মাসুদুল হাসান
প্রকাশ : ২৮ নভেম্বর ২০২৫ ১০:৪৫ এএম
রাষ্ট্রের প্রধান আইন পরামর্শক অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান পদত্যাগ করে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ঘোষণা দেওয়ার পর এ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছে নানা আলোচনা। গত বছরের ৮ আগস্ট বিএনপির মানবাধিকার বিষয়ক সম্পাদক পদ ছেড়ে অ্যাটর্নি জেনারেল পদে দায়িত্ব গ্রহণকারী ঝিনাইদহ-১ আসন থেকে নির্বাচন করবেন বলে জানিয়েছেন। নির্বাচনে অংশ নেওয়ার আগে তিনি সত্যিই পদত্যাগ করবেন কি না, তা নিয়ে যেমন আলোচনা হচ্ছে, তেমনি পরবর্তী অ্যাটর্নি জেনারেল কে হতে পারেন, তা নিয়েও চলেছে ব্যাপক জল্পনাকল্পনা।
গত ৫ নভেম্বর নিজের কার্যালয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে আলোচনার সময় অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান পদ ছেড়ে জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেওয়ার আগ্রহের কথা জানান। তবে পরের দিন ৬ নভেম্বর তত্ত্বাবধায়ক সরকার ফেরাতে রাষ্ট্রপক্ষের আপিল শুনানির পর তিনি আবার মন্তব্য করেন যে, ‘অ্যাটর্নি জেনারেল পদে থেকেও নির্বাচন করা যায়। সংবিধানে এতে কোনো বাধা নেই।’
এমন প্রেক্ষাপটে অ্যাটর্নি জেনারেল পদটি ঘিরে নানা সমীকরণ তৈরি হয়েছে। এটি এখনও সুস্পষ্ট নয় যে, বিএনপি থেকে মনোনয়নপ্রত্যাশী মো. আসাদুজ্জামান নির্বাচনের আগেই পদত্যাগ করবেন কি না। তবে প্রকাশ্যে না বললেও অনেকেই এ পদটির দায়িত্বভার নেওয়ার জন্যে আগ্রহ দেখাচ্ছেন এবং নেপথ্যে দেনদরবারও করছেন বলে জানা গেছে।
স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত ১৭ জন কর্মকর্তা এই গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। বেশিরভাগ সময়েই সরকার সমর্থিত ব্যক্তি ও দলীয় আস্থাভাজন কেউ না কেউ পদটিতে বসেছেন। অবশ্য খ্যাতিমান আইনজীবীরাও এ পদে দায়িত্ব পালনের নজির রয়েছে। এর আগে অ্যাটর্নি জেনারেল পদে ছিলেন আবু মোহাম্মদ আমিন উদ্দিন। তিনি গত আওয়ামী লীগ সরকারের আস্থাভাজন ছিলেন। তার আগে ২০০৯ সাল থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত টানা ১১ বছর অ্যাটর্নি জেনারেল পদে দায়িত্ব পালন করেন মাহবুবে আলম। তিনিও আওয়ামী লীগ সরকারের আস্থা ভাজন ছিলেন। বিএনপি সরকারের ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের মেয়াদে এই পদে ছিলেন ফিদা এম কামাল ও সালাহ উদ্দিন আহমাদ।
আইনে যা আছে
এ বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ‘ক্ষমতায় (পদে) থেকেও অ্যাটর্নি জেনারেল সংসদ নির্বাচন করতে পারবেন, এখানে অস্পষ্টতার কিছু নেই।’ নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘অ্যাটর্নি জেনারেল সরকারের কর্মচারী নন, সংবিধানের ৬৪ অনুচ্ছেদ অনুসারে রাষ্ট্রের আইনজীবী। অ্যাটর্নি জেনারেল ক্ষমতায় থেকেও নির্বাচন করতে পারেন। এখানে কোনো অস্পষ্টতা কিছু নেই। এটা সেটেল ল।’
আলোচনায় আছেন যারা
