আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির দাফন অনুষ্ঠান শুরু
খাতাম আল-আনবিয়া সেন্ট্রাল হেডকোয়ার্টার্স ও আইআরজিসি জানিয়েছে, আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির এই ঐতিহাসিক বিদায় অনুষ্ঠানে প্রায় তিন কোটি মানুষের সমাগম হতে পারে। ছবি: রয়টার্স
লাখো মানুষের কান্না, রাষ্ট্রীয় শোক, সাম্রাজ্যবাদবিরোধী প্রতিরোধের দৃঢ় সংকল্প আর জাতীয় ঐক্যের নজিরবিহীন প্রদর্শনীর মধ্য দিয়ে ইরানের রাজধানী তেহরানে আজ শুরু হচ্ছে দেশটির প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির ছয় দিনব্যাপী দাফন অনুষ্ঠান।
গত ফেব্রুয়ারি মাসে আমেরিকান-ইসরায়েলি জোটের আকস্মিক বিমান হামলায় ৮৬ বছর বয়সে শাহাদতবরণ করেন তিন যুগ ধরে ইরানের হাল ধরা এই দূরদর্শী ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতা।
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর শুরু হওয়া এই অন্ত্যেষ্টিক্রিয়াকে কেবল ধর্মীয় বিদায় অনুষ্ঠান হিসেবে দেখছে না তেহরান; বরং একে পশ্চিমা আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ইরানি জনগণের দৃঢ় প্রতিরোধ ও অবিচলতার এক মহাকাব্যিক বার্তা হিসেবে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরা হচ্ছে।
নিরাপত্তার কারণে খামেনির ছেলে, সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি দাফন অনুষ্ঠানে অংশ নিচ্ছেন না। খবর আল জাজিরা ও দ্য গার্ডিয়ানের।
তেহরানজুড়ে কড়া নিরাপত্তা চৌকি, ব্যানার, পোস্টার ও সামরিক বাহিনীর বিশেষ ক্যারাভান মোতায়েন করা হয়েছে। বিপ্লব চত্বরে স্থাপন করা হয়েছে একটি বিশাল মুষ্টিবদ্ধ হাত, যা প্রতিরোধের প্রতীক।
সারা দেশ থেকে আসা লাখ লাখ শোকাতুর মানুষের জন্য তেহরানের বিভিন্ন স্থানে বিশেষ আশ্রয়শিবির খোলা হয়েছে। খাতাম আল-আনবিয়া সেন্ট্রাল হেডকোয়ার্টার্স ও ইসলামী বিপ্লবী বাহিনী (আইআরজিসি) জানিয়েছে, এই ঐতিহাসিক বিদায় অনুষ্ঠানে প্রায় তিন কোটি মানুষের সমাগম হতে পারে।
এক জীবনে এত মাত্রা
ইরানের ইসলামী বিপ্লব ও মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির অবদান চিরস্মরণীয়। ১৯৩৯ সালের ১৯ এপ্রিল ইরানের পবিত্র মাশহাদ নগরীতে এক সম্ভ্রান্ত ধর্মীয় পরিবারে জন্ম তার।
১৯৭৯ সালে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে ঐতিহাসিক ইসলামী বিপ্লবে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন ও ফ্রন্টলাইন নেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। ১৯৮১-১৯৮৯ সাল পর্যন্ত তিনি ইরানের তৃতীয় প্রেসিডেন্ট হিসেবে সফলভাবে দায়িত্ব পালন করেন।
তিনি ইমাম খোমেনির ইন্তেকালের পর ১৯৮৯ সালের ৪ জুন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা (সুপ্রিম লিডার) হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন।
চলতি বছর ২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরানে আমেরিকান-ইসরায়েলি জোটের বিমান হামলায় সপরিবার শাহাদতবরণ করেন খামেনি; শুধু তার ছেলে মোজতবা খামেনি বেঁচে যান।
আজ তেহরানের ইমাম খোমেনি গ্র্যান্ড মোসাল্লা মসজিদে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শ্রদ্ধা নিবেদন ও ছয় দিনব্যাপী দাফন অনুষ্ঠানের সূচনা হচ্ছে।
৯ জুলাই রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তার জন্মভূমি মাশহাদ নগরীতে চূড়ান্ত দাফন সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে।
বিশ্বনেতাদের শ্রদ্ধা ও পশ্চিমা বিশ্বের বর্জন
এক আবেগঘন অনুষ্ঠানে বৃহস্পতিবার রাতে প্রথমবারের মতো খামেনির কফিন জনসাধারণের প্রদর্শনের জন্য আনা হয়।
এ সময় তার সঙ্গে নিহত হওয়া তার ১৪ মাস বয়সী নাতনিসহ পরিবারের অন্য তিন সদস্যের ছোট ছোট কফিনগুলো দেখে উপস্থিত জনতা কান্নায় ভেঙে পড়েন।
খামেনির কফিনটি শুক্রবার ইমাম হুসাইনের (আ.) পবিত্র রওজার মোবারক পতাকা দিয়ে আবৃত করে গ্র্যান্ড মোসাল্লা মসজিদে রাখা হলে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ ও আইআরজিসির প্রধান জেনারেল আহমদ ওয়াহিদি অশ্রুসজল নয়নে শ্রদ্ধা জানান।
আয়াতুল্লাহ খামেনির এই দাফন অনুষ্ঠানে যোগ দিতে বিশ্বনেতারা তেহরানে জড়ো হচ্ছেন। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ তিন দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে ইরানে পৌঁছেছেন।
এ ছাড়া ইরাক, আর্মেনিয়া ও তাজিকিস্তানের শীর্ষস্থানীয় রাষ্ট্রপ্রধানেরা এবং ১২টি আরব দেশের সংসদীয় স্পিকার ও প্রতিনিধিরা এই অনুষ্ঠানে অংশ নিচ্ছেন।
জম্মু-কাশ্মিরের পিপলস ডেমোক্রেটিক পার্টির (পিডিপি) সভাপতি মেহবুবা মুফতি ও ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী পবিত্র মার্গেরিটাসহ একটি উচ্চপর্যায়ের ভারতীয় প্রতিনিধিদলও তেহরানে পৌঁছেছে।
বাংলাদেশি সংবাদ মাধ্যমে সরকারি সূত্রের বরাতে বলা হয়েছে, জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল তেহরানে গেছে।
ইরাকি জনগণের অনুরোধে খামেনির মরদেহ শিয়া সম্প্রদায়ের পবিত্র নগরী কারবালা ও নাজাফেও নিয়ে যাওয়া হবে। তবে এই রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে কোনো পশ্চিমা দেশের প্রতিনিধিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই ইউরোপীয় দেশগুলোর কঠোর সমালোচনা করে বলেছেন, “আমেরিকা ও ইসরায়েলের এই বর্বরোচিত হামলার বিষয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর নীরবতা অত্যন্ত লজ্জাজনক। তারা ইতিহাসের ভুল পক্ষে দাঁড়িয়ে আছে।”
উত্তরসূরি মোজতবা খামেনির নিরাপত্তা শঙ্কা
ইরানের রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা প্রদর্শনের জন্য আয়াতুল্লাহ খামেনির পুত্র ও উত্তরসূরি মোজতবা খামেনির বহু পোস্টার তেহরানের দেয়ালে দেয়ালে লাগানো হলেও নিরাপত্তা ও কৌশলগত কারণে তিনি এই দাফন অনুষ্ঠানে সশরীরে উপস্থিত থাকছেন না।
২৮ ফেব্রুয়ারির সেই একই বিমান হামলায় মোজতবা নিজেও গুরুতর আহত হয়েছিলেন। তিনি বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
সম্প্রতি ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ মোজতবা খামেনিকে হত্যার তালিকায় রাখার হুমকি দেওয়ায় তেহরানের নিরাপত্তা ব্যবস্থা চরম জোরদার করা হয়েছে।
ভারতে নিযুক্ত ইরানের প্রতিনিধি আয়াতুল্লাহ হাকিম ইলাহী স্থানীয় গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন, ইসরায়েলি ড্রোন নজরদারি ও গুপ্ত হত্যার আশঙ্কার কারণেই মোজতবাকে জনসমক্ষে আনা হচ্ছে না। তবে চিকিৎসাধীন অবস্থা থেকেই মোজতবা খামেনি একটি লিখিত বিবৃতিতে জানিয়েছেন, তিনি দেশের চলমান শান্তি আলোচনা বজায় রাখার পক্ষে সায় দিয়েছেন।
ওয়াশিংটনকে তেহরানের চরম হুঁশিয়ারি
ইসরায়েলি প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দাম্ভিক হুমকির পর ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি অত্যন্ত কঠোর ভাষায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সতর্ক করেছেন।
আরাগচি স্পষ্ট করে বলেছেন, “ইসলামাবাদ চুক্তির শর্ত অনুযায়ী মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধবিরতি বজায় রাখতে ও ইসরায়েলকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে ওয়াশিংটন বাধ্য। ট্রাম্পের উচিত তেলআবিবের এই পাগলা কুকুরগুলোর মুখে লাগাম পরানো।
“যদি তারা তাদের প্রভুর কথা না শোনে, তবে ইরান তাদের উপযুক্ত শিক্ষা দেবে। আমাদের নেতৃত্ব বা জনগণের ওপর যেকোনো আঘাতের অভূতপূর্ব ও শক্তিশালী জবাব দেওয়া হবে।”
স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফও হুঙ্কার দিয়ে বলেছেন, “আমাদের এই নেতার রক্তের বদলা নেওয়ার আওয়াজ বিশ্ববাসীর কান পর্যন্ত পৌঁছাতে হবে। উগ্র সাম্রাজ্যবাদের সামনে ইরান কখনও মাথা নত করবে না।”
পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়াই ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে একতরফা সামরিক অভিযান শুরু করেছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল।
পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ৮ এপ্রিল দুই পক্ষের মধ্যে প্রথমে ১৪ দিনের একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। ১৭ জুন ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারকে ইলেকট্রনিক সই করেন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের দুই প্রেসিডেন্ট।