আল জাজিরার প্রতিবেদন
২০২৪ সালের ২২শে জানুয়ারী ভারতের অযোধ্যায় হিন্দু দেবতা রামের মন্দির উদ্বোধনের সময়কার একটি দৃশ্য। ছবি: রয়টার্স
উত্তর ভারতের উত্তর প্রদেশের অযোধ্যায় যেখানে আজ রাম মন্দির দাঁড়িয়ে আছে, সেখানে একসময় ছিল ষোড়শ শতাব্দীতে নির্মিত বাবরি মসজিদ।
কিন্তু ১৯৯২ সালে একদল হিন্দু উগ্রপন্থী মসজিদটি ভেঙে ফেলে। এ কারণে ভারতজুড়ে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে।
এতে প্রায় দুই হাজার মানুষ নিহত হন, যাদের বেশিরভাগই ছিলেন মুসলিম।
এরপর মন্দিরটি ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) সমর্থিত হিন্দুত্ববাদী আন্দোলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
আড়াই বছর আগে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি নতুন রাম মন্দিরের প্রাণপ্রতিষ্ঠা অনুষ্ঠানের নেতৃত্ব দেন।
বহু হিন্দুর বিশ্বাস করেন এটিই হিন্দু দেবতা রামের জন্মস্থান।
মন্দিরটির জন্ম ঘিরে বিতর্ক ও প্রাণহানির ইতিহাস থাকলও ব্রজেশ কুমারের মতো ভক্তদের এক ধরনের মানসিক প্রশান্তি এনে দিয়েছিল। কিন্তু সম্প্রতি সেই প্রশান্তি ভেঙে গেছে।
গত এক মাস ধরে মন্দিরটি এমন অভিযোগে তোলপাড়, যেখানে বলা হচ্ছে, মন্দির পরিচালনার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরাই ভক্তদের দেওয়া সম্ভাব্য কোটি কোটি ডলারের সমমূল্যের অনুদান আত্মসাৎ করেছেন।
ব্রজেশ কুমার আল জাজিরাকে বলেন, “আমাদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়েছে। আমাদের বিশ্বাস লুট করা হয়েছে।
“এদের হাতে ছেড়ে দিলে একদিন ধর্মের নামে আমাদেরও বিক্রি করে নিজেদের পকেট ভরবে।”
মন্দিরটি নিয়ে ওঠা অভিযোগের পর পুলিশ তদন্ত শুরু করে এবং বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছে। যার প্রভাব রাজনৈতিক অঙ্গনেও বড় আকারে পড়েছে।
আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই ভারতের সবচেয়ে জনবহুল রাজ্য উত্তর প্রদেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা।
‘প্রতারিত ভক্তসহ বিজেপির সমর্থকদের একটি অংশও’
উদ্বোধনের পর থেকেই রাম মন্দির ভারতের অন্যতম জনপ্রিয় ধর্মীয় তীর্থস্থানে পরিণত হয়েছে, যেখানে লাখো লাখো হিন্দু ভক্ত সমবেত হন।
শ্রী রাম জন্মভূমি তীর্থ ক্ষেত্র ট্রাস্ট নামে একটি স্বাধীন ট্রাস্ট মন্দিরটি পরিচালনা করে। যদিও এটি সরকারি নিয়ন্ত্রণের বাইরে, তবুও এর নির্বাহী সদস্যদের রাজনৈতিক প্রভাব রয়েছে।
এমনকি এবং তাদের মধ্যে কয়েকজন বিজেপির আদর্শিক উৎস রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) সঙ্গে যুক্ত।
ট্রাস্টের হিসাব বিভাগের সাবেক তত্ত্বাবধায়ক মহিপাল সিং আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ তুললে চলতি মাসে প্রথম প্রকাশ্যে আসে দুর্নীতির অভিযোগ।
তবে আল জাজিরা তবে মন্তব্যের জন্য আল জাজিরা তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেনি।
জনরোষ ছড়িয়ে পড়ার পর উত্তর প্রদেশের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী এবং বিরোধী দল সমাজবাদী পার্টির নেতা অখিলেশ যাদব বিষয়টি সামনে আনেন।
তিনি অভিযোগ করেন, অনুদানের কোটি কোটি রুপি উধাও হয়ে গেছে।
চাপ বাড়তে থাকায় বিজেপি-শাসিত উত্তর প্রদেশ সরকার তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। কমিটি অনুদান আত্মসাতের অভিযোগ নিয়ে একটি প্রতিবেদন জমা দিয়েছে।
প্রতিবেদনের বিষয়বস্তু এখনও প্রকাশ করা না হলেও, রাজ্য পুলিশ একটি ফৌজদারি মামলা দায়ের করেছে এবং অন্তত আটজনকে গ্রেপ্তার করেছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন মন্দিরে নগদ অর্থ ও মূল্যবান উপহার গণনার কাজে যুক্ত ব্যক্তিরাও।
এরপর আরও অনেক ভক্ত সামনে এসে অভিযোগ করেছেন যে, তারা ট্রাস্টের কর্মকর্তাদের কাছে জমা দেওয়া রুপার তৈরি ইট, স্বর্ণালংকার ও অন্যান্য মূল্যবান সামগ্রীর কোনো হদিস পাচ্ছেন না।
এ ঘটনায় শুক্রবার ট্রাস্টের দীর্ঘদিনের সাধারণ সম্পাদক চম্পত রায়সহ আরও কয়েকজন প্রভাবশালী ট্রাস্টি পদত্যাগ করেন।
রাম মন্দির আন্দোলনের অন্যতম প্রধান মুখ হওয়ায় চম্পত রায়ের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।
তবে এতে পরিস্থিতি শান্ত হয়নি। হাজার হাজার ভক্ত, এমনকি বিজেপির সমর্থকদের একটি অংশও নিজেদের প্রতারিত বলে মনে করছেন।