ডিএনসিসি’র
ড. বিভূতি ভূষণ মিত্র
প্রকাশ : ৬ ঘণ্টা আগে
প্রতীকী ছবি
সম্প্রতি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) ঢাকার বায়ু, পানি ও মাটিদূষণ মোকাবিলায় নগর বনায়ন কার্যক্রম শুরু করেছে। ঢাকার পরিবেশদূষণ ঠেকাতে সিটি করপোরেশনের এমন উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ।
বন এমন একটি প্রাকৃতিক সম্পদ যেখানে প্রাকৃতিকভাবে গাছপালা পশুপাখি সবাই মিলে একসাথে থাকে। বনের আয়তন বিশাল হয়ে থাকে যেখানে নানা বৃক্ষরাজি, ছোটবড় ঝোপঝাড় থাকে। থাকে বিভিন্ন বন্যপ্রাণী, পাখি ও কীটপতঙ্গ। এখানকার ভূপ্রাকৃতিক বৈচিত্র্যও বেশ গুরুত্বপূর্ণ। কোথাও উঁচু কোথাও নিচু, কোথাও শুকনা, কোথাও জলাশয়ে পূর্ণ থাকে।
বাংলাদেশে এই প্রাকৃতিক বনের ব্যবহার বহু আগে থেকেই। প্রায় ২০০০ খ্রিস্ট পূর্বাব্দে দ্রাবিড় সভ্যতার বিকাশের সময়ে এর ব্যবহার সম্পর্কে জানা গেছে। সে সময় তারা গাছ কেটে ঘর বানাত। শিল্প-প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে। বেদ, পুরাণ, রামায়ণ ও মহাভারতেও বন ও বনায়ন সম্পর্কে জানা যায়। এই সমস্ত গ্রন্থে শাল, বেল, কিংশুক প্রভৃতির কথা উল্লেখ আছে। সম্রাট অশোক সম্পর্কে জানা যায় তিনি বন ও বন্য প্রাণী ভালোবাসতেন ও সে সবের খুব যত্ন নিতেন এবং বন সংরক্ষণ করতেন। মোগল আমলে বন সংরক্ষণের কথা তেমন পাওয়া না গেলেও তাদের বন ব্যবহার করার কথা জানা গেছে। তারা সৌন্দর্য বর্ধনের জন্য বনের গাছ ব্যবহার করত। পরবর্তীতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ব্যাপক মাত্রায় বন কেটে রেল লাইনসহ নানা কাজ শুরু করলেও ভারতবর্ষে প্রথম বন সংরক্ষণের কথা আসে লর্ড ডালহৌসির আমলে। পরে ১৮৬৪ সালের ১ নভেম্বর প্রথম ভারতে বন বিভাগ চালু হয়।
জীবজগতের আশি শতাংশের বসবাস বনে। প্রায় ৬০ হাজার প্রজাতির উদ্ভিদের আবাসস্থল এই বন। এ ছাড়া উভচর প্রজাতির আশি শতাংশ, পাখি প্রজাতির ৭৫ শতাংশ এবং স্তন্যপায়ী প্রাণী প্রজাতির ৬৮ শতাংশের বসবাস বনে। কিন্তু ধীরে ধীরে উজাড় হয়ে যাচ্ছে এসব বন। ডব্লিইডব্লিইএফের তথ্যমতে প্রতি বর্গকিলোমিটার বন এক হাজার পর্যন্ত জীব প্রজাতি ধারণ করতে পারে। বন বিভাগের তথ্যমতে সারা দেশে ২ লাখ ৫৭ হাজার ১৫৮ একর বন দখলে চলে গেছে। ২০০১ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত গড়ে ২৫ হাজার একর বনভূমি দখল হয়েছে।
বনের ওপর মানুষ প্রাচীনকাল থেকেই নানাভাবে নির্ভরশীল। জাতিসংঘের মতে সারা বিশ্বে ১.৬ বিলিয়নেরও বেশি মানুষ জীবিকার প্রয়োজনে বনের ওপর নির্ভর করছে। প্রাচীনকাল থেকে শুরু করে আজ অবধি বিশ্বের ৮০ শতাংশ বন মানুষের কারণে ধ্বংস হয়েছে। এফএওর তথ্য অনুযায়ী বৈশ্বিক অর্থনীতিতে জ্বালানি কাঠের বার্ষিক অর্থমূল্য ৪ লাখ মার্কিন ডলারেরও বেশি। বনের ওপর মানুষ নানাভাবে নির্ভরশীল। বন অক্সিজেন তৈরি করে। আমাদের ঠান্ডা রাখে। কার্বন ডাই-অক্সাইড সংরক্ষণ করে। বাতাস পরিষ্কার ও ভূমিক্ষয় রোধ করে। খাবারের জোগান দেয় ও কোটি কোটি মানুষকে চাকরি দেয়। বন বাতাস থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে। বাতাসকে