বিভিন্ন সূত্র জানাচ্ছে, ভবিষ্যতের সম্ভাব্য অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে যারা আলোচনায় রয়েছেন তাদের মধ্যে বর্তমান অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মুহাম্মদ আব্দুল জব্বার ভূঞা, মোহাম্মদ আরশাদুর রউফ, মোহাম্মদ অনীক রূশদ হক অন্যতম। এ ছাড়া আলোচনায় রয়েছেন ব্যারিস্টার আব্দুল্লাহ আল মামুন, সিনিয়র অ্যাডভোকেট সালাহউদ্দিন দোলন, ব্যারিস্টার বদরুদ্দোজা বাদল। সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সম্পাদক, বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের এক্সিকিউটিভ কমিটির চেয়ারম্যান সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজলের নামও রয়েছে আলোচনায়।
এ বিষয়ে ব্যারিস্টার কাজল প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘অ্যাটর্নি জেনারেলের পদটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্রের প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তি কখনও এ ব্যাপারে আমার মতামত জানতে চাইলে তখনকার পরিস্থিতি অনুযায়ী মন্তব্য করব।’
সিনিয়র অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আরশাদুর রউফ সাবেক বিচারপতি ও সাবেক সফল প্রধান নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুর রউফের ছেলে। এ পদের জন্যে অনেকের কাছে তারও গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে বলে আলোচনায় উঠে এসেছে।
ব্যারিস্টার আব্দুল্লাহ আল মামুন বারের সুপরিচিতি সুনামধন্য আইনজীবী। তিনি শেখ মুজিব হত্যা মামলা ও জাতীয় চার নেতা হত্যা মামলাসহ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসেরও তিনি আইনজীবী। সিনিয়র অ্যাডভোকেট সালাহউদ্দিন দোলন ‘সার্ভিস ম্যাটার’ সংক্রান্ত মামলার জন্য খ্যাতি অর্জন করেছেন।
পদ শূন্য হলে ভবিষ্যতে এই পদে বসার বিষয়ে অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার অনিক আর হক বলেন, ‘রাষ্ট্র যদি আমাকে যোগ্য মনে করে, সেটা রাষ্ট্রের বিবেচনার বিষয়; তবে ব্যক্তিগতভাবে এ পদে নিয়ে বিশেষ কোনো আগ্রহ নেই।’
অ্যাটর্নি জেনারেল পদে নতুন মুখ আসার সম্ভাবনা প্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরশেদ বলেন, ‘এটা বাংলাদেশের সাংবিধানিক পদ। বাংলাদেশে সরকার ও রাজনৈতিক দল সব সময় এক হয়ে যায়। যে দল ক্ষমতায় থাকে তারা আইন অঙ্গন প্রভাবিত করার চেষ্টা করে। আমি প্রত্যাশা করব, এমন ব্যক্তিকে অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে নির্বাচিত করা হবে, যিনি দলের পেছনে ঘুরবেন না, সুপ্রিম কোর্টকে দলের স্বার্থে ব্যবহার করবেন না।’ তিনি বলেন, ‘বিচার বিভাগের ওপর জনগণের আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। এই আস্থা পুনরুদ্ধার করতে হলে, একজন ভালো অ্যাটর্নি জেনারেল নিয়োগ দেওয়া প্রয়োজন, যিনি বিচার বিভাগে ইতিবাচক পরিবর্তনে ভূমিকা রাখতে পারবেন। একই সঙ্গে যিনি দলীয় মতামতের ঊর্ধ্বে থেকে এই উচ্চ আদালতে দেশের মানুষের কল্যাণের জন্য কাজ করতে পারবেন।’
আইনজীবী মনজিল মোরশেদ বলেন, ‘যদি বর্তমান অ্যাটর্নি জেনারেল পদে বসে জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেন, তাহলে সেটি আইন অঙ্গনের জন্য একটি বাজে উদাহরণ তৈরি করবে।’ আইন বিষয়ে অভিজ্ঞ খ্যাতিমান আইনজীবী মনজিল সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল মাহমুদুল ইসলামের উদাহরণ টেনে বলেন, ‘তার মতো একজন দক্ষ আইন কর্মকর্তা প্রয়োজন যারা সব রকম দলীয় ও ব্যক্তিগত প্রভাব এড়িয়ে জনগণের জন্য কাজ করবেন।