বাঁ দিক থেকে শামীম খান, মোস্তফা কামাল শেখ ও মেহবুব শেখসহ সাতজনকে মুম্বাই থেকে আটক করে বাংলাদেশে পুশ-ইন করেছিল ভারত। কোলাজ: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
‘ভয়কে বড় করে দেখব, নাকি পরিবারকে? আমি পরিবারকেই বেছে নিয়েছি।’ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে কথাগুলো বলেছেন মুর্শিদাবাদের ভগবানগোলার বাসিন্দা মেহেবুব শেখ।
ভারতীয় গণমাধ্যমটি এক প্রতিবেদনে লিখেছে, গত বছর মুম্বাই থেকে আটক করে মেহেবুবসহ আরও কয়েকজনকে বাংলাদেশে পুশইন করা হয়েছিল। কয়েক দিনের ব্যবধানে ভারত সরকার তাদের নাগরিকত্ব স্বীকার করে দেশে ফিরিয়ে নিলেও জীবনের তাগিদে মেহেবুবকে আবারও ফিরতে হয়েছে সেই মুম্বাইয়ে।
৩৭ বছর বয়সী এই নির্মাণ শ্রমিক এখন মুম্বাইয়ে কাজ করছেন।
তিনি বলেছেন, “ভয় হয়, আমাকে আবারও তুলে নিয়ে বের করে দেওয়া হবে কি না। কিন্তু বউ আর দুই ছেলের পড়াশোনার খরচ তো আমাকেই চালাতে হবে।”
গত বছরের জুনে মুম্বাই থেকে যে সাতজনকে বাংলাদেশে পুশইন করা হয়েছিল, তাদের মধ্যে মেহেবুবের মতো মিনরুল শেখও ছিলেন। পরে বিএসএফ ও বিজিবির পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে তাদের ফিরিয়ে নেওয়া হয়।
পরবর্তীতে পশ্চিমবঙ্গে অনুষ্ঠিত স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশনে (এসআইআর) তারা ভারতীয় নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি পান।
তবে মিনরুল এখন আর মুম্বাইয়ে নেই। পরচুলা শিল্পের জন্য চুল সংগ্রহের কাজ করা এই যুবক বর্তমানে কাশ্মির চলে গেছেন।
তিনি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে বলেন, “ফিরে আসার পর সরকার থেকে কোনো সাহায্য পাইনি। উল্টো যারা আমার কাছে টাকা পেত, তারা এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে পাওনা মেটাতে অস্বীকার করেন।
“ঋণ শোধ করতে আমাকে পরিবারের এক বিঘা জমি বিক্রি করতে হয়েছে। তাই নতুন করে জীবন শুরু করতে কাশ্মিরে এসেছি।”
বাংলাদেশে পুশইনের শিকার হওয়া মোস্তফা কামাল শেখ ও শামীম খানও বর্তমানে মুম্বাইয়ে ফিরে গেছেন। পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল সরকার তাদের সব ধরনের সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে তার কিছুই পূরণ হয়নি।
মেহেবুবের ভাষায়, “স্থানীয় তৃণমূল নেতারা আমাকে সংবর্ধনা দিয়েছিলেন, কাজের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিলেন। কিন্তু কিছুই হয়নি। পশ্চিমবঙ্গে দিনমজুরি ৬৫০ টাকা, সেটাও নিয়মিত পাওয়া যায় না।”
তাই বিধানসভা নির্বাচনের পর তিনি আবারও মুম্বাইয়ে ফিরে যান। এখন সেখানে তিনি মাসে ৩৫ থেকে ৪৫ হাজার রুপি আয় করছেন।
মোস্তফা বলেছেন, “মুম্বাইয়ে ১০ বছর ধরে ঝালমুড়ি বিক্রি করতাম। ফিরে এসে গ্রামে চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু দিনে মাত্র ২৫০-৩০০ টাকা লাভ হতো। আর মুম্বাইয়ে রোজগার হয় অন্তত ১২০০ টাকা। তা ছাড়া মুম্বাইয়ের জীবনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ায় গ্রামে মন টিকছিল না।”
শামীমও স্ত্রী ও সন্তান নিয়ে মুম্বাইয়ে ফিরে গেছেন। তিনি বলেন, “নির্বাচনের পর কোনো কাজ না পেয়ে রাজমিস্ত্রির কাজ নিয়ে মুম্বাই চলে এসেছি। স্ত্রী এখনও ভয় পায়, কিন্তু কী করব? টাকার তো দরকার।”
পরিযায়ী শ্রমিক ঐক্য মঞ্চের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সাধারণ সম্পাদক আসিফ ফারুক ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে বলেন, “অবৈধ অভিবাসন রোধ করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলেও সঠিক তদন্ত ছাড়া কাউকে বাংলাদেশি তকমা দেওয়া ঠিক নয়। বাংলার হাজার হাজার শ্রমিক বেশি মজুরির আশায় ভিনরাজ্যে গিয়ে হয়রানির শিকার হচ্ছেন।”
এদিকে গত বছর আরেক ঘটনায় দিল্লির পুলিশ অন্তঃসত্ত্বা সুনালী খাতুনকে বাংলাদেশি আখ্যা দিয়ে পুশইন করেছিল।
সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে তাকে ও তার এক ছেলেকে ফিরিয়ে আনা হলেও তার স্বামী এখনও বাংলাদেশে আটকা আছেন।
সুনালী বলেন, “আমার জীবন আগের চেয়েও খারাপ হয়ে গেছে। ভাই টোটো চালিয়ে দিনে ২০০-৩০০ টাকা আয় করে আমাদের সাহায্য করছে। এভাবে সন্তানদের কীভাবে বড় করব, বুঝতে পারছি না।”