নির্মল রাখে। পৃথিবীর প্রায় ৩০ কোটি লোক বাস করে বনে। এদের মধ্যে ৬ কোটি লোকই আদিবাসী। এসব মানুষ প্রত্যক্ষা ও পরোক্ষভাবে বনের ওপর নির্ভর করে। একটি তথ্যমতে যুক্তরাষ্ট্রের গাছ বছরে ৮৫০ জন মানুষ বাঁচায় আর স্বাস্থ্য খরচ কমায় ৬৮০ কোটি ডলার। পৃথিবীর এক কোটি মানুষ সরাসরি বনের ওপর নির্ভরশীল। বন আমাদের বিভিন্ন ধরনের ওষুধসহ মধু, মাশরুম, ফল, বাদাম ইত্যাদির জোগানদাতা। এ ছাড়া বনের গাছপালা শব্দ প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করে, যা মারাত্মক শব্দদূষণ থেকে আমাদের রক্ষা করে।
কিন্তু মিয়াওয়াকি পদ্ধতি কেন? ড. আকিরা মিয়াওয়াকি হলেন জাপানের একজন উদ্ভিদবিজ্ঞানী। তিনি একটি বিশেষ ধরনের বনায়ন পদ্ধতির উদ্ভাবন করেন। এই পদ্ধতিটি অল্প জায়গায় ঘন, বৈচিত্র্যময় ও দ্রুত বর্ধনশীল বন তৈরির জন্য উত্তম। দেখা গেছে সাধারণ বনের তুলনায় মিয়াওয়াকি পদ্ধতিতে গাছ লাগালে সেই বন ১০ গুণ দ্রুত বেড়ে ওঠে এবং এ ধরনের বন ৩০ গুণ বেশি ঘন হয়। এ ছাড়া এর কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য আছে, যা আমরা যে ধরনের বন তৈরি করার কথা বলি তার পক্ষে যায়। মিয়াওয়াকি পদ্ধতির মূল বৈশিষ্ট্য হলোÑ এই পদ্ধতি বহিরাগত গাছের পরিবর্তে স্থানীয় গাছের ক্ষেত্রে বেশি প্রযোজ্য। এক্ষেত্রে আমাদের চাওয়াই তাই যে যেন বেশি করে স্থানীয় প্রজাতির গাছ লাগানো হয়। এ ছাড়া এতে ছোট জায়গায় বেশি গাছ লাগানো যায়। প্রতি বর্গমিটারে এই পদ্ধতিতে ৩ থেকে ৪টি গাছ লাগানো হয়। এই পদ্ধতিতে এক সাথে চার স্তরের গাছ লাগানো যায়। এর ফলে গাছগুলোর মধ্যে সূর্যালোকের জন্য প্রতিযোগিতা তৈরি হয়। ফলে এদের মধ্যে দ্রুত বৃদ্ধির একটা ঘটনা ঘটে। এই পদ্ধতিতে গাছ রোপণ করলে পরিচর্যাও কম করতে হয়। প্রথম ২ থেকে ৩ বছর সামান্য পানি দেওয়া ও আগাছা পরিষ্কার করলেই চলে। এছাড়া এই পদ্ধতিটি শহরের কংক্রিটের মাঝে বাতাস বিশুদ্ধ রাখতে খুব কাজ করে। আর দেখা গেছে, এই পদ্ধতিটি এতটাই উপযোগী যে যে বন তৈরি হতে শত শত বছর লাগে, সেই ধরনের বন মাত্র ২০ থেকে ৩০ বছর সময়েই হয়ে যায়।
চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে ব্যক্তি উদ্যোগে দেশের প্রথম কৃত্রিম বন তৈরি করা হয়েছিল মিয়াওয়াকি পদ্ধতিতে। সেখানে মাত্র ৪ হাজার ৪০০ বর্গফুট জায়াগায় ছোট-বড় ১২০ প্রজাতির গাছও লতাগুল্ম মাত্র তিন বছরইে ঘন বনে পরিণত হয়েছিল। ওই প্রকল্পটির উদ্যোক্তা ও পরিচালক ছিলেন দেলোয়ার জাহান। তিনি বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, বিশেষ উপায়ে মাটি প্রস্তুত করে কোনো ধরনের রাসায়নিক সারের ব্যবহার ছাড়াই খুব কম সময়ে এই পদ্ধতিতে কৃত্রিম বন তৈরি করা যায়, যা ঘন করে রোপণ করার কারণে একশ বছরের একটি ঘন বনের আকার ধারণ করে দশ বছরেই।
ডিএনসিসির এই মিয়াওয়াকি পদ্ধতিতে বনায়নের উদ্যোগ একটি সঠিক সিদ্ধান্ত। এখন শুধু সঠিকভাবে প্রকল্পটি চালিয়ে নিয়ে যেতে হবে। তবে খেয়াল রাখতে হবে কোনো বিদেশি গাছ যেন এ বনায়নে না থাকে। আর মাঝপথে যেন এটি থেমে না যায়।
লেখক: ড. বিভূতি ভূষণ মিত্র (পরিবেশ বিষয়ক লেখক)