× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ জাতীয় রাজনীতি সারা দেশ আন্তর্জাতিক অর্থনীতি খেলা বিনোদন মতামত চাকরি-ক্যারিয়ার শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

নজরুলের কবিতা ও গান আমাদের প্রেরণার উৎস

তারেক রহমান

প্রকাশ : ২ ঘণ্টা আগে

 তারেক রহমান। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

তারেক রহমান। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম এই বাংলাদেশ ভূখণ্ডে জন্মগ্রহণ করেননি। তবে তার হৃদয়জুড়ে ছিল বাংলাদেশ। বাংলাদেশও তাকে হৃদয় দিয়ে ভালোবাসে। কিশোরবেলায় ১৯১৪ সালে তিনি প্রথমবারের মতো ময়মনসিংয়ের ত্রিশালে এসেছিলেন।

কবির স্মৃতিবিজড়িত সেই ত্রিশালকে ‘নজরুল সিটি’ ঘোষণার সম্ভাব্যতা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এর পাশাপাশি সরকার ২০২৬ সালের ২৫ মে থেকে ২০২৭ সালের ২৫ মেÑ এ বর্ষটিকে ‘নজরুল বর্ষ’ ঘোষণা করেছে।

বিদ্রোহী কবি, প্রেমের কবি, বিরহের কবি, তারুণ্যের কবি, বাংলাদেশের ঐতিহ্যের কবি, কাজী নজরুল ইসলাম আমাদের জাতীয় সাহিত্য, সাংস্কৃতিক ইতিহাসের অবিস্মরণীয় নাম। পরাধীন, পর্যুদস্ত, পরাভূত জাতির ভাগ্যাকাশে তার আবির্ভাব ছিল আলোকবর্তিকার মতো।

পরাধীনতা, জুলুম, নির্যাতন, শোষণ, অসাম্য, বৈষম্য, কুসংস্কার, তথা যা কিছু অন্যায়, অবিচার ও অসুন্দর, তার বিরুদ্ধে কবির কলম ছিল শানিত অস্ত্র। বিপ্লব-বিদ্রোহ কিংবা রণ-সংগীত, ইসলামী তাহজীব-তমদ্দুন কিংবা ইসলামী মূল্যবোধের গান, অথবা ভজন-কীর্তন কিংবা শ্যামা সংগীত, প্রেম-প্রকৃতি কিংবা মানবিক মূল্যবোধ, কৈশোরের আনন্দ কিংবা যৌবনের উন্মাদনাÑ প্রতিটি ক্ষেত্রেই নজরুল আমাদের শুদ্ধ প্রকাশ।

মাতৃভূমিকে ভালোবাসার ক্ষেত্রেও তিনি আমাদের অন্যতম প্রধান দিশারি। আমাদের জীবন, আশা-আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্ন, সংগ্রাম, সাহিত্য, সংস্কৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্য তার রচনার মধ্যে মহিমাময় সৌন্দর্য নিয়ে বাঙ্ময় হয়েছে। কবি নজরুলের সৃষ্টিশীলতার মধ্যে আতিথ্য রয়েছে সকল কালের, সকল মানুষের। অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে তিনি আমাদের অনুপ্রেরণা। তার প্রাসঙ্গিকতা এবং প্রয়োজন ফুরানোর নয়।

আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে তার কবিতা ও গান যেমন ছিল অনুপ্রেরণার প্রবল উৎস, তেমনই আমাদের সকল আন্দোলন-সংগ্রামে তার সৃষ্টিশীলতাই হয়ে ওঠে প্রতিবাদ, প্রতিরোধের মূল ভাষা। তিনি আমাদের যাপিত জীবনের অনিবার্য অংশ। শুধু অতীত ইতিহাস নয়, আজকের প্রজন্মের জন্য, এমনকি আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও নজরুল আমাদের জীবনে প্রাসঙ্গিক। এ কারণেই আমাদের জাতীয় কবির জীবন ও কর্মের সঙ্গে গণমানুষ, বিশেষ করে বর্তমান প্রজন্মের সম্পর্ক আরও গভীর ও নিবিড় করার লক্ষ্যে নানা আয়োজনে ‘নজরুল বর্ষ’ শুরু হয়েছে।

