সাংবাদিক নাদিম হত্যার দুই মাস
শেরপুর প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৬ আগস্ট ২০২৩ ১৯:২৮ পিএম
আপডেট : ১৬ আগস্ট ২০২৩ ১৯:৫২ পিএম
নিহত সাংবাদিক গোলাম রাব্বানী নাদিম। ফাইল ছবি
জামালপুরের বকশিগঞ্জের পাটহাটিতে সাংবাদিক গোলাম রব্বানী নাদিম হত্যার দুইমাস পার হলেও এখনো গ্রেপ্তার হয়নি বেশিরভাগ আসামি। এতে নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাচ্ছেন পরিবারের সদস্যরা।
চলতি বছরের ১৪ জুন রাতে পেশাগত দায়িত্ব পালন শেষে বাড়ি ফেরার পথে সন্ত্রাসীদের হামলার শিকার হন গোলাম রব্বানী নাদিম। পরের দিন ১৫ জুন ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তিনি মারা যান। ১৭ জুন বকশিগঞ্জ থানার সাধুরপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাহমুদুল আলম বাবুসহ ২২ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত আরও ২০ থেকে ২৫ জনকে আসামি করে মামলা করেন নাদিমের স্ত্রী মনিরা বেগম। এজাহারভুক্ত ৫ আসামিসহ ১৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হলেও অধরা রয়েছেন অন্যরা।
এদিকে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয় প্রধান আসামি সাধুরপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের বহিস্কৃত চেয়ারম্যান বাবুসহ তিন জন। জামালপুর চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে তিনবার জামিনেরও আবেদন করেছেন বাবুসহ কয়েকজন। সেখানে জামিন না পেয়ে সম্প্রতি উচ্চ আদালত থেকে জামিনে পেয়েছেন এজাহারভুক্ত চার আসামি।
বেশিরভাগ আসামি এখনো অধরা থাকায় এবং চার আসামি জামিন পাওয়ায় নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন সাংবাদিক পরিবারটি।
নাদিমের অনার্স পড়ুয়া মেয়ে রাব্বিলাতুল জান্নাত ও তার স্ত্রী মনিরা বেগম জানান, হত্যাকাণ্ডের দুই মাস পার হলেও এখনো ধরা ছোঁয়ার বাইরে প্রধান আসামি বাবুর ছেলে রিফাত, রাকি বিল্লাহ রাকিব, লিপন মিয়া, স্বপন মন্ডলসহ এজাহারভুক্ত বেশিরভাগ আসামি। এরই মধ্যে চারজন জামিন নিয়ে আসায় প্রাণ ভয়ে থাকতে হচ্ছে। প্রশাসনও শুধু আশ্বাস দিয়ে যাচ্ছে।
নাদিমের মেয়ে রাব্বিলাতুল জান্নাত প্রতিদিনের বাংলাদেশকে কান্নাজড়িত কন্ঠে বলেন ‘আব্বুর রুমে আসলে সবসময় আব্বুর কথা মনে পড়ে। আমাদের বাসার সব জিনিসের মধ্যে আব্বুর স্মৃতি জড়িত। টিভিতে বকশিগঞ্জের কোনো খবর হলে, বকশিগঞ্জে কোনো অতিথি আসলে ওই ছবিগুলো ফেসবুকে বা বিভিন্ন মাধ্যমে দেখি। তখন বার বার মনে হয়, আব্বু বেঁচে থাকলে এই জায়গায় যেতেন, নিউজ কাভার করতেন। বন্যার সময় দুর্গত মানুষদের চিত্র তুরে ধরতেন।’
বাবা হত্যার ৬০ দিন প্রসঙ্গে জান্নাত বলেন, ‘সময় যতো যাচ্ছে পরিস্থিতি যেন স্বাভাবিক হয়ে যাচ্ছে। বিষয়টি প্রথম দিকে যেমন সবার মুখে মুখে ছিল, আসামিদের গ্রেপ্তারের দাবিতে সাংবাদিকরা কয়েক সপ্তাহ আন্দোলন করেছেন। এখন আর ওরকম নাই, অনেকটাই বিস্মৃত হয়ে যাচ্ছে। আত্মীয় স্বজন, আর দু’একজন সাংবাদিক আছেন; যারা মাঝে মাঝে আসেন, খোঁজখবর নেন। এর বাইরে কেউ আসেন না, খোঁজখবরও নেন না। আব্বুর ঘটনা প্রায় ভুলেই যাচ্ছেন।
