× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

মধ্যপ্রাচ্যে নতুন যুদ্ধের দামামা

রাসেল পারভেজ

প্রকাশ : ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ ১১:০৪ এএম

আপডেট : ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ ০০:৫৭ এএম

মধ্যপ্রাচ্যে নতুন যুদ্ধের দামামা

মধ্যপ্রাচ্যে নতুন যুদ্ধের দামামা বাজছে। ইরাক-সিরিয়ায় থাকা ইরানের স্থাপনাগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার ঘোষণা আসার পর সামরিক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। এদিকে সিরিয়ার সীমান্তঘেঁষা জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলায় তিন সেনা নিহতের প্রতিশোধ নিতে শুক্রবার (২ ফেব্রিুয়ারি) হামলা চালিয়েছে ওয়াশিংটন। ইরাক ও সিরিয়ায় অবস্থিত ইরানের বিভিন্ন স্থাপনায় বিমান হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রের এ হামলায় ইরান ও তার সমর্থক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো কীভাবে জবাব দেবেÑ তার ওপর যুদ্ধের মাত্রা নির্ভর করলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে নতুন যুদ্ধ শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, পুরো বিশ্বব্যবস্থায় বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে, তা বলাই যায়। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ এবং হামাস-ইসরায়েল যুদ্ধে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা যেভাবে বিঘ্নিত হয়েছে এবং তাতে দেশে দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ঘটিয়ে জীবনযাপন দুর্বিসহ হয়ে উঠেছে; তার মধ্যে আরেকটি যুদ্ধ পরিস্থিতি আরও কঠিন করে তুলবে।

গৃহযুদ্ধে ক্ষতবিক্ষত সিরিয়ায় বিশ্বশক্তিগুলোর ছায়াযুদ্ধ চলমান রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পশ্চিমা সামরিক জোট সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত রয়েছে। দেশটিতে কয়েক হাজার মার্কিন সেনা রয়েছে। সব মিলে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের যুক্তরাষ্ট্রের ৫০ হাজারের বেশি সেনা রয়েছে। 

অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট বাশারের পক্ষে রাশিয়া ও ইরান এবং তাদের সমর্থক গোষ্ঠীগুলো লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। ইরাকেও একই অবস্থা, যদিও সেখানে রাশিয়া অতটা সক্রিয় নয়। ইরানপন্থি বেশ কয়েকটি সশস্ত্র গোষ্ঠী দেশটিতে ‘যুক্তরাষ্ট্র খেদাও’ লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে হঠাৎ হামাস-ইসরায়েল সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি ও সমরনীতিতে বৈশ্বিক খেলোয়াড়দের অন্তর্ভুক্তি ঘটিয়ে পরিস্থিতিকে ক্রমেই বড় যুদ্ধের দিকে নিয়ে গেছে।

ফিলিস্তিনের গাজায় ২২ লাখ মানুষের ওপর ইসরায়েল যে নজিরবিহীন গণহত্যা অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে, তার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নেমেছে ইরানপন্থি শক্তিশালী কয়েকটি আঞ্চলিক গোষ্ঠী। এই গোষ্ঠীগুলো ‘অক্সিস রেসিসট্যান্স’ অর্থাৎ ‘প্রতিরোধ অক্ষ’ হিসেবে পরিচিত, যাদের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ইরান। ইসরায়েলের বিরুদ্ধে তারা সর্বদা সজাগ। ইসরায়েলকে সর্বাত্মক সহায়তা করায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি ও গোয়েন্দা স্থাপনায় বেশ কিছু হামলা চালিয়েছে এসব গোষ্ঠী। এতে করে আশঙ্কা করা হচ্ছিল, ফিলিস্তিনি গণহত্যা বন্ধ না হলে যুক্তরাষ্ট্র আরও বেশি আক্রান্ত হবে। ইরাকে সক্রিয় ইসলামিক রেসিসট্যান্স নামে প্রতিরোধ গোষ্ঠীর হামলায় তিন সেনা নিহত হওয়ায়র মধ্য দিয়ে সেই আশঙ্কা সত্যি হলো। এখন ঘোষণা দিয়েই যুদ্ধের ময়দানে নামতে হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রকে। যদিও এক্ষেত্রে ওয়াশিংটন সতর্ক দৃষ্টি রাখছেÑ যাতে যুদ্ধ পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে না পড়ে। তবে শেষ পর্যন্ত এই যুদ্ধ কী ধরনের মোড় নেবে, তা এখনই বলার উপায় নেই। কারণ, ইরান সাফ জানিয়ে দিয়েছেÑ তাদের জনগণ, সামরিক বাহিনী ও মিত্রদের বাঁচাতে যা যা করা দরকার, তা-ই করবে তারা। অর্থাৎ হামলার জবাব দিতে তেহরানও প্রস্তুত।

