× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ জাতীয় রাজনীতি সারা দেশ আন্তর্জাতিক অর্থনীতি খেলা বিনোদন মতামত চাকরি-ক্যারিয়ার শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

প্রয়াণ দিবস

নিতান্ত মাটির সেই সোনার মোহর

ইমতিয়ার শামীম

প্রকাশ : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৩ ০৯:২৪ এএম

আপডেট : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৩ ২০:৫২ পিএম

সৈয়দ শামসুল হক (২৭ ডিসেম্বর ১৯৩৫-২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৬)

সৈয়দ শামসুল হক (২৭ ডিসেম্বর ১৯৩৫-২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৬)

হিসেবের দরকার হয় না, লেখাই একসময় বলতে থাকে, লেখকের বয়স বেড়ে চলেছে। এমনকি এ-ও বোঝা যায়, লেখকের মৃত্যু ঘটেছে। কিন্তু সৈয়দ শামসুল হকের কি কখনও বয়স বাড়ে, কখনও কি মৃত্যু ঘটে? বরং দেখি তাঁর অন্তদর্শনই দিনকে দিন ছড়িয়ে পড়ছে গ্রাম-গ্রামান্তরের ধূলিধূসর পথে; দেখি খাঁ খাঁ দুপুরে অচিন এক বাউলের মন নিয়ে পা ফেলছে কৃষক, শ্রমজীবী কিংবা সাধারণজন; তারা গাইছেন সৈয়দ হকের লেখা গান, ‘তোরা দেখ, তোরা দেখ, তোরা দেখরে চাহিয়া/চোখ থাকিতে এমন কানা কেমন করিয়া’। এত ব্যাপ্ত তিনি বিষয় আর ভাষাতে, আঙ্গিক আর আধারে, সেই সঙ্গে অনুভবের উদ্‌গিরণে যে, প্রতিবারই নতুনের রেশ জেগে ওঠে তার নির্মাণযজ্ঞে। মনেই হয় না তাঁর মৃত্যু ঘটেছে। তার কাছ থেকেই ঋণ নিয়ে বলতে হয়, ‘মানুষ এমন তয়, একবার পাইবার পর/ নিতান্ত মাটির মনে হয় তার সোনার মোহর।’

সোনার মোহর তিনি,Ñ কিন্তু ইহজাগতিক বাদানুবাদে মাটি মনে হয়। তবে মাটিও তো আরাধ্য হয়ে ওঠে, মাটির টানে আমরা ফিরে ফিরে আসি, মানুষকে হতে বলি মৃত্তিকামুখী। মাটি না কি সোনা, এ-রকম আপাতবৈপরীত্যের মধ্য দিয়ে সৈয়দ হক তাই যেকোনো মৃত্যুবার্ষিকীতে, যেকোনো জন্মবার্ষিকীতে যেন তাঁর প্রথম বয়সেই আটকে থাকেন। আমাদের কয়েক প্রজন্মের সঙ্গে তিনি জড়িয়ে আছেন নানা আবেগময়তার কারণেও। আবেগের বাইরে দাঁড়িয়ে তাঁর সাহিত্যকে মূল্যায়ন করা তাই আমাদের জন্যে কঠিনই বটে। আমরা শুধু পারি কিছু ইঙ্গিত দিতে।

সৈয়দ হকের সাহিত্যের সঙ্গে ব্যাপক পাঠকের পরিচয় ঘটেছে ‘খেলারাম খেলে যা’-র মধ্য দিয়ে। ষাট বা সত্তরের দশকে, গড়পড়তা পাঠক যখন সামাজিক বাস্তবতাবাদী সাহিত্যধারার মুখাপেক্ষী, ব্যক্তি তখন উপেক্ষিত উপন্যাস ও গল্প থেকে। ব্যক্তিকে সামাজিক, শ্রেণি ও রাজনৈতিক সমষ্টিগত পরিপ্রেক্ষিত থেকে উন্মোচিত করার আগ্রহই তখন প্রবল কথাসাহিত্যিকদের মধ্যে। তখনকার পাঠকমনন তাই ‘খেলারাম খেলে যা’কে নিয়েছে অস্বস্তিকর এক উপন্যাস হিসেবে। হাসান আজিজুল হক এটিকে দেখেছেন ‘রাগী উপন্যাস’হিসেবে। সংশয়ী হই তাতে, উপন্যাসটি সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট কোনো সিদ্ধান্ত খুঁজে পাই না তাতে, উপন্যাসের বাবর আলী চরিত্রটির মতোই শক্ত এক খোলসে আবৃত মনে হয় ‘রাগী উপন্যাস’শব্দবন্ধটিকে। ‘রাগী’যেন ‘অস্বস্তির’ই বিকল্প স্বস্তিকর এক শব্দ হয়ে উঠতে থাকে। 

ষাটের দশকে বাংলাদেশের শিল্পকলায় বিমূর্তধারার শিল্পচর্চাকারীদের যেমন বিরূপতার মুখে পড়তে হয়েছিল, সৈয়দ হককেও তেমন এক বিরূপতার মধ্যে পড়তে হয় ‘খেলারাম খেলে যা’ লিখে। বোধ করি সময়ের বেশ আগেই উপন্যাসটি লিখে ফেলেছিলেন তিনি। পুঁজির গোলকধাঁধায় ব্যক্তি মধ্যবিত্তের মনন কিংবা ব্যক্তির দুঃখকষ্টের গন্তব্য ও পরিণতি চিন্তা করার ক্ষমতা ও আগ্রহ অনেকেরই ছিল না তখন। কি পাঠক কি শিল্পসাহিত্য চর্চাকারী প্রায় সবারই তখন পক্ষপাত ও সহানুভূতি ছিল মধ্যবিত্তের বিকাশমান শ্রেণিগত বৈভবের দিকে, সমষ্টিগত সামাজিক-রাজনৈতিক গন্তব্যের দিকে। আর সেই গন্তব্যে সামান্যই ছিল হোঁচট খেতে থাকা, পিছলে পড়তে থাকা ব্যক্তির স্থান। তাই সচিত্র সন্ধানীতে যখন ‘খেলারাম খেলে যা’বেরিয়েছিল, অনেকের ভ্রু কুঁচকে উঠেছিল, কারো কারো কাছে তা ছিল নেহাৎই বিনোদন কিংবা লেখকের দৃষ্টি আকর্ষণ করার প্রচেষ্টামাত্র। অথচ ভারতবিভক্তির মধ্য দিয়ে গঠিত নতুন ভূখণ্ডে যে বাঙালি মধ্যবিত্ত সমাজ নিকট ভবিষ্যতেই পুঁজির দাপটে এর পুঁজিমগ্ন সংস্কৃতির উদ্দামতায় কী ভীষণ নষ্ট হবে আবার একই সময়ে দেশবিভক্তির স্মৃতিতে ভেতরে ভেতরে কী ভয়ংকরভাবে ক্ষতবিক্ষত হবে, ‘খেলারাম খেলে যা’ হলো সেই ভবিষ্যৎকথন। কেতাদুরস্ত মধ্যবিত্তের আগ্রহ আসলে নিভৃতে লুকিয়েচুরিয়ে যৌনতার আস্বাদ পাওয়ার দিকে; তাই ‘খেলারাম খেলে যা’তাকে আগ্রহী করেছে, আবার অস্বস্তিতেও ফেলে দিয়েছে।

