বইমেলা
সেলিম আহমেদ
প্রকাশ : ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ ১১:১৮ এএম
আপডেট : ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ ১১:২৪ এএম
একুশে বইমেলার তৃতীয় দিন শনিবারের সকাল ছিল শুধুই শিশুদের জন্য। শিশুচত্বরের শিশুপ্রহরে প্রিয় সন্তানকে বই দেখাচ্ছেন বাবা-মা। প্রবা ফটো
এবার অমর একুশে বইমেলা যে জমবে তার ইঙ্গিত পাওয়া গেল। মেলার তৃতীয় দিন গতকাল শনিবার ছিল সাপ্তাহিক ছুটির দিন। আর ছুটির দিন মানেই জমজমাট মেলা। তা-ই দেখা গেল। সকালে ছিল শিশুপ্রহর, যথারীতি ছোটরা মেতেছিল শিশুচত্বরে। আর বিকালে ছোট-বড় লেখক, প্রকাশক আর পাঠকদের সরব উপস্থিতি জানান দিচ্ছিল এবার প্রকাশকদের মুখে হাসি ফুটবে। মেট্রোরেলের সুবিধা এবার বাড়তি মাত্রা যোগ করেছে। রাজধানীর একটি বিরাট অংশের মানুষ সহজেই চলে আসছে। মেলায় যারাই আসছেন, ঘুরেফিরে দেখছেন, ছবি তুলছেন, আড্ডা দিচ্ছেন। তার মধ্যেও যা বিক্রি হচ্ছে তাতে খুশি প্রকাশকরা।
মেলায় আসতে শুরু করেছে নতুন নতুন বই। গতকাল ছুটির দিনে মেলা শুরু হয়ে যায় বেলা ১১টায়। শিশুচত্বরে দেখা দেয় কোলাহল। দুপুরে এখানে কথা হয় উত্তরা থেকে দুই সন্তানকে নিয়ে মেলায় আসা নিজামুল হকের সঙ্গে। তিনি জানান, প্রতি বছরই দুই ছেলে মেলায় আসতে চাইত। কিন্তু যানজটের ভয়ে খুব একটা নিয়ে আসা হতো না। এবার মেট্রোরেল থাকায় খুব সহজে নিয়ে এসেছি। সিসিমপুরের বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধুলার পর তাদের কিছু বই কিনে দেব। যাতে পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি অন্য বইয়ের সঙ্গে পরিচিত হতে পারে।
দুপুর গড়িয়ে বিকাল হতেই বইপ্রেমীদের আনাগোনা আর ঘোরাফেরায় মুখর হয়ে ওঠে মেলা প্রাঙ্গণ। বেশিরভাগ পাঠককে দেখা গেল পছন্দের বই, প্রিয় লেখকের বই কবে আসবে খোঁজ নিচ্ছেন। জিনিয়াস পাবলিকেশনের সামনে কথা হয় একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তাজনুভা আক্তারের সঙ্গে। জানালেন তিনিও এসেছেন রাজধানীর উত্তরা এলাকা থেকে। মেট্রোরেলের সুবিধার কথাও জানালেন। তিনি জানান, নিজে লেখালেখির চর্চা করেন। তাই বইমেলার প্রতি অন্যরকম আগ্রহ রয়েছে। মেলায় এলে অনেক লেখক-গুণীজনের সান্নিধ্য পাওয়া যায়। আগের বছরগুলোতে যানজটের কারণে দুই-তিন দিনের বেশি আসা হতো না। এখন মেট্রোরেলে সহজেই আসা যাচ্ছে। বললেন, দুই ছুটির দিনেই এলাম। এখন ইচ্ছে হলেই চলে আসতে পারব, এবার আসব নিয়মিত।
অন্বেষা প্রকাশনীর প্রকাশক শাহাদাত হোসেন জানান, মেলায় সাধারণত প্রথম দুই সপ্তাহের মধ্যে সব নতুন বই চলে আসে। এরপর থেকেই শুরু হয় বেচাকেনা। তবে এবার শুরুতেই যে বেচাকেনা হচ্ছে তাতে আমরা সন্তুষ্ট।
