ভেনেজুয়েলায় ভূমিকম্প
বিবিসি
প্রকাশ : ১ ঘণ্টা আগে
আপডেট : ১ ঘণ্টা আগে
১০০ ঘণ্টারও বেশি সময়ের উদ্ধার অভিযানে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে অবশেষে হার্নান গিলকে উদ্ধার করছেন কর্মীরা। ছবি: বিবিসি
আটটি দিন। ১৯২টি দীর্ঘ ঘণ্টা। চারদিকে নিচ্ছিদ্র অন্ধকার আর মাথার ওপর ১৪০ টন ওজনের পাহাড়সম কংক্রিটের স্তূপ। যেখানে প্রতিটি শ্বাস নেওয়াই ছিল এক একটি যুদ্ধ, সেখান থেকেই জীবনের জয়গান গেয়ে ফিরে এলেন হার্নান গিল।
ভেনেজুয়েলার প্রলয়ঙ্করী ভূমিকম্পের আট দিন পর ধ্বংসস্তূপের গভীর থেকে তার এই ফিরে আসা সিনেমার গল্পকেও যেন হার মানায়।
গত ২৪ জুন। প্রকৃতির এক রুদ্র রোষে কেঁপে উঠেছিল ভেনেজুয়েলা। শক্তিশালী জোড়া ভূমিকম্পে তাসের ঘরের মতো ধসে পড়েছিল বিশাল সব অট্টালিকা। ২৩শ এর বেশি প্রাণের বিয়োগান্তক মহাকাব্যের মাঝে হাজার হাজার মানুষ যখন নিখোঁজ, তখন হার্নান গিলের বেঁচে থাকার আশা এক প্রকার ছেড়েই দিয়েছিলেন স্বজনরা। কিন্তু নিয়তি হয়তো অন্য কিছু লিখে রেখেছিল।
এক রুদ্ধশ্বাস লড়াইয়ের ১০০ ঘণ্টা
একটি ধসে পড়া শপিং মলের ধ্বংসস্তূপের নিচে যখন গিলের অস্তিত্ব শনাক্ত করা হয়, তখন থেকেই শুরু হয় এক মহাযজ্ঞ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ—চিলি, কোস্টারিকা, মেক্সিকো, পর্তুগাল ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসা কয়েকশ উদ্ধারকর্মী এক হয়ে লড়েছেন গিলের জীবনের জন্য। চিলির এক অভিজ্ঞ অগ্নিনির্বাপক কর্মী উদ্ধারকাজের জটিলতা দেখে বলেই ফেলেছিলেন, “নিঃসন্দেহে এটি আমার কর্মজীবনের সবচেয়ে কঠিন এবং কারিগরিভাবে দুরুহ এক অভিযান।”
উদ্ধারকারীরা যখন গিলের কাছে পৌঁছানোর জন্য একের পর এক সুড়ঙ্গ তৈরি করছিলেন, তখন বার বার সেই পথগুলো ধসে পড়ছিল। তবুও থামেনি মানবিকতার জয়যাত্রা।
অন্ধকার গহ্বরে আশার আলো
উদ্ধার অভিযানের শেষ পর্যায়ে ধ্বংসস্তূপের একটি সরু ছিদ্র দিয়ে নামানো হয় একটি ক্ষুদ্র ক্যামেরা। সেই সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায় এক রোমহর্ষক দৃশ্য। চারদিকে ধুলোবালি আর কংক্রিটের মাঝে আটকা পড়ে আছেন হার্নান। উদ্ধারকারীরা তার ফুসফুস বাঁচাতে একটি ছিদ্র দিয়ে মাস্ক পাঠিয়েছিলেন, যা তিনি মুখে পরে ছিলেন। তার একটি চোখ ছিল রক্তবর্ণ।
উদ্ধারকারীরা তাকে ক্যামেরার দিকে তাকাতে বললেন, তাকে আশ্বস্ত করলেন। এমনকি ধুলোবালি থেকে চোখ বাঁচাতে তাকে গগলস বা বিশেষ চশমাও পৌঁছে দেওয়া হয়। সুড়ঙ্গের ভেতর দিয়েই তাকে দেওয়া হয় জীবনরক্ষাকারী পানীয় ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা।
অলৌকিক এক নবজন্ম
অবশেষে এল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। শত বাধা আর মৃত্যুকে তুড়ি মেরে ধূলিধূসরিত শরীর নিয়ে আলোর মুখ দেখলেন হার্নান গিল। কোস্টারিকান রেড ক্রসের রিকার্ডো আরিয়াস জানান, হার্নান বর্তমানে স্থিতিশীল আছেন। তিনি যখন শপিং মলটি ধসে পড়ার সময়টির কথা ভাবেন, তখন তার মনে হয় এটি স্রেফ একটি মিরাকল বা অলৌকিক ঘটনা। কারণ কয়েক হাজার টন কংক্রিটের নিচে পিষ্ট না হয়ে বেঁচে থাকাটা বিজ্ঞানের চেয়েও বেশি কিছু।
ভেনেজুয়েলার এই ধ্বংসস্তূপ আজ এক চরম শোকের প্রতীক হতে পারত, কিন্তু হার্নান গিলের ফিরে আসা সেখানে আশার এক নতুন দীপশিখা জ্বেলে দিয়েছে। মৃত্যু উপত্যকা থেকেও যে জীবন ফিরে আসে, হার্নান গিল আজ তারই জীবন্ত প্রমাণ।