কিন্তু সৈয়দ শামসুল হক আটকে থাকেননি ‘খেলারাম খেলে যা’তে, যেমন আটকে থাকেননি প্রথম গল্পের বই ‘তাস’-এ; আটকে থাকেননি তার প্রথম কবিতার বই ‘বৈশাখে রচিত পংক্তিমালা’য়। বারবার নিজের সঙ্গেই তিনি নেমেছেন বর্ণন, আঙ্গিক ও নিরীক্ষার দৌড়ে। আমার মতো অনেকেই আছেন, যাদের সঙ্গে সৈয়দ শামসুল হকের পরিচয় ‘খেলারাম খেলে যা’র মধ্য দিয়ে নয়। তাদের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ‘নিষিদ্ধ লোবান’কিংবা ‘নীল দংশন’দিয়ে, ‘পরানের গহীন ভেতর’ দিয়ে, ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’ দিয়ে। এইভাবে সৈয়দ হক কয়েকটি প্রজন্মের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছেন আবেগের সম্পর্কে। বিশেষত সাপ্তাহিক সচিত্র সন্ধানী ও দৈনিক সংবাদ-এর সংবাদ সাময়িকীর সুবাদে সত্তর ও আশির দশকে সৈয়দ শামসুল হক বাংলাদেশের এক দমবন্ধ করা রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নীরব এক সাংস্কৃতিক পরিপ্রেক্ষিত তৈরি করেন। দৈনিক সংবাদের সাহিত্য সাময়িকীতে ধারাবাহিকভাবে ‘বৃষ্টি ও বিদ্রোহীগণ’লিখে, আশির দশকের শুরুতে সাপ্তাহিক বিচিত্রায় ‘স্মৃতিমেধ’উপন্যাস লিখে তিনি তরুণদের যে কী উদ্দীপ্ত করেছিলেন, তা এখনও হিসেব করা হয়নি। দুঃসহ এক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তিনি ‘স্মৃতিমেধ’উপন্যাসে লিখেছিলেন, ‘...বিশ্বাস থেকে বাস্তব যখন অন্তর্হিত হয়ে যায় তখন সে বড় দুঃসময় আমাদের।’ 

লালনের মতো ১১৬ বছর বাঁচতে চেয়েছিলেন তিনি। বেঁচে যে আছেন, তাতে কোনো সংশয় থাকে না, যখন দেখি এদেশের কোটি কোটি মানুষের চিন্তাচেতনার সঙ্গে, সাংস্কৃতিক আস্বাদের সঙ্গে তিনি মিশে গেছেন তাঁর সংগীতের মধ্য দিয়ে। কৃষক-শ্রমিকরা এখনও গায়, ভবিষ্যতেও গাইবে ‘হায় রে মানুষ রঙিন ফানুস’। সাধক-উদ্বাস্তুরা এখনও গায়, ভবিষ্যতেও গাইবে ‘তোরা দেখ, তোরা দেখ, তোরা দেখরে চাহিয়া’। শিশু আত্মহারা হয়ে নাচতে নাচতে এখনও গায়, ভবিষ্যতেও গাইবে ‘এমন মজা হয় না, গায়ে সোনার গয়না’। এই কৃষক, সাধক-বাউল, শিশুর দল নিজের অজান্তেই আয়ু বাড়িয়ে চলেছেন সৈয়দ হকের। সৈয়দ হক লিখেছেন, ‘‘...দরকার, একটি বিশ্বাস, একটি দর্শন, একটি দৃষ্টিভঙ্গি। এই বিশ্বাস, এই দৃষ্টিভঙ্গি যাঁর আছে, গল্প তাঁকে খুঁজতে হয় না; তাঁকে বরং বেশি করে ভাবতে হয়, কোন গল্প লিখব আর কোন গল্প লিখব না। গল্প লেখকের মাথার ভেতরে জন্ম নেয় না, মাথার ভেতরে থাকে না, গল্প পড়ে আছে লেখকের চারপাশে, এত গল্প যে, একজীবনে সব লিখে ফেলার আশা করাও মূর্খতা।’’ গল্পকাররা জানে, এর চেয়ে বড় সত্য নেই। তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে, তাঁর মৃত্যুদিনে তাই বড় বেশি করে মনে পড়ে তাঁরই পঙ্‌ক্তি, ‘এমন পত্র কি নাই বাক্যে যার নাই নিরাময়/এমন শস্য কি নাই যার বীজ বোনে নাই চাষা/এমন মৃত্যু কি নাই যাতে নাই খোয়াবের লয়?’

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা