ইমেইল থেকে
আবদুল কাদের জীবন
প্রকাশ : ৬ ঘণ্টা আগে
প্রতীকী ছবি
বর্ষাকাল চলছে। নদী পাড়ের মানুষজনের কপালে চিন্তার ভাজ পড়ে গেছে এতক্ষণে। কখন হঠাৎ কয়েকটি ঢেউ এসে ভেঙে দিয়ে যায় তাদের ভিটেমাটি। হয়তো বৃদ্ধরা গালে হাত দিয়ে ভাবছেন এই বয়সে আশ্রয় নিবেন কোথায়।
নদীর বাঁধ দেওয়ার ক্ষেত্রে ক্রমাগত দুর্নীতির কারণে টেকসই বাঁধ তৈরি হয়নি। স্থানীয় প্রভাবশালীরা রাষ্ট্রের টাকা আত্মসাৎ করে দুর্বল বাঁধ নির্মাণ করে, পরক্ষণেই ভেঙে পড়ে সেই বাঁধ। তলিয়ে যায় কৃষকের মাছের ঘের, ফসলের ক্ষেত, ভেঙে নিয়ে যায় ঘরবাড়ি। প্রান্তিক মানুষজন রাষ্ট্র থেকে তেমন কোনো সুযোগ-সুবিধা পায় না, তার একমাত্র কারণ স্থানীয় রাজনৈতিক বলয়। গ্রাম্য ভাষায় যাকে বলে, ‘মুখ দেখে খাতির করা’।
শিক্ষা, চিকিৎসা ও যোগাযোগে পিছিয়ে নদীপাড়ের ও চর এলাকার মানুষজন। রাষ্ট্রের সুযোগ-সুবিধা তাদের দোরগোড়ায় পৌঁছে না বললেই চলে। তারা ছোট্ট ঘর বেঁধে কোনোমতে আশ্রয় নেয়। শেষপর্যন্ত রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের অবহেলায় তাদের মাথা রাখার জায়গাটুকু আগ্রাসী নদী কেড়ে নেয়।
বর্ষাকালে অধিক বৃষ্টিপাতের কারণে নদীর পানি বৃদ্ধি পায়। স্রোতের গতিবেগও বৃদ্ধি পায়। তাই এই ঋতু এলেই নদীপাড়ের মানুষজনের চোখেমুখে উৎকণ্ঠা। কখন জানি ভেসে যায় তারা। পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্রসহ প্রধান নদীগুলো ভাঙনের শিকার হয়। দেশের ভূমিহীনদের ৫০ ভাগই নদীভাঙনের শিকার। গবেষণায় জানা যায়, নদীভাঙনের কারণে একজন মানুষ গড়ে ২০ বার স্থান পরিবর্তন করে থাকেন। প্রতিবছর ৫-৬ হাজার হেক্টর জমি নদীভাঙনে বিলীন হয়ে যায়। নদীভাঙনের ফলে এদেশে প্রতিবছর ২৫ কোটি ডলারের মতো লোকসান হয়। পদ্মা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনার অববাহিকায় ১২০০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। এ ছাড়া ভিটেমাটি হারানো মানুষদের ভবিষ্যৎ পুরোপুরি অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। বিশেষ করে, শিশুদের ভবিষ্যৎ সবচেয়ে বেশি হুমকির মুখে পড়ে।
সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলা তীব্র নদীভাঙনের শিকার হয়। এ ছাড়া উত্তরের জেলা গাইবান্ধা, সর্ব দক্ষিণের জেলা ভোলার কয়েকটি উপজেলা, লক্ষ্মীপুরের কমলনগর উপজেলা, নোয়াখালীর হাতিয়া, শরীয়তপুর, চাঁদপুর ইত্যাদি নদীর অববাহিকায় প্রতিবছর তীব্র নদীভাঙন দেখা যায়। দেশ ও জনগণের ওপর এই নদীভাঙন বিশাল প্রভাব ফেলছে। কিন্তু সরকার নদীরক্ষা বাঁধগুলো তৈরি করছে না কেন? তৈরি করলেও সেটি টেকসই হচ্ছে না কেন? নদীতে অবৈধভাবে বালি উত্তোলন বন্ধ করবে কে? এই বর্ষায় সরকার এসবের উত্তর দেওয়ার আগেই আবারও দেড় লাখ মানুষ তার ভিটেমাটি হারাবে। তাকিয়ে থাকবে বর্ষার ভিজে আকাশের দিকে। চোখ দিয়ে বৃষ্টির মতো অশ্রু ঝরবে সেই মানুষদের। অথচ তাদের একটি সুন্দর জীবন পাওয়ার কথা ছিল।
ভাঙনের ফলে বাসস্থান হারানো মানুষগুলো শহরের বস্তিতে এসে বসবাস করে। করে মানবেতর জীবনযাপন। একসময় যার নিজের ফসলের ক্ষেত ছিল সে এখন পথের ভিখারি। মাথা রাখার জায়গাটুকু তার আর নেই।
লেখক: আবদুল কাদের জীবন (গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় )