‘নজরুল বর্ষ’ উদযাপনের লক্ষ্যে আজকের এই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অনেক সরকারি কর্মকর্তাগণ উপস্থিত রয়েছেন। বেশ কয়েকজন নজরুল গবেষক এবং নজরুল সংগীত শিল্পীও এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত রয়েছেন। আপনাদেরকে অভিনন্দন। তবে একটি আধুনিক আবদ্ধ ঘরে বসে আজ যেভাবে ‘নজরুল বর্ষ’ উপলক্ষে বছরব্যাপী কর্মসূচির উদ্বোধন করছি, স্মারক ডাকটিকিট এবং লোগো উন্মোচন করছিÑ এই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানটিকে আমি একটু ভিন্নভাবেই আশা করেছিলাম। 

আজকের এই অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণপত্রে লেখা হয়েছে, ‘সকল বিভাগীয় কমিশনার, জেলা এবং নির্বাচিত ৭৪টি উপজেলার উপজেলা নির্বাহী অফিসারগণ ভার্চুয়ালি সংযুক্ত থাকবেন’।

এর পরিবর্তে আমন্ত্রণপত্রে যদি লেখা থাকত, ‘সকল বিভাগীয়, জেলা এবং উপজেলা পর্যায়ে নজরুল গবেষক, নজরুল শিল্পী, নজরুলপ্রেমীগণ ভার্চুয়ালি সংযুক্ত থাকবেন’ সেটি বরং বেশি যৌক্তিক এবং সামঞ্জস্যপূর্ণ হতো বলে আমার বিশ্বাস। আমার এই উপলব্ধির কারণ হলো, ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কিংবা ‘কৃষক কার্ড’ বিতরণ অনুষ্ঠানে যদি বলা হয় ‘নজরুল গবেষক, নজরুল শিল্পী, নজরুলপ্রেমী মানুষেরা ভার্চুয়ালি সংযুক্ত থাকবেন’Ñ এটি যেমন অনুষ্ঠানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ মনে হয় না, ঠিক একইভাবে, একই কারণে নজরুল বর্ষ উদযাপনে ‘সকল বিভাগীয় কমিশনার, জেলা এবং নির্বাচিত ৭৪টি উপজেলার উপজেলা নির্বাহী অফিসারগণ ভার্চুয়ালি সংযুক্ত থাকবেন’ কথাটিও উদ্দেশ্যের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে হওয়ার যৌক্তিক কারণ রয়েছে। 

প্রতিটি রাষ্ট্র এবং সমাজে এমন কিছু ক্ষণজন্মা মানুষ জন্ম নেন, যারা আমাদের আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক জীবন কিংবা আমাদের সাহিত্য-সংস্কৃতি, সামাজিক মূল্যবোধ 

আমাদের সামাজিক দর্শন, আমাদের মনোজগতে প্রবলভাবে প্রভাব বিস্তার করে থাকেন। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম তেমনই একজন ক্ষণজন্মা ব্যক্তিত্ব। কৈশোর থেকে পরিণত বয়স, আমাদের জীবনের সকল পর্যায়েই তার প্রভাব অপরিসীম।

তথ্যপ্রযুক্তির অবাধ প্রবাহ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সীমাহীন ইতিবাচক এবং নেতিবাচক প্রভাব, আমাদের নতুন প্রজন্মের সামনে একদিকে যেমন জ্ঞানের দ্বার উন্মোচন করে দিয়েছে, অপরদিকে মূল্যবোধ হারিয়ে বিপথগামী হওয়ার পথও উন্মুক্ত।

এমন জটিল বাস্তবতায় কাজী নজরুল ইসলামের ‘আমি হবো সকাল বেলার পাখি/ সবার আগে কুসুম বাগে/ উঠব আমি ডাকি’।

কিংবা ‘থাকব নাকো বদ্ধ ঘরে/ দেখব এবার জগৎটাকে/ কেমন করে ঘুরছে মানুষ/

যুগান্তরের ঘূর্ণিপাকে’Ñ এ ধরনের নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন ছড়া বা কবিতা আমাদের উদীয়মান প্রজন্মের সামনে আশা জাগানিয়া আলোকবর্তিকা হয়ে উঠতে পারে। 

এ কারণেই কবি নজরুলকে নিয়ে আলোচনা মন্ত্রণালয় কিংবা সরকারি অফিসের চার দেয়ালে আবদ্ধ না রেখে তার সাহিত্যকর্ম, তার জীবনবোধ পৌঁছে দিতে হবে মানুষের ঘরে। কবি নজরুলের জীবন ও কর্ম, তার চিন্তা ও দর্শন ছড়িয়ে দিতে হবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে। কবি নজরুল নিজেও তার ‘অভয়-সুন্দর’ কবিতায় লিখেছেন...

‘আমি গেলে যারা আমার পতাকা ধরিবে বিপুল বলে –

সেই সে অগ্রপথিকের দল এসো এসো পথতলে ’।

নজরুল বর্ষ উদযাপনে বছরব্যাপী কর্মসূচি আজ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হতে যাচ্ছে। ফলে সাহিত্য সম্মেলন, গবেষণা, সেমিনার, সাংস্কৃতিক উৎসব, নজরুল সংগীতের আসর, প্রকাশনা কার্যক্রম, নাট্যোৎসব এবং চিত্র প্রদর্শনীসহ নানা আয়োজনের মাধ্যমে জাতীয় কবির সৃষ্টিকে জনপরিসরে আরও বিস্তৃতভাবে তুলে ধরার উপলক্ষ তৈরি হয়েছে। ডিজিটাল মাধ্যমেও তার সাহিত্য ও সংগীত সংরক্ষণ এবং তার সাহিত্যকর্ম আন্তর্জাতিক পরিসরে আরও বিস্তৃতভাবে প্রচারের সুযোগও তৈরি হয়েছে।

এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সারা দেশে নজরুল বিশেষজ্ঞ তথা নজরুলপ্রেমীদের নিয়ে গঠিত, ‘নজরুল বর্ষ উদযাপন জাতীয় কমিটি’র মাধ্যমে দেশের সকল জেলা-উপজেলা এবং বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে বছরজুড়ে প্রতিটি অনুষ্ঠান সফলভাবে পালন করার জন্য জরুরি বলেই আমি মনে করি। ফলে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বাংলা ভাষাভাষী জনগোষ্ঠী এবং আন্তর্জাতিক গবেষক সমাজ তথা বিশ্বদরবারে ছড়িয়ে পড়বে নজরুলের সাহিত্যকর্ম। নজরুলের বিশ্বজনীন মানবিক বার্তাও তার সাহিত্য ও সংগীতের বহুভাষিক অনুবাদ এবং গবেষণার মাধ্যমে বিশ্বপরিসরে ছড়িয়ে পড়বে। যারা নজরুল বিশেষজ্ঞ তারা কবিকে নানা বিশেষণে ভূষিত করে থাকেন। একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে আমার কাছে মনে হয়, আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম হলেন ‘বাংলাদেশের মন’।

আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম যেমন বলেন, ‘গাহি সাম্যের গান,/  যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা ব্যবধান,/ যেখানে মিশছে হিন্দু-বৌদ্ধ-মুসলিম-ক্রিশ্চান’।

অপশক্তি নিজেদের হীন দলীয় স্বার্থে মানুষের মধ্যে বিভেদ-বিরোধ সৃষ্টির অপচেষ্টা চালালেও সবাই মিলেমিশে থাকাই বাংলাদেশের মানুষের আবহমান কালের মূল্যবোধ। বর্তমান সরকারও এমন এক রাষ্ট্র এবং সমাজ বিনির্মাণের লক্ষ্যে কাজ করছে...

যেখানে ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষ নির্বিঘ্নে নিরাপদে বসবাস করবে। শুধু মানুষের নিরাপত্তাই নয়, কোনো প্রাণীও মানুষের হিংস্রতার শিকার হবে না, বর্তমান সরকার সেটিও নিশ্চিত করতে চায়।

পরিশেষে, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জীবন, কর্ম, সাহিত্য, সংগীত, দর্শন ও মানবিক চেতনাবোধের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে, আনুষ্ঠানিকভাবে ‘নজরুল বর্ষ ২০২৬-২০২৭’-এর বছরব্যাপী কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ঘোষণা করছি। 

আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, ‘নজরুল বর্ষ’ উদ্‌যাপনের মাধ্যমে দেশে-বিদেশে জাতীয় কবির সৃষ্টিকর্ম নতুনভাবে মূল্যায়িত হবে। আয়োজনকারীদের ধন্যবাদ জানিয়ে এবং ‘নজরুল বর্ষে’র সার্থকতা কামনা করে আমার বক্তব্য শেষ করছি।


(২০২৬-২০২৭ ঘোষিত নজরুল বর্ষের আনুষ্ঠানিক কর্মসূচির উদ্বোধন অনুষ্ঠানে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রদত্ত ভাষণ।)


শেয়ার করুন-

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা