হাসনাত মোবারক
প্রকাশ : ২০ এপ্রিল ২০২৬ ১৫:২৩ পিএম
বাংলা একাডেমিতে রবিবার নাসির আলী মামুনের একক প্রদর্শনীতে জাতীয় কবির ছবির সামনে দুই দর্শক। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
বাংলা একাডেমির নজরুল মঞ্চের সামনে দাঁড়াতেই বর্ধমান হাউসের গায়ে চোখ আটকে যায়Ñলম্বা একটা পিভিসি ব্যানারে। যেখানে লেখা ‘ফটোজিয়াম: স্মৃতি-বিস্মৃতির মুখচ্ছবিÑনাসির আলী মামুনের ৬৭তম একক প্রদর্শনী।’ ‘এই ভবনেই কাজী নজরুল ইসলাম থেকেছেন, কিছুদিন’, সঙ্গীকে বলি। উত্তরে তিনি তথ্য যুক্ত করেন, ‘কবির বন্ধু কাজী মোতাহার হোসেনও থাকতেন এই ভবনে। কবি তো একবার প্রতিভা বসুদের ওয়ারীর বাড়ি থেকে ফেরার পথে স্থানীয় গুন্ডাদের কবলে পড়েন। এরপর হামলাকারীদের পিটিয়ে কবি দৌড়ে এই বর্ধমান হাউসে ওঠেন। রবীন্দ্রনাথ ১৯২৬ সালে ঢাকা এসেছিলেন। তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অতিথি হিসেবে এই বাড়িতেই অবস্থান করেন তিনি।’
হ্যাঁ ঐতিহাসিকভাবেও এই ভবনের গুরুত্ব বিস্তর। শুধু সাংস্কৃতিক ব্যক্তিদের পদচারণা নয়, রাজনৈতিক বহু ঘটনার সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে এই ভবনের। ইতিহাসের জাবর কাটতে কাটতে আমরা ঢুকে পড়ি বর্ধমান হাউসের নিচতলার দক্ষিণ কক্ষে। যেখানে চলছে নাসির আলী মামুনের তোলা আলোকচিত্র প্রদর্শনী। ঢুকেই চোখ আটকে গেল কবি কাজী নজরুল ইসলামের ছবিতে। সমস্বরে বলে উঠি, ‘একটু আগেই যাকে নিয়ে কথা। প্রদর্শনীতেও তার ছবি।’ আমাদের দেখে আলোকচিত্রী নাসির আলী মামুন এগিয়ে এলেন। বললেন, ‘এই ছবিটা তোলা কবির শেষ বয়সে।’ ‘কবিকে সামানাসামনি দেখেছেন! কি সৌভাগ্য আপনার! বিখ্যাত কবি, সাহিত্যিক ও রাজনৈতিকের ছবি তোলার কত গল্পই না আপনার কাছে জমা আছে। কবে বলবেন। শুনতে চাই’, এমন কথার উত্তরে তিনি বলেন, একটু দেরি করেন। শোনাব। প্রজেক্টরে ষোলো মিনিটের একটা ভিডিও আছে। এইটাও একটু চালু করে দিই।’
আমরা দেয়ালের গায়ে ঝুলে থাকা ছবির মুখগুলো দেখতে থাকি। হঠাৎ ভেসে আসে কবিতা আবৃত্তির শব্দ। প্রজেক্টরের সামনে গিয়ে দেখি কবি শামসুর রাহমান কবিতা আবৃত্তি করছেন। আমাদের দেখে আলোকচিত্রী বলেন, ‘রাহমান ভাইয়ের এটা দুর্লভ ভিডিও। ১৯৯৫ সালে নিউইয়র্কে করেছিলাম।’ এর মধ্যে ডিভাইস থেকে ভেসে আসে আল মাহমুদের কবিতা আবৃত্তি। নাসির আলী মামুন তখন আবেগমথিত কণ্ঠে বলেন,‘শুনছেন, কবির কণ্ঠে কত দরদ!’ এই ভিডিও ফুটেজ দেখে শিল্পী মাসুদুর রহমান পাশ থেকে বলে ওঠেন, ‘এই প্রদর্শনীর মাধ্যমে অতীতের সময়টা যেন আবার জীবন্ত হয়ে উঠল। সামনে এলেন শামসুর রাহমান, আল মাহমুদসহ আমাদের বরেণ্য কবি সাহিত্যিকরা।’
বরেণ্যেদের মুখচ্ছবি তুলতে ক্যামেরা নিয়ে দিনের পর দিন ছুটে চলেছেন নাসির আলী মামুন। তিনি কীভাবে এই খ্যাতিমানদের সংস্পর্শে পৌঁছালেন, জানতে চাই এর পেছনের গল্প। তিনি বলেন, ‘আমি কারো ছবি তুলতে যাওয়ার আগে তার বাড়ি, ঘর, পড়ার টেবিল, আসবাবপত্র নানান কিছু আগেই থেকেই স্ক্যান করে পৌঁছাতাম। পছন্দ অপছন্দ অর্থাৎ তার মনকে পড়ার চেষ্টা করতাম।’ হাসি যোগ করে বলেন ‘অনেকটা গুপ্তচরের মতো।’ দীর্ঘদিন আগে তোলা এই ছবির মানুষগুলোর নেগিটিভ যখন বের করি, তাদের সঙ্গে কাটানো মুহূর্তগুলো ভেসে ওঠে চোখের সামনে।’
প্রদর্শনীর ছবিগুলো খুটিয়ে খুটিয়ে দেখছে রাজধানীর উদয়ন উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী আহনাফ। সে তার বাবার সঙ্গে এসেছে। ছবি দেখে তার চোখে মুখে ভর করছে রাজ্যের বিস্ময় ও কৌতূহল। তাকে প্রশ্ন করি, এখানে কেমন লাগছে? উত্তরে সে বলে, ‘এখানকার বেশিরভাগ কবিদের নামই আমি বই পড়ে জেনেছি। কিন্তু তাদের এমন ছবি বইয়ের পাতায় কোনোদিন দেখিনি।’ স্মিত হেসে আহনাফ আবারও বলে ‘আর তাছাড়া কবিদের ছবির নিচের তাদের পরিচয় পড়ে আমি অনেক কিছু জেনে নিলাম। আমার মতো ছাত্ররা এখানে এলে সবচেয়ে বেশি উপকার পাবে। জ্ঞান অর্জনের অনেক কিছুই আছে এখানে।’
১৪ এপ্রিল শুরু হওয়া এই প্রদশর্নীতে ঠাঁই পেয়েছে কাজী নজরুল ইসলাম, কাজী মোতাহার হোসেন, জসীমউদ্দীন, আবুল ফজল, বন্দে আলী মিঞা, শামসুর রাহমান, সন্জীদা খাতুন, ড. আশরাফ সিদ্দিকী, সৈয়দ শামুসল হক, আল মাহমুদ, বেলাল চৌধুরী, মনুজরে মওলা, রফিক আজাদ, আহমদ ছফা, হেলাল হাফিজ, হুমায়ূন আহমেদসহ ৮৫ জন খ্যাতিমান ব্যক্তির দুর্লভ আলোকচিত্র। ২০ তারিখ পর্যন্ত সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত দর্শনার্থীর জন্য উন্মুক্ত থাকবে গ্যালারির দুয়ার। আর ২১ এপ্রিল থেকে ৩০ এপ্রিল, প্রতিদিন সকাল নয়টা থেকে বিকাল চারটা পর্যন্ত প্রদশর্নী কক্ষ সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে।