চীনের অর্থায়নে ‘তিস্তা নদী সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প’ বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। ফাইল ছবি
বাংলাদেশের উত্তরের জনপদের জীবন, কৃষি ও অর্থনীতির সঙ্গে তিস্তা নদীর সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। এই তিস্তা অববাহিকার সার্বিক উন্নয়ন, ভাঙন রোধ এবং সেচ সুবিধা বাড়াতে বাংলাদেশকে কারিগরিসহ সব ধরনের সহায়তা দিতে প্রস্তুত চীন।
ঢাকার চীন দূতাবাসে বৃহস্পতিবার আয়োজিত এক ব্রিফিংয়ে এমন আশ্বাসের কথা জানিয়েছেন ঢাকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন। রাষ্ট্রদূত বলেছেন, ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে চীন তার আগের অবস্থানেই রয়েছে।’ এ বক্তব্যের আলোকে বলা যায়, চীনের অর্থায়নে ‘তিস্তা নদী সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প’ বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। ব্রিফিংয়ে ইয়াও ওয়েন বলেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক চীন সফর দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও এগিয়ে নিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে। এ কথা সত্য যে, দীর্ঘদিন ধরে তিস্তায় শুষ্ক মৌসুমে পানির স্বল্পতা, নদীভাঙন এবং সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে এই অববাহিকার মানুষ নানা সংকট মোকাবিলা করছে।
উল্লেখ করা প্রয়োজন, সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের মধ্য দিয়ে বার্তা পাওয়া গিয়েছিল, দুই দেশই সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে চায়। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আস্থা ও পারস্পরিক সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করেই দেশ দুটি এই পথে এগোবে। চীন বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্যিক অংশীদার। অবকাঠামো উন্নয়ন, জ্বালানি, শিল্প, যোগাযোগ ও বিনিয়োগে দেশটির ভূমিকা গত এক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সফরের সময় এবার চুক্তি ও সমঝোতা স্মারকসহ ১৭টি দলিল সই হয়েছে। ওই সফরেই বাংলাদেশ ও চীন তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে ঐকমত্যে পৌঁছেছে।
প্রসঙ্গক্রমে বলতে হয়, আমাদের প্রতিবেশী ভারতের শিলিগুড়ি করিডোরের (চিকেনসনেক) কাছাকাছি এই প্রকল্পে দিল্লির তীব্র কৌশলগত আপত্তি ও উদ্বেগ রয়েছে। চীনের পক্ষ থেকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, তিস্তা মহাপরিকল্পনায় চীনের সহযোগিতা সম্পূর্ণরূপে বাংলাদেশের মানুষের জীবন-জীবিকার স্বার্থে এবং এটি কোনো তৃতীয় পক্ষকে লক্ষ্য করে বা তাদের হস্তক্ষেপ বিঘ্নিত হওয়ার কিছু নেই। তারপরও বলতে হয়, তিস্তা প্রকল্পে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর কূটনৈতিক প্রভাব। তিস্তা নদীর পানিবণ্টন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের আলোচনা বিদ্যমান। তাই চীনের অংশগ্রহণকে কেন্দ্র করে আঞ্চলিক রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যুক্ত হওয়া স্বাভাবিক। ভারত বাংলাদেশের নিকটতম প্রতিবেশী। দুই দেশের সম্পর্ক শুধু কূটনৈতিক নয়, বহু বাস্তব স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত। এসব বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়েই আমাদের এগোতে হবে।
