রামিসা হত্যা
বোরহান উদ্দিন মাহমুদ
প্রকাশ : ৮ ঘণ্টা আগে
আপডেট : ৭ ঘণ্টা আগে
প্রতীকী ছবি
ঢাকার পল্লবীতে দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী রামিসাকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় এক অনন্য নজির স্থাপন করেছেন আদালত। অভিযোগ গঠনের মাত্র তিন দিনের মাথায় এই চাঞ্চল্যকর মামলার রায়ের দিন ধার্য করা হয়েছে।
ঢাকার মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন আগামী ৭ জুন আলোচিত এই মামলার রায় ঘোষণার তারিখ নির্ধারণ করেছেন। বাংলাদেশের বিচারিক ইতিহাসে এটিকে অন্যতম দ্রুততম ফৌজদারি বিচার হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
দ্রুততম বিচারের পথে মাইলফলক
দেশের বিচার ব্যবস্থায় নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলাগুলো দীর্ঘসূত্রতার কারণে প্রায়ই সমালোচিত হয়। তবে রামিসা হত্যা মামলার বিচারিক তৎপরতা সেই চিত্র বদলে দিচ্ছে। ইতিপূর্বে বাগেরহাটে সাত কার্যদিবস এবং মাগুরায় ২১ দিনের মধ্যে রায় হওয়ার নজির থাকলেও, অভিযোগ গঠনের মাত্র তিন দিনের মাথায় রায়ের তারিখ ঘোষণার ঘটনাটি আইন অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
ঘটনার প্রেক্ষাপট ও তদন্ত
মামলার নথিপত্র অনুযায়ী, গত ১৯ মে পল্লবীর একটি বহুতল ভবনে নৃশংস এই হত্যাকাণ্ড ঘটে। পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী আট বছরের রামিসা সকালে ঘর থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয়। পরে প্রতিবেশীর কক্ষের দরজা ভেঙে রামিসার মস্তকবিহীন দেহ এবং একটি বালতির ভেতর থেকে তার বিচ্ছিন্ন মাথা উদ্ধার করা হয়।
ঘটনার দিনই রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা পল্লবী থানায় মামলা করেন। পুলিশ দ্রুত তদন্ত শেষ করে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) জমা দেয়। গত ২৪ মে ট্রাইব্যুনাল দুই আসামির বিরুদ্ধে দেওয়া চার্জশিট আমলে নেয়। মামলায় রাষ্ট্রপক্ষে মোট ১৮ জন সাক্ষী রাখা হয়।
বিরল বিচারিক প্রক্রিয়া
এই মামলার বিচারিক কার্যক্রম ছিল অভাবনীয় দ্রুত। গত ২ জুন মাত্র এক দিনেই ১৮ জন সাক্ষীর মধ্যে ১৬ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ সম্পন্ন হয়। সাক্ষ্য দেন নিহত শিশুর বাবা-মা, স্বজন, প্রতিবেশী, চিকিৎসক ও তদন্তকারী পুলিশ কর্মকর্তারা। ৩ ও ৪ জুন আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থন ও উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে আদালত ৭ জুন রায়ের দিন ধার্য করেন।
আইনজীবীদের পর্যবেক্ষণ
দ্রুত বিচার সম্পন্ন হওয়াকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন আইন বিশেষজ্ঞরা। তবে তারা মনে করেন, গতির পাশাপাশি ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ওমর ফারুক ফারুকী বলেন, এই শিশুটির (রামিসা) সঙ্গে যা হয়েছে এর বর্ণনা শুনে পুরো দেশের মানুষ স্তব্ধ। এ নৃশংস ঘটনা যারা ঘটিয়েছে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হোক এটা সবার চাওয়া। যারা সাক্ষী দিয়েছে তারা ঘটনার ভয়াবহ বর্ণনা দিতে গিয়ে বারবার আপ্লুত হয়েছেন। আদালতেও এজলাসের বাইরে উপস্থিত সকলেই এই নৃশংসতার বর্ণনা শুনে অঝোরে কেঁদেছেন।
প্রসিকিউটর ফারুকী বলেন, এটা একটা চাঞ্চল্যকর মামলা। আমি মনে করি সরকার এখানে যথেষ্ট আন্তরিক। ঘটনার পরপরই আসামিদের গ্রেপ্তার, আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন জমা ও পরবর্তীতে বিচার শুরু প্রক্রিয়া যৌক্তিকভাবে দ্রুততম সময়ে হয়েছে। সাক্ষ্যগ্রহণ শুরুর প্রথম দিনেই সমাপ্ত করা গেছে। এখানে আদালতের আন্তরিকতা, সাক্ষীদের স্ব-প্রণোদিত অংশগ্রহণ ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, আসামিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত হবে। দেশের মানুষ ন্যায়বিচার চায়, বিচার ব্যবস্থায় আস্থা রাখতে চায়। দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত হলে সমাজে এমন ঘৃণ্য অপরাধ প্রবণতা কমে আসবে।
আসামি গ্রেপ্তার ও স্বীকারোক্তি
হত্যাকাণ্ডের পরপরই পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে স্বপ্না নামে এক নারীকে হেফাজতে নেয়। পরে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে সোহেল রানা নামে আরেক আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রাথমিক তদন্তে জানা যায়, রামিসা স্কুল যাওয়ার উদ্দেশ্যে বের হলে স্বপ্না তাকে কৌশলে ঘরে ডেকে নিয়ে যায় এবং সেখানে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়।
আগামী ৭ জুন ঘোষিত হতে যাওয়া এই রায়ের মধ্য দিয়ে রামিসার পরিবার কাঙ্ক্ষিত ন্যায়বিচার পাবে কি না—এখন সেই অপেক্ষাতেই রয়েছে পুরো দেশ।