আদ্-দ্বীন হাসপাতাল। ফাইল ছবি
মাথাব্যথা একটি শারীরিক সমস্যা। এটি অনেক মানুষেরই থাকে। আবার ভিন্ন কোনো রোগের উপসর্গ হিসেবেও কারও কারও মাথাব্যথা হতে পারে। অসুখ-বিসুখ যেমন রয়েছে তেমনি রয়েছে তার প্রতিবিধান করার ব্যবস্থা।
চিকিৎসকগণ রোগ নির্ণয় করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাপত্র দেন। কখনও ওষুধ সেবনের পরামর্শ দেন, আবার রোগের গুরুত্ব বুঝে দিয়ে থাকেন অস্ত্রোপচারের ব্যবস্থাপত্র। তবে মাথাব্যথা যত তীব্রই হোক, কোনো চিকিৎসক রোগীকে মাথা কেটে ফেলার প্রেসক্রিপশন দেন না। তবে বাংলাদেশ বলে কথা। এখানে সময়ে সময়ে এমনসব ঘটনা ঘটে, যা বিবেকবান মানুষকে বিস্ময়ে হতভম্ব করে দেয়।
তেমনি ঘটনা ঘটেছে দেশের খ্যাতনামা চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান আদ্-দ্বীন হাসপাতাল ঘিরে। প্রসূতি সেবা ও শিশুদের চিকিৎসার জন্য ইতোমধ্যে দেশজোড়া খ্যাতি অর্জনকারী এই হাসপাতালটিকে কেন্দ্র করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে একটি মহিলা মেডিকেল কলেজও, যেখানে কয়েকশ শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করেন। সম্প্রতি একটি দুর্ঘটনায় ওই হাসপাতালে ছয় শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনা জনমনে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়। দাবি ওঠে এসব শিশুর মৃত্যুর জন্য যারা দায়ী তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের। সারা দেশে এমন একজন মানুষও খুঁজে পাওয়া যাবে না, যিনি ওই ঘটনায় বেদনার্ত ও ক্ষুব্ধ হননি। কিন্তু অবাক কাণ্ড হলো, যেখানে দেশবাসীর দাবি ছিল দায়িত্বে অবহেলা কিংবা অব্যবস্থাপনার জন্য দায়ী চিকিৎসক ও কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ ও নিহত শিশুদের পরিবারগুলোকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দান, সেখানে আমাদের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় হাসপাতালটির লাইসেন্সই বাতিল করে দিয়েছে। শুধু তাই নয়, সেখানে চিকিৎসাধীন রোগীদের তিন দিনের মধ্যে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ারও নির্দেশ দেয়। ফলে হাসপাতালটিতে চিকিৎসাধীন ও সেখানে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীরা যে চরম ভোগান্তির শিকার হয়েছেন তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
সে ভয়াবহ চিত্রই তুলে ধরা হয়েছে গতকাল প্রকাশিত প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর বিশেষ প্রতিবেদনে। তাতে বলা হয়েছে, চিকিৎসার্থী শিশু ছাড়াও সেখানে কিডনি ডায়ালাইসিস সেবার জন্য যারা আসতেন তারাও পড়েছেন মহা সংকটে। কেননা, দেশের অন্যান্য হাসপাতালে যেখানে একবার ডায়ালাইসিস করতে ব্যয় হয় সাড়ে তিন থেকে চার হাজার টাকা, সেখানে আদ্-দ্বীন হাসপাতালে নেওয়া হয় ২৫০ থেকে ৪০০ টাকা। ৭০০ বেডের এ হাসপাতালটিতে প্রতিদিন দুই থেকে আড়াই হাজার রোগী চিকিৎসাসেবা নিত। তা ছাড়া ১৮০টি বেড রয়েছে দুস্থ রোগীদের বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার জন্য। হাসপাতালটি প্রসিদ্ধি লাভ করেছিল মূলত প্রসূতি সেবার জন্য। ফলে শুধু ঢাকা মহানগর নয়, দেশের দূরদূরান্ত থেকে সন্তানসম্ভবা মায়েরা এ হাসপাতালে আসতেন। সাশ্রয়ী উন্নত চিকিৎসা ও মানবিকসেবার জন্য হাসপাতালটি মানুষের কাছে নির্ভরতার প্রতীকে পরিণত হয়েছিল। কিন্তু একটি দুর্ঘটনা প্রতিষ্ঠানটিকে ঠেলে দিয়েছে মৃত্যুর মুখে। অনেক মৃত্যু পথযাত্রী রোগী আদ্-দ্বীন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে জীবন ফিরে পেলেও খোদ হাসপাতালটি মৃত্যুর মুখ থেকে বেঁচে ফিরতে পারবে কি নাÑ এ প্রশ্ন সচেতন দেশবাসীর।
