ভেনেজুয়েলায় ভূমিকম্প
শতাব্দীর ভয়াবহ ভূমিকম্পে জীবিতদের খুঁজে পাওয়ার আশায় ধ্বংসস্তুপের মধ্যে তল্লাশি চালিয়ে যাচ্ছেন উদ্ধারকর্মীরা। ছবিটি ভেনেজুয়েলার সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত বন্দর শহর লা গুয়াইরা থেকে রবিবার তোলা। ছবি: এএফপি
ভেনেজুয়েলায় ভয়াবহ ভূমিকম্পের চার দিনের মাথায় মৃতের সংখ্যা ১৪০০ ছাড়িয়ে গেছে।
বিদেশি উদ্ধারকারী দলগুলো দেশটিতে প্রবেশ করছে। কর্তৃপক্ষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত উপকূলীয় এলাকাগুলোতে জীবিতদের সন্ধানে তল্লাশি অব্যাহত রেখেছে।
১৬০০ জনেরও বেশি বিদেশি উদ্ধারকাজে যোগ দিয়েছেন। আরও অনেকগুলো দল পথে আছে।
প্রতি ঘণ্টায় আহত ও মৃতের সংখ্যা বাড়ছে। ভারী যন্ত্রপাতির অভাবে উদ্ধার তৎপরতায় বিঘ্ন ঘটছে। খবর রয়টার্স ও বিবিসির।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত বন্দর শহর লা গুয়াইরা ও রাজধানী কারাকাসের কিছু অংশে উদ্ধারকারীরা ছড়িয়ে পড়ার পর শনিবার মৃতের সর্বশেষ সংখ্যা সামনে আসে।
পরিবার ও স্বেচ্ছাসেবীরা এই এলাকাগুলোয় চার দিন ধরে জীবিত ও মৃতদের উদ্ধার করে চলছেন।
তারা প্রায়ই ভারী সরঞ্জামের অপ্রতুলতা ও সরকারি কর্মকর্তাদের সীমিত উপস্থিতি নিয়ে অভিযোগ করছেন।
তবে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শনিবার পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা ১৪৩০ জনে দাঁড়িয়েছে।
গত বুধবার স্থানীয় সময় সন্ধ্যার আগে প্রথমে ৭ দশমিক ২ মাত্রার ও ১ মিনিটেরও কম সময়ের ব্যবধানে ৭ দশমিক ৫ মাত্রার দ্বিতীয় ভূমিকম্পটি হয়।
উত্তরাঞ্চলে উৎপত্তি হওয়া এই ভূমিকম্পে উপকূলীয় অঞ্চলগুলো ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মূল ভূমিকম্প দুটির পর থেকে কয়েকশ পরাঘাত অনুভূত হয়েছে।
ভেনেজুয়েলা সরকার জানিয়েছে, এ পর্যন্ত কয়েকশ মানুষ নিখোঁজ বা ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়ে আছেন অনেকে।
দেশটির বিরোধীদলীয় ওয়েবসাইটে ৫৫ হাজারের বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে। জাতিসংঘের হিসাবে প্রায় ৫০ হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন।
কর্তৃপক্ষ লা গুয়াইরায় প্রবেশে বিধিনিষেধ আরোপ করে রেখেছে আর কারাকাস থেকে আসা প্রধান সড়কটির ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে।
অন্য যানবাহনের কারণে জরুরি বিভাগের যান চলাচলের গতি ধীর হয়ে যায় বলে কারণ হিসেবে দেখিয়েছে তারা।
এদিকে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জীবিত ব্যক্তিদের খুঁজে পাওয়ার আশা যত ক্ষীণ হচ্ছে, মানুষের ক্ষোভও তত বাড়ছে।
ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দাদের একজন আইলিন লাদা বলেন, এখন ধ্বংসস্তূপে মানুষ আটকা আছেন। আমাদের ভারী যন্ত্রপাতি দরকার। দয়া করে সাহায্য করুন।
খবরে বলা হয়েছে, ভেনেজুয়েলার স্থানীয় উদ্ধারকারী দল ও আন্তর্জাতিক সহায়তাকারীরা অসাধারণ ধৈর্য, দৃঢ়তা ও একাগ্রতা নিয়ে ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়া মানুষের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
সামাজিক মাধ্যমে এমন অনেক ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে; যেখানে দেখা যাচ্ছে, উদ্ধারকর্মীরা ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে জীবিত মানুষকে বের করে আনছেন।
সেই মুহূর্তগুলোয় ভেনেজুয়েলার মানুষদের স্বভাবসুলভ প্রাণশক্তি, হাস্যরস ও মানবিক উচ্ছ্বাসের প্রকাশ অনেকের হৃদয় ছুঁয়ে যাচ্ছে।
দেশটিতে কয়েক দশক ধরে পর্যাপ্ত অর্থায়নের অভাবে স্বাস্থ্যব্যবস্থা নাজুক হয়ে পড়েছে। হাসপাতালগুলো এখন বিপুল রোগী ও আহত মানুষের চাপ সামলানোর চেষ্টা করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার (ইউএসজিএস) আশঙ্কা, এই ভূমিকম্পে নিহত ১০ হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে। মৃত্যু নিয়ে এমন আশঙ্কা অমূলক নয়।
সরকারের পক্ষ থেকে আনুমানিক কত মানুষ নিহত হতে পারেন, সে তথ্য দেওয়া না হলেও নিখোঁজ ব্যক্তিদের তালিকা একটি ওয়েবসাইটে পাওয়া যাচ্ছে।
সেখানে সর্বশেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ৪৯ হাজার ৬০০ জনের নাম যুক্ত করা হয়েছে। জাতিসংঘের হিসাবে, এই ভূমিকম্পের প্রভাব ভেনেজুয়েলার প্রায় ৭০ লাখ মানুষের ওপর পড়তে পারে।
জাতিসংঘের ত্রাণ বিষয়ক প্রধান টম ফ্লেচার বলেছেন, আন্তর্জাতিক উদ্ধারকারী দলগুলোর কাজ সমন্বয় করছে জাতিসংঘ। এই দুর্যোগ মোকাবিলায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সমন্বিতভাবে বড় ধরনের সহায়তা প্রয়োজন হবে। কারণ ভূমিকম্পের আগেই দেশটিতে টালমাটাল অবস্থার কারণে প্রায় ৮০ লাখ মানুষ মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল ছিল।
আধুনিককালের ইতিহাসে ভেনেজুয়েলায় এবারের ভূমিকম্পকে সবচেয়ে ভয়াবহ বলা হচ্ছে। ১৯৬৭ সালে দেশটিতে সর্বশেষ বড় ভূমিকম্প হয়েছিল। তখন ২৪০ জন নিহত হয়েছিলেন।