সাক্ষাৎকারে গ্যালান্ত দাবি করেন, প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্বে থাকার সময়ও সরকার জিম্মিদের মুক্ত করতে সম্ভাব্য সব পদক্ষেপ নেয়নি। গ্রাফিক্স: বিবিসি বাংলা
ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় হামাসসহ অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীর হাতে আটক ইসরায়েলি জিম্মিদের প্রাণহানির আশঙ্কা থাকা সত্ত্বেও সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল ইসরায়েল।
দেশটির সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্ত সম্প্রতি দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ তথ্য স্বীকার করেছেন।
ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ‘ইয়েদিওথ আহরোনোথ’ ও ‘চ্যানেল-১২’-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে গ্যালান্ত বলেন, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের ঘটনার পর এবং ২৭ অক্টোবর গাজায় স্থল অভিযান শুরু হওয়ার আগেই তিনি সতর্কবার্তা পেয়েছিলেন যে, ইসরায়েলের হামলায় গাজায় আটক জিম্মিদের মৃত্যু হতে পারে। তবুও তিনি সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন।
গ্যালান্ত বলেন, “আমি জানতাম, হামলা শুরু হলে জিম্মিদের জীবন ঝুঁকিতে পড়বে। তারপরও আমি যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া এবং স্থল অভিযান বাস্তবায়নের পক্ষেই ছিলাম।”
তিনি আরও জানান, এ বিষয়ে তিনি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে আলোচনা করেছিলেন। গ্যালান্তের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি নেতানিয়াহুকে বলেছিলেন, ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে একটি জায়গায় মিল রয়েছে; উভয় পক্ষই জিম্মিদের ধরে রাখতে চায়। তবে হামাস তাদের চাপ প্রয়োগের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে, আর ইসরায়েল তাদের নিজেদের নাগরিক হিসেবে বিবেচনা করে।
সাক্ষাৎকারে গ্যালান্ত দাবি করেন, প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্বে থাকার সময়ও সরকার জিম্মিদের মুক্ত করতে সম্ভাব্য সব পদক্ষেপ নেয়নি।
তিনি জানান, সেনাবাহিনীকে তথাকথিত ‘হ্যানিবাল নির্দেশনা’ কার্যকর করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। এই নীতির আওতায় অপহরণকারীদের পাশাপাশি জিম্মিদেরও হত্যা করা হতে পারে, যাতে তাদের শত্রুপক্ষের হাতে জীবিত অবস্থায় নিয়ে যাওয়া না যায়। এ বক্তব্যের মাধ্যমে গাজায় ইসরায়েলের সামরিক কৌশল নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরেই মানবাধিকার সংগঠনগুলো অভিযোগ করে আসছে, গাজায় নির্বিচার হামলার কারণে বহু বেসামরিক ফিলিস্তিনির পাশাপাশি ইসরায়েলি জিম্মিদের জীবনও ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
গ্যালান্ত ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলাকে ইসরায়েলের ইতিহাসে অন্যতম বড় গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা ব্যর্থতা হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি এ ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্তের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
যদিও কয়েকজন ইসরায়েলি কর্মকর্তা নিজেদের দায় স্বীকার করেছেন, প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে দায় স্বীকার করেননি। একই সঙ্গে তিনি স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠনের দাবিও প্রত্যাখ্যান করে আসছেন।
সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী আরও অভিযোগ করেন, উগ্র ডানপন্থী অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মতরিচ একাধিকবার সরকার থেকে সমর্থন প্রত্যাহারের হুমকি দিয়ে জিম্মি বিনিময় চুক্তির পথে বাধা সৃষ্টি করেছিলেন।
তার দাবি, ২০২৪ সালেই একটি সমঝোতা চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব ছিল।
এ ছাড়া সাবেক জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরের কর্মকাণ্ড নিয়েও সমালোচনা করেন গ্যালান্ত।
তিনি বলেন, জেরুজালেমের আল-আকসা মসজিদ প্রাঙ্গণে বেন-গভিরের বারবার প্রবেশ ও উস্কানিমূলক অবস্থান অঞ্চলটির উত্তেজনা বাড়িয়ে তোলে এবং ৭ অক্টোবরের হামলার আগেই পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করে তোলে।
গ্যালান্ত আরও বলেন, গাজায় নতুন করে ইসরায়েলি বসতি স্থাপন বাস্তবসম্মত নয়। সেখানে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক শাসন প্রতিষ্ঠাও প্রায় অসম্ভব বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তার ভাষায়, “গাজায় বসতি স্থাপনের চেষ্টা শেষ পর্যন্ত বিপর্যয় ডেকে আনবে।”
গত বছরের নভেম্বরে গ্যালান্তকে মন্ত্রিসভা থেকে বরখাস্ত করেন প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু। পরে তার স্থলাভিষিক্ত হিসেবে ইসরায়েল কাৎজকে নিয়োগ দেওয়া হয়।