দুর্ঘটনা কেউ ইচ্ছা করে ঘটায় না। যান্ত্রিক ত্রুটি, দায়িত্বরতদের অসতর্কতা-অবহেলা ইত্যাদি কারণে দুর্ঘটনা ঘটে। বিশেষ করে আদ্-দ্বীনের মতো নামকরা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এমন কোনো কাজ করার কথা নয়, যা তাদের প্রতিষ্ঠানের এতদিনের সুনামকে ক্ষুণ্ন করবে। তবে যেহেতু দুর্ঘটনা ঘটেছে এবং তাতে ছয়টি নবজাত শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে, সেজন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এ দায় এড়াতে পারে না। এজন্য অবশ্যই তাদের জেল-জরিমানাসহ কঠোর শাস্তি হতে হবে। তাই বলে একেবারে হাপাতালটিকেই হত্যা করতে হবে, এটা কেমন সিদ্ধান্ত? সুস্থ মস্তিষ্কের কোনো মানুষের পক্ষে এমন অবিচেনাপ্রসূত সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। চিকিৎসক নেতা ডাক্তার মো. মোসাদ্দেক হোসেন ডাম্বেল স্বাস্থ্য বিভাগের এ সিদ্ধান্তকে ‘মাথাব্যথার জন্য মাথা কেটে ফেলা’ হিসেবে মন্তব্য করেছেন। ডা. ডাম্বেলের এ মন্তব্য যে যথার্থ তা নিয়ে প্রশ্ন তোলার অবকাশ নেই। বরং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কেন এমন একটি জনবিরোধী পদক্ষেপ নিল, তার তদন্ত হওয়া দরকার। যেখানে দেশের স্বাস্থ্য খাতের অবস্থা লেজেগোবরে, মানুষ সুষ্ঠু চিকিৎসার সুযোগ পাচ্ছে না, সেখানে এমন একটি হাসপাতালকে সরকারি কর্তৃপক্ষীয় খড়গের আঘাতে হত্যা করাকে অসমীচীন শুধু নয়, নির্মম বলাটাই যুক্তিযুক্ত।
দেশবাসী সবিস্ময়ে অবলোকন করছে যে, রাষ্ট্রক্ষমতায় জনগণের ভোটে নির্বাচিত একটি সরকার থাকার পরও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এখনও পর্যন্ত এ ব্যাপারে কোনো বিকার প্রদর্শন করেনি। তারা কেন নির্বিকার থাকছে তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে। উত্থিত সে প্রশ্ন যে ধূমায়িত ক্ষোভে পরিণত হতে সময় লাগবে না এবং তা প্রচণ্ড বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে, তা সরকারের নীতিনির্ধারকদের অনুধাবন করা উচিত। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, আদ্-দ্বীন হাসপাতালের উদ্যোক্তা দেশের একটি বড় শিল্প-বাণিজ্য গ্রুপ হলেও এটি একটি দাতব্য প্রতিষ্ঠান। দেশের বিশিষ্ট নাগরিকদের সমন্বয়ে গঠিত একটি ট্রাস্টি বোর্ড হাসপাতালটি পরিচালনা করে। এ ধরনের দাতব্য প্রতিষ্ঠান আমাদের দেশে এখন খুব একটা নেই। এমন অবস্থায় আদ্-দ্বীন হাসপাতাল বন্ধ হয়ে যাওয়া হবে ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’। আমরা মনে করি, এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া প্রয়োজন। যাতে কর্তৃপক্ষীয় অবিমৃশ্যকারী সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপের কারণে মানুষের জীবন রক্ষাকারী একটি হাসপাতাল মর্মান্তিক মৃত্যুবরণ না করে।
সম্পাদকীয়