময় যেভাবে দেশের গার্মেন্টস কারখানা আক্রান্ত হয়েছে এবং অনেক কারখানা যেভাবে বন্ধ হয়ে গেছে, তাতে শুধু দেশের ব্যবসায়ীরাই নয়, বিদেশি ক্রেতারাও আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে।
এ রকম অরাজক পরিস্থিতিতে দেশের ব্যবসায়ীরা যেমন বিনিয়োগ করার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে, তেমনি তৈরি পোশাক আমদানিকারকরাও ক্রয় আদেশ দেওয়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছিল যে পোশাক উৎপাদনকারী এবং রপ্তানিকারকরা যে বিদেশে গিয়ে ক্রেতাদের সাথে আলোচনা করে ক্রয় আদেশ চূড়ান্ত করবে, সেই সাহসও তাদের ছিল না। এমনকি অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে অনেক ব্যবসায়ী চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে যাওয়ার সাহস পর্যন্ত করেননি। এই অবস্থায় অনেক ক্রয় আদেশ বিভিন্ন দেশে চলে গেছে।
এ কথাও ঠিক যে আমরা আমাদের রপ্তানি প্রক্রিয়াকে আধুনিক করতে পারিনি। বিশ্বে সাপ্লাই চেইন পদ্ধতিতে আমূল পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। অনেক আধুনিক পদ্ধতিতে এখন বিশ্বব্যাপী পণ্য সরবরাহ হচ্ছে। ক্রেতা-নির্ভর পণ্য সরবরাহের দিন শেষ হয়ে গেছে। এখন শুরু হয়েছে বিক্রেতা-নির্ভর পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থা। আগে ক্রেতা বা আমদানিকারক নিজেরা রপ্তানিকারকদের খুঁজে বের করে তাদেরকে নির্ধারিত এলসি (লেটার অব ক্রেডিট) দিয়ে পণ্য আমদানি করে নিয়ে আসত, যা মূলত ক্রেতা-নির্ভর পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থা। আমাদের দেশের তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকরা এভাবেই ক্রেতাদের কাছ থেকে এলসি নিয়ে পণ্য রপ্তানি করে আসছে।
এখন অধিকাংশ আমদানিকারক বা ক্রেতা আর রপ্তানিকারকের কাছে যেতে চায় না। রপ্তানিকারকরাই এখন আমদানিকারক বা ক্রেতাদের কাছে যায় এবং নিজ দায়িত্বে পণ্য পাঠিয়ে দেয় এই শর্তে যে তারা পণ্য বিক্রয় করে অর্থ পরিশোধ করবে। ওয়ালমার্টের মতো কিছু রিটেইলার বা চেইন স্টোর আছে, যারা এখনও সরাসরি পণ্য সংগ্রহ করে থাকে। কেননা তাদের ব্যবসায়িক কৌশলই হচ্ছে কম মূল্যে পণ্য সংগ্রহ করা। কেননা যত কম মূল্যে পণ্য সংগ্রহ করতে পারবে, তত তাদের মুনাফা বৃদ্ধি পাবে।
এ কারণেই ওয়ালমার্টের মতো কিছু রিটেইলার এখনও আগে থেকে ক্রয় আদেশ বা এলসি দিয়ে পণ্য আমদানি করে। কিন্তু বাকিরা আর আগে থেকে এলসি বা ক্রয় আদেশ দিয়ে পণ্য সংগ্রহ করে না। উল্টো রপ্তানিকারকরা এখন নিজ দায়িত্বে পণ্য আমদানিকারকদের কাছে পৌঁছে দিয়ে থাকে। শুধু তাই নয়, পণ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে ‘বিক্রয় অথবা ফেরত’ এখন খুবই জনপ্রিয় পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে রপ্তানিকারক আমদানিকারকের কাছে পণ্য রপ্তানি করে এই শর্তে যে আমদানিকারক একটি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যত পণ্য বিক্রি করতে পারবে, তার মূল্য আমদানিকারক পরিশোধ করবে।
আর অবশিষ্ট পণ্য রপ্তানিকারককে ফেরত নিতে হবে। আসলে পণ্য তো আর ফেরত নেয় না। সেসব পণ্য প্রথমে অনেক কম দামে বা বিশাল ডিসকাউন্টে বিক্রি করার চেষ্টা করা হয়। সেটা না হলে, স্থানীয় কমিউনিটি-ভিত্তিক বাজারে বিক্রি করা হয়। আমাদের দেশ এই ধরনের আধুনিক রপ্তানি পদ্ধতি থেকে অনেক পিছনে। এসব কারণেও তৈরি পোশাক রপ্তানির সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যেতে শুরু করেছে।
এভাবে রপ্তানি বাজার একবার হাতছাড়া হয়ে গেলে সেই বাজার পুনরুদ্ধার করা মোটেই সহজ কাজ হবে না। তা ছাড়া সেই বাজার পুনরুদ্ধার করতে যে সময় লাগবে, সেই সময় পর্যন্ত অনেক পোশাক উৎপাদনকারী তাদের উৎপাদন ব্যবস্থা চালু রাখতে সক্ষম হবেন না। ফলে পুরো তৈরি পোশাক শিল্পই হুমকির মধ্যে পড়ে যাবে। তাই এখনই কিছু কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে দেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি দ্রুত বৃদ্ধি করার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
প্রথমত, দেশের পোশাক রপ্তানিকারকদের সাথে সরাসরি আলোচনা করে তাদের সমস্যাগুলোর দ্রুত সমাধান করা প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, পোশাক রপ্তানি পদ্ধতিকে আধুনিকায়ন করা এবং এ ব্যাপারে কিছু সুযোগ-সুবিধা দেওয়া প্রয়োজন। তৃতীয়ত, ব্যবসায়ীরা যেন আমেরিকার ক্রেতাদের সাথে সরাসরি আলোচনা করে তাদেরকে আশ্বস্ত করতে পারে যে সময়মতো পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে। অবশ্য তার আগে সময়মতো পণ্য সরবরাহের ব্যবস্থা নিশ্চিত করে নিতে হবে। চতুর্থত, তৈরি পোশাক উৎপাদনকারী এবং রপ্তানিকারকদের ব্যাংকিং সুবিধা প্রসারিত করার প্রয়োজন হতে পারে। এই খাতের জন্য বিশেষ শর্তে ব্যাংকিং সুবিধা প্রদানের সুযোগ সৃষ্টি করা যেতে পারে। দেশের অর্থনীতি এবং আর্থ-সামাজিক খাতে এই শিল্পের অবদানের কথা বিবেচনা করে সরকারেরও উচিত এই খাতের দিকে বিশেষ নজর দেওয়া।
লেখক: নিরঞ্জন রায়, সার্টিফায়েড অ্যান্টি-মানি লন্ডারিং স্পেশালিস্ট ও ব্যাংকার, টরন্টো, কানাডা