ইরাকে সক্রিয় শিয়া সশস্ত্র গোষ্ঠী ইসলামিক রেসিসট্যান্স মার্কিন সেনাঘাঁটিতে হামলার দায় স্বীকার করে দেওয়া বিবৃতিতে পরিষ্কার ভাষায় বলেছে, ফিলিস্তিনে গণহত্যা বন্ধের দাবিতে তারা সিরিয়া সীমান্তে জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে। অর্থাৎ গাজায় নির্বিচার হামলায় ইসরায়েলকে সহায়তার জবাব দিতে তারা করেছে বলে দাবি করা হচ্ছে। শুধু ইসলামিক রেসিসট্যান্স নয়, একই কারণে ইরানের প্রতিবেশী লেবানন ও ইয়েমেন থেকেও যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের মিত্রদের বিভিন্ন টার্গেটে হামলা করা হচ্ছে। লেবাননের সবচেয়ে বড় সামরিক গোষ্ঠী শিয়াপন্থি হিজবুল্লাহ গত বছরের অক্টোবর থেকে ইসরায়েলের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা করছে। ইসরায়েলও পাল্টা হামলা চালাচ্ছে। হিজবুল্লাহর সঙ্গে ইরানের ঘনিষ্ঠতার কথা সবাই জানে। তবে তাদের দাবি একটাইÑ গাজায় ইসরায়েল হামলা বন্ধ না করলেও তারাও হামলা চালিয়ে যাবে। এ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্থাপনায় এসব গোষ্ঠী ১৬০টির বেশি হামলা চালিয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের আরেক বড় মিত্র ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহী গোষ্ঠী। দেশটির অধিকাংশ অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করা এই গোষ্ঠী যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা যেসব দেশ ইসরায়েলকে গাজা উপত্যকায় হামলায় সহায়তা করছে, তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। এডেন উপসাগর ও লোহিত সাগরে ওই দেশের বাণিজ্যিক জাহাজে বড় বড় কিছু হামলা চালিয়েছে হুতি বাহিনী। পাল্টা হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য জোট। এই অবস্থায় ইরানও স্বস্তিতে নেই। দেশটির ভেতরে সম্প্রতি কিছু হামলা হয়েছে, যাতে প্রাণহানি উল্লেখ করার মতো। ফলে অভ্যন্তরীণ শত্রুদের বিরুদ্ধে ইরানকেও সজাগ থাকতে হচ্ছে। সম্প্রতি তারা সিরিয়া, ইরাক ও পাকিস্তানে ‘জঙ্গি আস্তানায়’ হামলা চালিয়েছে। এ নিয়ে পাকিস্তানের সঙ্গে সাময়িক সমস্যা হলেও দেশ দুটি পরীক্ষিত বন্ধু হওয়ায় সামরিক উত্তেজনা বেশি দূর গড়ায়নি।

তারপরও গত বছরের অক্টোবর মাস থেকে এই পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান সংঘাতে ১০টি দেশ কমবেশি জড়িয়ে পড়েছে। দেশগুলো হলোÑ জর্ডান, ইরান, ইসরায়েল, সিরিয়া, পাকিস্তান, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইরাক, লেবানন ও ইয়েমেন। ইসরায়েল ও তার পশ্চিমা মিত্রদের বিরুদ্ধে হামলায় জড়িয়ে পড়েছে ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠী হামাস, হিজবুল্লাহ, হুতি। আইএসের মতো সন্ত্রাসী গোষ্ঠীও সক্রিয় হয়ে উঠেছে। তবে তারা এই মুহূর্তে কার ইশারায় চলছে, সেটি নিশ্চিত নয়। আশঙ্কা রয়েছেÑ আইএস জঙ্গিদের ইরানের বিরুদ্ধে কাজে লাগাতে পারে যুক্তরাষ্ট্র। আইএস জঙ্গিরা কট্টর সুন্নিপন্থি। তারা ‘হত্যার বদলে হত্যা’, ‘চোখের বদলে চোখ’ নীতিতে বিশ্বাস করে। যুক্তরাষ্ট্রের হামলার মধ্যে আইএস আবার বর্বরতা শুরু করলে, তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলবে।