উত্তরাঞ্চলের দীর্ঘদিনের পানি সংকট নিরসনে এই ‘মহাপরিকল্পনা’ যেকোনো মূল্যে বাস্তবায়নের ঘোষণা দিয়ে ছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। জানা যায়, তিস্তা প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো নদীর নাব্যতা রক্ষা, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, সেচ সুবিধা বৃদ্ধি, নদীতীর সংরক্ষণ এবং নদীকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিকাশ। পরিকল্পনায় রয়েছে নদীর প্রায় ১১০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ড্রেজিং ও গভীরতা বৃদ্ধি। তিস্তার দুই তীরে ১০০ কিলোমিটারেরও বেশি স্থায়ী গাইড বাঁধ নির্মাণ এবং সড়ক যোগাযোগ স্থাপন। বর্ষা মৌসুমে পানি সংরক্ষণ বা ধরে রাখার জন্য বিশাল জলাধার বা রিজার্ভার তৈরি; যা শীতকালে খরা মৌসুমে সেচকাজে ব্যবহার করা হবে। আমরা মনে করি, চীনের প্রযুক্তিগত দক্ষতা, প্রকৌশল অভিজ্ঞতা এবং অর্থায়ন এ প্রকল্প বাস্তবায়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বৃহৎ নদী ব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামো উন্নয়নে চীনের অভিজ্ঞতা রয়েছে, যা বাংলাদেশের জন্য কার্যকর হতে পারে।
এ কথা সত্য যে, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে উত্তরাঞ্চলের কৃষিতে এক ধরনের বৈপ্লবিক পরিবর্তন সূচিত হবে। নিয়ন্ত্রিত সেচ ব্যবস্থার মাধ্যমে সারা বছর চাষাবাদ সম্ভব হবে। প্রায় ৫০ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা বাড়বে, যা খরা-বন্যাও কমিয়ে দেবে। নদীর দুই তীরে ২২০ কিলোমিটার বাঁধের পাশে প্রসেসিং জোন, কৃষিভিত্তিক শিল্প, লজিস্টিক সেন্টার এবং ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন তৈরি হবে। স্থানীয়ভাবেই লাখো চাকরির সুযোগ সৃষ্টি হবে। পর্যটনের সম্ভাবনাও এখানে ব্যাপক। নদীকেন্দ্রিক রিসোর্ট, হেরিটেজ জোন এবং মেরিন ড্রাইভের কারণে দেশি-বিদেশি পর্যটক আসবে; যা অর্থনীতিতে নতুন গতি আনতে পারে। পরিবেশবান্ধব উন্নয়নের কারণে নদী থাকবে জীবন্ত। তীরজুড়ে গড়ে উঠবে সবুজবেষ্টনী। মানুষ পাবে স্থায়ী আশ্রয়, উন্নত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা; যা একসময় কল্পনাতীত ছিল। এত দারিদ্র্যপীড়িত উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোয় মানুষের জীবনমান বাড়বে।
তবে আমরা মনে করি, এ প্রকল্পকে শুধু বিদেশি সহায়তার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে চলবে না। প্রকল্পের পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন এবং পরিচালনায় বাংলাদেশের নিজস্ব স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। পরিবেশগত ভারসাম্য, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, স্থানীয় জনগণের পুনর্বাসন এবং কৃষকদের স্বার্থ নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। নতুন কোনো পরিবেশগত বা সামাজিক সংকট সৃষ্টি না হয়, সে বিষয়েও সতর্ক থাকতে হবে। সরকারের উচিত প্রকল্পের সব ধরনের চুক্তি, অর্থায়ন ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে দেশীয় বিশেষজ্ঞ, পানিসম্পদবিদ, পরিবেশবিদ এবং স্থানীয় জনগণের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে পরিকল্পনা গ্রহণ করা।
তিস্তা শুধু একটি নদী নয়, স্বপ্নের প্রতীক। উত্তরাঞ্চলের উন্নত, টেকসই ও মানবিকতার চিত্র। সহজ করে বললে, উত্তরের জনপদ তিস্তায় জাগল আশার আলো। এ কথায় তিস্তা প্রকল্প দেশের জন্য একটি সম্ভাবনাময় সুযোগ। এই যাত্রায় বিদেশি সহযোগিতা অবশ্যই স্বাগত, তবে তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো বাংলাদেশের নিজস্ব অগ্রাধিকার, স্বচ্ছতা এবং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থকে সমুন্নত রাখা।