প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০২ মে ২০২৬ ২১:২৮ পিএম
আপডেট : ০২ মে ২০২৬ ২১:৩৬ পিএম
বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস উপলক্ষে শনিবার বিকালে জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন। ছবি: ফেসবুক থেকে নেওয়া।
তথ্য সরবরাহের চেয়ে তথ্যকে নিজের মনের মাধুরি মিশিয়ে প্রকাশের প্রবণতা মোকাবিলা করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ বলে মন্তব্য করেছেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন।
বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস উপলক্ষে শনিবার বিকালে জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ মন্তব্য করেন মন্ত্রী।
‘স্বাধীন গণমাধ্যমের নতুন চ্যালেঞ্জ অপতথ্য: আমাদের করণীয়’ শীর্ষক সেমিনারটি বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে) ও ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিইউজে) যৌথভাবে আয়োজন করে।
ডিইউজের সাধারণ সম্পাদক খুরশিদ আলমের সঞ্চালনায় ও সংগঠনের সভাপতি শহীদুল ইসলামের সভাপতিত্বে সভায় আরও বক্তব্য রাখেন দৈনিক প্রতিদিনের বাংলাদেশের সম্পাদক মারুফ কামাল খান, যুগান্তরের সম্পাদক কবি আব্দুল হাই শিকদার, বিএফইউজে মহাসচিব কাদের গণি চৌধুরী, সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বাসির জামাল, ডিইউজে নেতা এলাহি নেওয়াজ খান সাজুসহ আরও অনেকে।
আলোচনা সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন প্রধান তথ্য কর্মকর্তা সৈয়দ আবদাল আহমেদ।
আলোচনা সভায় তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, “বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রক্রিয়া ঝুলেছিল। এখন তা পুনরায় চালু করা হচ্ছে। গণমাধ্যমই জনগণের প্রত্যাশাকে জীবন্ত রাখতে পারে।”
তিনি বলেন, “তথ্য হচ্ছে পানি, তা ধারণ করার জন্য বিভিন্ন রঙের গ্লাস থাকে। কিন্তু কে কোন রঙের পাত্রে রেখে জনগণকে দেখাবেন সেটিই প্রশ্ন।”
সিভিলাইজেশনের জন্য ফ্রি ইনফরমেশন ও ক্লিন ইনফরমেশন জরুরি উল্লেখ করে জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, “তথ্য সরবরাহের চেয়ে তথ্যকে নিজের মনের মাধুরি মিশিয়ে প্রকাশের প্রবণতা মোকাবিলা করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।”
তথ্যমন্ত্রী বলেন, “স্বাধীন গণমাধ্যম তৈরি সরকারের দায়িত্ব, এক্ষেত্রে সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ। তবে মুক্ত গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ স্টেকহোল্ডারদের একত্রিত করা। যাদের সহযোগিতায় মুক্ত এবং দায়িত্বশীল গণমাধ্যম তৈরি সম্ভব।”
গণমাধ্যম বস্তুনিষ্ঠ তথ্য সরবরাহ কর পারলে অপতথ্যকে প্রতিহত করা সম্ভব বলেও মন্তব্য করেন মন্ত্রী।
মন্ত্রী বলেন, “বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রক্রিয়া একসময় ‘হ্যাং’ হয়ে গিয়েছিল। একটি রক্তাক্ত পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রকে নতুন করে ‘রিস্টার্ট’ করা হয়েছে। একটি ভোট ডাকাতির পার্লামেন্ট বিদায় নিতে বাধ্য হয়েছে এবং জনগণ অবাধ ভোটের মাধ্যমে একটি নির্বাচিত সরকারকে দায়িত্ব দিয়েছে।”
তথ্যমন্ত্রী তার বক্তব্যে দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে স্মার্ট ডিভাইসের সঙ্গে তুলনা করে বলেন, “ডিভাইস যখন হ্যাজ়ার্ড বা হ্যাং হয়ে যায়, তখন যেমন রিস্টার্ট পয়েন্ট দিতে হয়, বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছে।”
তিনি বলেন, “আমরা সৌভাগ্যবান যে আমাদের নেতা দেশনায়ক তারেক রহমান প্রথমবারের মতো এমপি হয়ে এই রিস্টার্টেড স্টেটকে লিড করতে সংসদ নেতার আসনে এবং প্রধানমন্ত্রীর চেয়ারে বসেছেন।”
জহির উদ্দিন স্বপন গণমাধ্যমকে রাষ্ট্রের চতুর্থ এবং ‘অদৃশ্য’ স্তম্ভ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, “আধুনিক সভ্য রাষ্ট্রের তিনটি দৃশ্যমান স্তম্ভ—নির্বাহী, আইন ও বিচার বিভাগের পাশাপাশি গণমাধ্যমের ভূমিকা অনস্বীকার্য।”