এবারের বইমেলা নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করলেন লেখকরাও। লেখক স্বকৃত নোমান বলেন, প্রথম দিন বৃষ্টির জন্য অনেকেই বইমেলায় আসতে পারেননি। তবে দ্বিতীয় ও তৃতীয় দিন আবহাওয়া ভালো থাকায় অনেক পাঠক আসতে দেখা গেছে। আবার বইমেলাকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের পাশাপাশি বিদেশ থেকেও অনেক লেখক এসেছেন। সবার প্রাণবন্ত উপস্থিতি জানান দিচ্ছে এবারের মেলা খুব ভালো হবে।
তবে মেলার তিন দিন পার হয়ে গেলেও এখনও পুরোপুরি প্রস্তুত হয়নি বইমেলা। মেলা প্রাঙ্গণে কোনো ডাস্টবিন না বসানোর কারণে যত্রতত্র ময়লা আবর্জনা ফেলছে মানুষ। এখনও চলছে স্টল, মেলা মাঠে অস্থায়ী মসজিদ, খাবারের দোকান নির্মাণের কাজ। পড়ে আছে নির্মাণসামগ্রী এবং বালু। বইমেলায় আসা রিয়াদ আহমদ বলেন, কোথাও তো ডাস্টবিন নেই। যে যেখানে পারছে উচ্ছিষ্ট ফেলছে। এভাবে মেলার সৌন্দর্য নষ্ট হচ্ছে। দ্রুত বিষয়টি সমাধান হওয়া জরুরি।
এ প্রসঙ্গে মেলা পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব ড. কে এম মুজাহিদুল ইসলাম বলেন, কিছু কাজ বাকি রয়েছে, আশা করছি আজকালের মধ্যে সমাধান হবে।
৭৪ নতুন বই
তৃতীয় দিনে মেলায় ৭৪টি নতুন বই এসেছে বলে জানিয়েছে বাংলা একাডেমি। উল্লেখযোগ্য বইগুলোর মধ্যে বাংলা একাডেমি এনেছে মুহম্মদ নূরুল হুদা সম্পাদিত বইমেলায় প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া বক্তৃতার সংকলন ‘প্রাণের মেলায় শেখ হাসিনা’। অন্যপ্রকাশ মেলায় এনেছে গোলাম মুরশিদের ‘নারী ধর্ম ইত্যাদি’, আবুল আহসান চৌধুরীর ‘বিদ্যাসাগর বঙ্কিমচন্দ্র রবীন্দ্রনাথ ও মুসলমান সমাজ’, হাসনাত আবদুল হাইয়ের ভ্রমণবিষয়ক ‘একদা সোভিয়েত ইউনিয়নে’, অসীম সাহার ছড়া ‘চরম গরম ছড়া’ ও ফরিদুর রেজা সাগরের উপন্যাস ‘রহিম সাহেবের হাত ও আরেক পৃথিবী’।
আগামী প্রকাশনী এনেছে আনোয়ারা সৈয়দ হকের ‘শ্রেষ্ঠ উপন্যাস’, মোনায়েম সরকারের ‘মুক্তিযুদ্ধের কত স্মৃতি কত কথা’ ও রফিকুর রশীদের ‘মুক্তিযুদ্ধের গল্পসমগ্র’।
ঐতিহ্য এনেছে মহিউদ্দিন আহমদের ‘তেহাত্তরের নির্বাচন’। সময় প্রকাশনী এনেছে গুলতেকিন খানের কবিতার বই ‘ছন্দে লেখা মানা’। পাঠক সমাবেশ প্রকাশ করেছে কামাল চৌধুরীর প্রবন্ধের বই ‘কবিতার অন্বেষণ কবিতার কৌশল’। পুঁথিনিলয় প্রকাশনী থেকে এসেছে আতিউর রহমানের রাজনীতিবিষয়ক গ্রন্থ ‘বাংলাদেশ নেতৃত্বের পরম্পরা ও উন্নয়ন’। অনিন্দ্যপ্রকাশ এনেছে মোশতাক আহমেদের প্যারাসাইকোলজি ‘হারানো জোছনার সুর’।
লেখক বলছি
মেলার তৃতীয় দিনে শুরু হলো লেখকদের নিয়ে মুখোমুখি অনুষ্ঠান ‘লেখক বলছি’। গতকালের অনুষ্ঠানে নিজেদের নতুন বই নিয়ে আলোচনা করেন কথাসাহিত্যিক ও অনুবাদক সালেহা চৌধুরী, কবি সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল, লালনগবেষক আবু ইসহাক হোসেন এবং কবি ও প্রাবন্ধিক মামুন মুস্তাফা।
মেলা মঞ্চের আয়োজন
গতকাল বিকালে বইমেলার মূলমঞ্চে ছিল ‘দ্বিশতজন্মবার্ষিক শ্রদ্ধাঞ্জলি : মাইকেল মধুসূদন দত্ত’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। এতে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন রফিকউল্লাহ খান। বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক মুহম্মদ নূরুল হুদার সভাপতিত্বে আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন খসরু পারভেজ এবং হোসনে আরা।
প্রাবন্ধিক বলেন, বাংলা সাহিত্যে মাইকেল মধুসূদন-বিচার কেবল মননশীল সাহিত্য-সমালোচনার বিষয় নয়, সমগ্র ঊনবিংশ শতাব্দীর ব্যক্তিসত্তা, সমাজসত্তা ও সৃষ্টিশীলতার জাগরণ এবং সাহিত্যের প্রায় সবগুলো রূপের উন্মেষ ও প্রতিষ্ঠার বহুমুখী পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও সাফল্যের ইতিবৃত্ত। নাটক, আখ্যান-কাব্য, গীতিকবিতা, চতুর্দশপদী, পত্র-কাব্য, গ্রিক মহাকাব্যের গদ্যানুবাদ, ইংরেজি রচনা ও চিঠিপত্র মিলিয়ে তার সৃষ্টিশীল প্রতিভার প্রকাশরূপ বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়িত হয়েছে। তার কিংবদন্তিতুল্য জীবন ও কর্মের সম্পূর্ণ বাস্তবসম্মত রূপ অঙ্কনের প্রয়াস আজও চলমান।
সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে কবিতা পাঠ করেন কবি নাসির আহমেদ, তারিক সুজাত, শাহনাজ মুন্নী এবং নাহার মনিকা। আবৃত্তি পরিবেশন করেন আবৃত্তিশিল্পী মিলন কান্তি দে, শাহাদাৎ হোসেন নিপু এবং আফরোজা কণা। এ ছাড়া ছিল ঝর্ণা আলমগীরের পরিচালনায় সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘ক্রান্তি শিল্পীগোষ্ঠী’ এবং লক্ষ্মীকান্ত হাওলাদারের পরিচালনায় সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘শেখ রাসেল ললিতকলা একাডেমি’-এর পরিবেশনা।
রবিবারের আয়োজন
আজ রবিবার বইমেলার চতুর্থ দিন। মেলা শুরু হবে বেলা ৩টায়, চলবে রাত ৯টা পর্যন্ত। বিকাল ৪টায় বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে ‘স্মরণ : কাঙাল হরিনাথ মজুমদার’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। এতে প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন তপন মজুমদার। অধ্যাপক মুনতাসীর মামুনের সভাপতিত্বে আলোচনায় অংশ নেবেন জাফর ওয়াজেদ এবং আমিনুর রহমান সুলতান।