সৌদি-ইরান চুক্তি
প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ১১ মার্চ ২০২৩ ২২:০৩ পিএম
আপডেট : ১১ মার্চ ২০২৩ ২২:১৫ পিএম
সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে সম্পর্ক পুনরুদ্ধারে চীনের মধ্যস্থতায় সংঘটিত আশ্চর্যজনক এই চুক্তি কেবল মধ্যপ্রাচ্যেই নয়, বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে বিশ্বরাজনীতিতে। যুক্তরাষ্ট্রকে অস্বস্তিতে ফেলে দেওয়া এই চুক্তির বিষয়ে বিশ্লেষকরা বলেছেন, ইয়েমেনের যুদ্ধ থেকে চীনের আঞ্চলিক তৎপরতা সবকিছুকেই স্পর্শ করবে এই চুক্তি। পাশাপাশি এই চুক্তির কারণে যুক্তরাষ্ট্র তার কৌশল পরিবর্তন করতে বাধ্য হতে পারে।
চুক্তি অনুযায়ী দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী সৌদি আরব ও ইরানের কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনরায় চালু এবং দুই মাসের মধ্যে দূতাবাস ও মিশন পুনরায় চালু করার কথা বলা হয়েছে।
২০১৬ সালে সৌদি আরব শিয়া ধর্মগুরু নিমর আল-নিমরের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার পর শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ ইরানের বিক্ষোভকারীরা সুন্নি সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ সৌদি আরবের কূটনৈতিক মিশনগুলোতে হামলা চালানোর পর দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক শেষ হয়।
ওই ঘটনার আগে থেকে রক্তক্ষয়ী বিরোধসহ মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি ইস্যুতে আঞ্চলিক শক্তিধর এই দেশ দুটি একে অপরের বিপরীতে অবস্থান নেয়। তাই শুক্রবারের ঘোষণাটি ছিল আরও বেশি অপ্রত্যাশিত।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের দিনা এসফান্দিয়ারি বলেন, সৌদিরা বিশেষভাবে হতাশ ছিল এবং তারা অনুভব করেছিল, ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনরুদ্ধার করাটা তাদের তুরুপের তাস। তাই মনে হচ্ছিল, এটি এমন কিছু যা থেকে তারা সরতে চায় না। তাদের কাছে যে এই তুরুপের তাস রয়েছে তার জন্য তারা খুশি।
এই চুক্তিকে মধ্যপ্রাচ্যের কূটনীতিতে একটি বড় অগ্রগতি বলে অভিহিত করেছেন বিশ্লেষক হুসেইন ইবাইশ।
চুক্তির প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়তে পারে ইয়েমেনে, যেখানে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট ২০১৫ সাল থেকে ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে লড়াই করছে।
প্রায় এক বছর আগে ঘোষিত একটি যুদ্ধবিরতি গত অক্টোবরে শেষ হয়ে গেছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে আলোচনা চলছে। এই আলোচনা একটি চুক্তিতে নিয়ে যেতে পারে বলে জল্পনা চলছে। ইরানের সঙ্গে চুক্তির কারণে রিয়াদ আংশিকভাবে যুদ্ধ থেকে সরে যেতে পারে বলে কূটনীতিকরা মনে করছেন।
অনেক বিশ্লেষক বলেছেন, ইয়েমেনের বিষয়ে সৌদি আরবের ছাড় না দেওয়ার মানসিকতা থাকলে দেশটি ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করতে রাজি হতো না।
ওয়াশিংটনের আরব গালফ স্টেটস ইনস্টিটিউটের (এজিএসআইডব্লিউ) সিনিয়র স্কলার ইবাইশ বলেন, খুব সম্ভবত ইয়েমেনে সংঘাত অবসানের জন্য তেহরানকে ইয়েমেনে তার মিত্রদের চাপ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিতে হয়েছে। তবে আমরা এখনও জানি না পর্দার অন্তরালে কী বোঝাপড়া হয়েছে।
ঝুঁকি গোয়েন্দা সংস্থা ভেরিস্ক ম্যাপলেক্রফ্টের টরবজর্ন সল্টভেট বলেছেন, তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে পারমাণবিক চুক্তি পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগের অভাবের কারণেও এটি আরও বেশি বোধগম্য হয়। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা কমার লক্ষণ না দেখে সৌদি আরব মনে করছে ইরানের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক রক্ষা করা প্রয়োজন।
সেঞ্চুরি ইন্টারন্যাশনাল থিংকট্যাংকের অ্যারন লুন্ড বলেছেন, এই চুক্তির প্রভাব সিরিয়ার আঞ্চলিক পুনঃএকত্রীকরণ পর্যন্ত প্রসারিত হতে পারে। সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের ইরান ঘনিষ্ঠতার কারণে সৌদি আরব এত দিন আংশিকভাবে ওই পুনঃএকত্রীকরণের বিরোধিতা করে এসেছে।
অ্যারন লুন্ড বলেন, এই বিষয়গুলো এ মুহূর্তে চুক্তিতে সংযুক্ত রয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়। তবে সৌদি-ইরানের শত্রুতা যত কমবে, সৌদি-সিরীয় সম্প্রীতিও তত বাড়বে।
বেশ কয়েকজন বিশ্লেষক বলেছেন, এই চুক্তির আঞ্চলিক প্রভাব কী, তার চেয়েও শুক্রবারের এই অগ্রগতি কীভাবে ঘটেছে সেটি তাৎপর্যপূর্ণ। চীনের মধ্যস্থতায় এই অপ্রত্যাশিত চুক্তি সম্ভব হয়েছে।
সৌদি বিশ্লেষকরা বলেছেন, চীনের ভূমিকা ইরানের সঙ্গে চুক্তিটি স্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনাকে বাড়িয়ে তুলেছে। চীন এখন এই চুক্তির ‘গডফাদার’ এবং এটির অনেক ওজন রয়েছে।
আটলান্টিক কাউন্সিলের সিনিয়র অনাবাসিক ফেলো জোনাথন ফুলটন বলেছেন, চুক্তিটি এই ইঙ্গিত দেয় যে, চীন এই অঞ্চলে একটি বৃহত্তর ভূমিকা নিতে প্রস্তুত। তিনি বলেন, এটি চীনের আঞ্চলিক উপস্থিতির ক্রমবর্ধমান আস্থার প্রতীক হতে পারে। কারণ চীন মনে করে, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রাধান্যকে চ্যালেঞ্জ করার জায়গা রয়েছে। যেকোনো বিচারে এটি চীনের জন্য একটি বড় কূটনৈতিক জয় বলে মনে হচ্ছে।
ইবাইশ বলেন, রিয়াদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েক দশকের পুরোনো অংশীদারত্ব রয়েছে। চীনের মধ্যস্থতায় ইরানের সঙ্গে সৌদির এই চুক্তি নিঃসন্দেহে ওয়াশিংটনকে অস্বস্তিতে ফেলে দিয়েছে।
তিনি বলেন, বাইডেন প্রশাসন মধ্যপ্রাচ্য, বিশেষ করে উপসাগরীয় অঞ্চলে সংঘাতের পরিবর্তে কূটনৈতিক পন্থার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেবে। সূত্র : এএফপি