নরডিক দেশগুলোর উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, “সেসব দেশে গণমাধ্যমের কোনো আনুষ্ঠানিক স্তম্ভ না হলেও একে এমনভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করা হয় যে, তা অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে জবাবদিহিতার মধ্যে রাখে।”
প্রতিদিনের বাংলাদেশের সম্পাদক মারুফ কামাল খান বলেন, “আমরা এখন পোস্ট ট্রুথ যুগে বসবাস করছি। এখানে অপতথ্য রোধ করা একটি কঠিন চ্যালেঞ্জ। গণমাধ্যম কেবল তথ্য ও সংবাদের বণিক নয়। গণমাধ্যমের আরও দায়িত্ব ও কর্তব্য হচ্ছে, সুষ্ঠু জনমত গঠন, নাগরিকদের শিক্ষিত ও সচেতন করা এবং তাদেরকে শুদ্ধভাবে আমোদিত করা।”
তিনি বলেন, “ট্রাডিশনাল ও মূলধারার গণমাধ্যম প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক এই দুইভাগে বিভক্ত। এরমধ্যে আছে ছাপা সংবাদপত্র ও সাময়িকী এবং রেডিও-টেলিভিশন। পরে অনলাইন নিউজ পোর্টালগুলো মূলধারার গণমাধ্যম হিসেবে গণ্য হতে শুরু করে।”
তিনি বলেন, “মিডিয়া মানেই স্বাধীন মিডিয়া। পরাধীন মিডিয়া কখনও গণমাধ্যম হতে পারে না। ইতিহাস আমাদেরকে মনে করিয়ে দেয় যে, আমাদের দেশে গণতন্ত্রেও সঙ্গে মিডিয়ার স্বাধীনতাও বার বার মুখ থুবড়ে পড়েছে। স্বাধীনতার পর মুজিব আমলে গণতন্ত্রেও বিনাশের মাধ্যমে রাজতান্ত্রিক ধাঁচের একদলীয় বাকশাল শাসন জারির পটভূমিতে স্বাধীন সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যমকে টুটি টিপে হত্যা করা হয়েছিল।
“তারপর সেই দুর্বিনীত ক্ষমতার পালাবদল ঘটলে গণমাধ্যম ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতাসহ মুজিবের হাতে কেড়ে নেওয়া সব অধিকার সামরিক ফরমান জারি করে ফেরত দিতে হয়েছিল। কাজেই আমাদেও অভিজ্ঞতা হচ্ছে সরকার কেবল মিডিয়ার স্বাধীনতা কেড়ে নেয়না, ফিরিয়েও দেয়।”
মারুফ কামাল খান বলেন, “সরকার ছাড়াও সামাজিক দুর্বৃত্তরা অনেক সময় গণমাধ্যমের স্বাধীনতার অন্তরায় হয়। নিরাপত্তাহীন ভীতিকর পরিবেশ ও আতঙ্ক গণমাধ্যমের স্বাধীনতাকে ব্যাপকভাবে বিঘ্নিত করে। বিজ্ঞাপনদাতাসহ গণমাধ্যমের রাজস্ব আয়ের উৎসগুলোও কখনও কখনও স্বাধীনতার পথকে কঠিন করে তুলে। গণমাধ্যম কর্মীদেও ব্যক্তিগত লালসা এবং লোভের কাছে আত্মসমর্পণের কারণেও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা স্খলিত হয়। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে গণমাধ্যম মালিকদের ভূমিকা। বলা হয়ে থাকে আগে বিত্তশালীরা পাহারাদার হিসেবে লাঠিয়াল ও কুকুর পুষতেন। এখন পোষেন মিডিয়া ও সাংবাদিক। এ এক লজ্জাকর নিষ্ঠুর বাস্তবতা।”
তিনি বলেন, “অপতথ্যকে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। আমি এর সঙ্গে একমত। মিডিয়া হবার কথা নির্ভুল তথ্যেও যোগানদাতা। মিডিয়া সঠিক তথ্য নাগরিকদের জানাবে এবং বিভ্রান্তি দূর করবে। আমি মনে করি উপযুক্ত আইনের যথাযথ প্রয়োগে মূলধারার গণমাধ্যমকে অপতথ্য থেকে বিরত রাখা সম্ভব।”
প্রতিদিনের বাংলাদেশের সম্পাদক আরও বলেন, “অপতথ্য ছড়াবার সবচেয়ে বড় মাধ্যম হচ্ছে এখন বিকল্প ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। কোনো রকম সম্পাদনা ছাড়া যাচাইহীন অসংখ্য অপতথ্য প্রতিনিয়ত বিদ্যুৎগতিতে ডিজিটাল প্লাটফর্মগুলোতে ছড়িয়ে পড়ছে। এতে নাগরিকদের মর্যাদাহানি হচ্ছে, জনমত বিকৃত হচ্ছে, উত্তেজনা-অস্থিরতা বাড়াচ্ছে, ঘৃণা বিদ্বেষ হানাহানি ছড়াচ্ছে। অবক্ষয়ের শিকার হচ্ছে নতুন প্রজন্ম।”
তিনি বলেন, “সকল মাধ্যমে অপতথ্যের সবচেয়ে বড় উৎস হচ্ছে অপরাজনীতি। জনসমাজে যদি সত্য প্রবাহিত থাকে, মানুষ যদি নির্ভুল তথ্য জানতে পারে তাহলে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া তার পক্ষে সহজ হয়। কিন্তু অপরাজনীতি জনসাধারণকে বিভ্রান্ত করতে চায়।”