তিনি বলেন, আস্তে আস্তে সবাই ভুলে যাবে এবং ঘটনা ধামাচাপা পড়ে যাবে অন্যান্য ঘটনার মত। এমনটা হওয়ার কথা নয়, কিন্তু বাস্তবতা এমনটাই। আর এজহারভুক্ত ২২ জনের মধ্যে ৫ জনকে গ্রেপ্তার করলেও বাকিরা অধরা। সবাইকে গ্রেপ্তারের দাবি জানাচ্ছি। একই সঙ্গে সারা দেশের সাংবাদিকদের সহযোগিতা চাচ্ছি।
নাদিমের ছেলে আব্দুল্লাহ আল মামুন রিফাত বলেন, প্রতি মুহূর্তে বাবার কথা মনে পড়ে, বাবার অভাব বোধ করি। দুঃখের বিষয় দুই মাস হয়ে গেলেও কেউ আমাদের খোঁজ নেয় না, সাহায্য করে না। বাবা হত্যার ঘটনা দিনদিন ধামাচাপা পড়ে যাচ্ছে।
নাদিমের স্ত্রী মনিরা বেগম বলেন, মামলা করার আগ পর্যন্ত পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। মামলার পর এজাহারভুক্ত কোনো আসামি গ্রেপ্তার হয়নি। এসপি স্যারের কাছে গিয়েছি, মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে গিয়েছি। তারা সবাই বলেছে, এজাহারভুক্ত আসামিদের ধরা হবে। তাদের আইনের আওতায় আনা হবে। আমাকে প্রশাসন বার বার আস্থা আর ভরসা রাখতে বলেছে। আস্থা-ভরসা থাকলেও এখন পর্যন্ত কোনো আসামি ধরা হয়নি। এর মধ্যে চারজন হাইকোর্ট থেকে জামিনে এসেছেন। তাহলে আমি এখন আর কোন আশায় থাকব। ধীরে ধীরে সব আসামি জামিনে আসতে পারে। কেউ ধরা পড়ছে না। এজাহারভুক্ত আসামিদের যেন দ্রুত গ্রেপ্তার করা হয় সে অনুরোধ করছি। তারা জামিনে আসায় আমরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি।
কান্না জড়িত কণ্ঠে নিহত নাদিমের মা আলেয়া বেগম প্রতিদিনের বাংণাদেশকে বলেন, ‘আমার সোনার টুকরা ছেলেকে মেরে ফেলার দুই মাস হল। এখন পর্যন্ত আসামি ধরা হল না। অনেক আসামি বাকি আছে। হাইকোর্ট থেকে জামিন এসে ওরা আমাদের হুমকি ধামকি দিচ্ছে। আমরা এখন অনেক আতঙ্কে আছি। আসামিরা যেন দ্রুত গ্রেপ্তার হয়। মরার আগে ছেলে হত্যার বিচার যেন দেখে যেতে পারি।
এজাহারভুক্ত আসামিদের গ্রেপ্তার করতে না পাড়ায় ক্ষুব্ধ জেলার সাংবাদিকরা। দ্রুত সকল আসামিকে আইনের আওতায় আনার দাবি করেন তারা।
জামালপুর অনলাইন জার্নালিস্ট নেটওয়ার্কের সভাপতি জাহাঙ্গীর সেলিম বলেন, ‘পাঁচজন আসামি হাইকোর্ট থেকে জামিন নিয়েছেন। পলাতক অন্য আসামিরা দেশেই আছে। পুলিশ কেনো তাদের গ্রেপ্তার করতে পারছে না তা বোধগম্য নয়। আমরা অনতিবিলম্বে এজাহারভুক্ত সকল আসামিকে গ্রেপ্তারের দাবি জানাচ্ছি।
বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি মনজুরুল আহসান বুলবুল নাদিমের পরিবারের নিরাপত্তার ব্যাপারে বলেন, ‘এখনো বেশিরভাগ আসামি অধরা। তাদেরকে দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি জানাই। নাদিমের পরিবারের নিরাপত্তার ভার স্থানীয় উপজেলা চেয়ারম্যান, স্থানীয় প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতাদের নিতে হবে। আর বিচারের ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাংবাদিক নেতাদের নিয়ে কথা বলার ব্যাপারেও জানান তিনি।
জানতে চাইলে জামালপুরের পুলিশ সুপার মো. কামরুজ্জামান বলেন ‘এই মামলার প্রতিটি আসামিকে গ্রেপ্তার করেই তদন্ত কাজ শেষ করব। আমাদের কার্যক্রম চলমান আছে। যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব মামলা শেষ করার ব্যবস্থা নেব।