যুক্তরাষ্ট্রের হামলার প্রেক্ষাপটে ইরানের সঙ্গে যদি পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরু হয়, তাহলে বৈশ্বিক ব্যবস্থা আরও অস্থির হয়ে উঠবে। যুদ্ধ যদি ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে, সেক্ষেত্রে এই সাগরের দুই তীরের লিবিয়া, তুরস্ক, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ আরও দেশ তাতে জড়িয়ে পড়তে পারে। কারণ, ভূমধ্যসাগরে ব্রিটিশ-মার্কিন রণতরি মোতায়েন রয়েছে। এরই মধ্যে লোহিত সাগর যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। জ্বালানিবাহী বেশ কয়েকটি জাহাজ হুতিদের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, বেড়েছে জ্বালানির দাম।  

যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র মিসরও নতুন যুদ্ধ শুরু হলে তাতে জড়িয়ে পড়তে পারে। সুয়েজ খালে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা হলে মিসরের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বন্ধ হবে। ফলে পরিস্থিতি মিসরকে যুদ্ধে টেনে আনতে বাধ্য করবে।

মোটা দাগে ইরানের স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ইসরায়েলও পূর্ণমাত্রায় যোগ দেবে বলে ধরে নেওয়া যায়। সেক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকেও ইরান, লেবানন, সিরিয়া ও ইরাক থেকে চালানো হামলা প্রতিহত করতে হবে। যে কারণে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন যে সীমিত যুদ্ধের কথা বলছেন, তা হয়তো সীমিত না-ও থাকতে পারে। ইরাকে সক্রিয় ‘কাতাইব হিজবুল্লাহ’ খুবই শক্তিশালী শিয়াপন্থি আঞ্চলিক গোষ্ঠী। তাদের মতো ইরাকে অন্তত ৮০টি গোষ্ঠী রয়েছে, যারা সশস্ত্র লড়াইয়ে পারদর্শী। এসব গোষ্ঠী সিরিয়াতেও সক্রিয়। তারা ইরান ও সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশারের সমর্থনপুষ্ট হিসেবে ধরে নেওয়া হয়। এসব গোষ্ঠীকে সচল রাখতে ইরান তার জাতীয় বাজেটের একটি অংশ বরাদ্দ রাখে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক থিংকট্যাংক উইলসন সেন্টারের এক হিসাব মতে, প্রতি বছর তাদের ৩০ লাখ ডলারের মতো অর্থসহায়তা দেয় তেহরান। ফলে সীমিত হামলায় প্রতিশোধস্পৃহা নিবৃত্ত করে হাত ধুয়ে মধ্যপ্রাচ্য থেকে যুক্তরাষ্ট্র ফিরতে পারবে কি না, তা বলা মুশকিল।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ও গাজায় ইসরায়েলি গণহত্যা বড় ফ্যাক্টর হয়ে উঠেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে। ইসরায়েলকে নির্বিচার হামলা থেকে একমাত্র যুক্তরাষ্ট্রই থামাতে পারেÑ এ কথা কে না জানে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন তা না করে ইসরায়েলকে অস্ত্র ও অর্থ সহায়তা দিয়ে যাচ্ছেন। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও তার ক্ষমতা টেকাতে এবং কট্টর জায়নবাদীদের খুশি রাখতে হামাস নিধনের নামে ফিলিস্তিনি হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে ২৭ হাজার ফিলিস্তিনিকে হত্যা করার পরও সেই হামাসকে তারা কতটা নির্মূল করতে পেরেছে, তা নিয়ে সবার প্রশ্ন রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ বাঁধালে হামাসও তাদের একটি প্রতিপক্ষ হয়ে ইরানকে সহায়তা করবেÑ এতে কোনো সন্দেহ নেই।

এদিকে ইরানের সমর্থনপুষ্ট ইরাক সরকার তাদের মাটি থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারে ওয়াশিংটনকে চাপ দিচ্ছে। আরেকটি যুদ্ধের ডামাডোল শুরু হলে এই প্রক্রিয়া ব্যাহত হবে, আরও কয়েক বছর ইরাকের ঘাড়ে চেপে বসতে পারবে মার্কিন সেনারা। এর সুযোগ নেবে ইসরায়েল। যুক্তরাষ্ট্রের ঘাড়ে বন্দুক রেখে ফিলিস্তিনিদের জাতিগতভাবে নিশ্চিহ্ন করার পায়তারা জারি রাখতে পারবে। মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সঙ্গে সৌদি আরবের কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার যে পরিবেশ তৈরি হয়েছে, তাতেও বাগড়া দেওয়ার উপায় খুঁজবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। এসব ঘটনা প্রবাহের শিকার হবে বহু মানুষ; বাড়বে উদ্বাস্তু, শরণার্থী ও অনাহারির সংখ্যা।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা