ইরানের তেল রপ্তানির ক্ষেত্রে খারগ দ্বীপটির গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি এবং এখানেই একটি প্রধান তেল রপ্তানি টার্মিনাল অবস্থিত। ছবি: বিবিসি
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে বাগে আনার জন্য প্রায়ই দেশটির খারগ দ্বীপ দখল করে নেওয়ার হুমকি দিয়ে আসছেন।
সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার তিনি খারগ দ্বীপে হামলা চালানোর হুমকি দেন।
ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে এ নিয়ে লিখেছেন, “অদূর ভবিষ্যতে কোনো এক সময়ে, আমরা খারগ দ্বীপ এবং অন্যান্য তেল অবকাঠামো দখল করে নেব এবং তাদের তেল ও গ্যাস বাজারের ওপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করব।”
ওয়াশিংটন এবং তেহরানের মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে ইরানের খারগ দ্বীপটি ক্রমেই আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে। প্রশ্ন হচ্ছে, খারগ দ্বীপে আসলে কী আছে।
ম্যানহাটনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আকারের এই দ্বীপটিকে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা ‘ইরানের সমস্ত তেল সরবরাহের কেন্দ্রবিন্দু’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এর দীর্ঘ জেটিগুলো দ্বীপের চারপাশের জলে প্রসারিত, যা তেলবাহী সুপারট্যাঙ্কার ধারণ করার মতো যথেষ্ট গভীর, ফলে দ্বীপটি তেল বিতরণের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থান।
সিএনএন জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা খারগ দ্বীপ দখল করা অথবা এর তেল অবকাঠামো কার্যকরভাবে নিশ্চিহ্ন করার লক্ষ্যে বোমা হামলার অনুমোদন দেওয়ার বিভিন্ন বিকল্প তৈরি করেছেন।
হোয়াইট হাউস মনে করছে দ্বীপটি দখল করা হলে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) সম্পূর্ণ দেউলিয়া হয়ে যাবে। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েবসাইট ‘অ্যাক্সিওস’ এক আমেরিকান কর্মকর্তার বরাত দিয়ে জানিয়েছে যে, এই অঞ্চলের যুদ্ধ মোকাবিলায় সাম্প্রতিক আলোচনার সময় যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন খারগ দ্বীপ দখল করে নেওয়াসহ বেশ কয়েকটি বিকল্প নিয়ে বিতর্ক করেছে। এই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কারণে ওয়াশিংটনের কিছু বিশ্লেষক ও কর্মকর্তার মনে প্রশ্ন জেগেছে যে, এই দ্বীপটি লক্ষ্যবস্তু করা বা এমনকি নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার অর্থ আসলে কী হতে পারে। কিছু বিশ্লেষক মনে করেন, এই দ্বীপটিতে হামলা চালানো বা এটি দখল করা হলে ইরানের তেল রাজস্ব উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, যা দেশটির সরকারি আয়ের প্রধান উৎস।
ওয়াশিংটনে হোয়াইট হাউসের উপদেষ্টা জ্যারেড অ্যাজেন বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানি তেলের মজুদ সন্ত্রাসীদের হাত থেকে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। এর মাধ্যমে তিনি তেহরান সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির মাধ্যম হিসেবে ইরানের জ্বালানি সম্পদ জব্দ করার সম্ভাবনার দিকে ইঙ্গিত করেছেন।
বিবিসি জানায়, ইরান উপকূল থেকে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে পারস্য উপসাগরের উত্তরে অবস্থিত এই ছোট প্রবাল দ্বীপটি দেশটির তেল শিল্পের মূল ভিত্তি। দক্ষিণ-পশ্চিম ইরানে অবস্থিত খার্গ দ্বীপের আয়তন ২০ বর্গকিলোমিটার এবং এটি বুশেহর প্রদেশের অংশ। দ্বীপটি তার তেল স্থাপনা এবং সেখানে অবাধে বিচরণকারী বিপুল সংখ্যক হরিণের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত।
ইরানের তেল রপ্তানির ক্ষেত্রে এই দ্বীপটির গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি এবং এখানেই একটি প্রধান তেল রপ্তানি টার্মিনাল অবস্থিত। ইরানের অপরিশোধিত তেল রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশই এই দ্বীপের মাধ্যমে হয়ে থাকে। এরপর ট্যাংকারগুলো বিশ্ববাজারের উদ্দেশে রওনা হয়, যার পথ হিসেবে প্রায়ই হরমুজ প্রণালি ব্যবহৃত হয়, যা বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ। এই দ্বীপের লোডিং সুবিধাগুলো প্রতিদিন লাখ লাখ ব্যারেল তেল পাঠাতে সক্ষম, যা ইরানের তেল খনি এবং আন্তর্জাতিক বাজারের মধ্যে একটি প্রধান যোগসূত্র হিসেবে কাজ করে।
দ্বীপটি সমুদ্রের তলদেশের পাইপলাইনের মাধ্যমে ইরানের বৃহত্তম কিছু তেল খনির সঙ্গে সংযুক্ত। খনি থেকে তেল দ্বীপে আনা হয় এবং সেখানে বড় বড় ট্যাংকে জমা রাখা হয়। এরপর গভীর সমুদ্র পর্যন্ত বিস্তৃত দীর্ঘ ডকের মাধ্যমে বিশালাকার ট্যাংকারে তেল বোঝাই করা হয়।
এটি প্রয়োজনীয় কারণ ইরানের উপকূলীয় এলাকার বেশিরভাগ অংশ তুলনামূলক অগভীর এবং সেখানে বিশালাকার ট্যাংকার ভিড়তে পারে না। ফলে খারগ দ্বীপই বড় পরিসরে এই কাজ সম্পন্ন করার সক্ষমতা সম্পন্ন অন্যতম স্থান।
দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের তেলসমৃদ্ধ এলাকাগুলোর সান্নিধ্য, নৌ-চলাচলের সুবিধা এবং বৃহৎ তেল ট্যাঙ্কারের নোঙরের জন্য উপযোগী গভীর পানির মতো সুবিধার কারণে খারগকে অপরিশোধিত তেল রপ্তানি ও লোডিংয়ের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত স্থান হিসেবে ধরা হয়।