মধ্যপ্রাচ্যের এই দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের জেরে বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসতে পারে বলে সতর্ক করেছে অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থা। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
নিজেই যুদ্ধ বাঁধিয়ে এখন শান্তির জন্য হন্যে হয়ে ছুটছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট। কখনও হুমকিধমকি দিচ্ছেন, আবার কখনও সুর নরম করে স্থায়ী শৃঙ্খলার আহ্বান জানাচ্ছেন।
এরই মধ্যে ডোনাল্ড ট্রাম্প গতকাল দাবি করেছেন, ইরান পরমাণু অস্ত্র তৈরি না করার বিষয়ে সম্মতি জানিয়েছে এবং দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান শান্তি আলোচনায় সরাসরি যুক্ত আছেন।
নিউইয়র্ক পোস্টের একটি পডকাস্টে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প এই চাঞ্চল্যকর দাবি করেন।
তবে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান লিখেছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট এমন এক সময়ে এই মন্তব্য করলেন, যখন উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা বিনিময় হয়েছে এবং লেবাননে ইসরায়েলের হামলা আরও তীব্র রূপ নিয়েছে।
সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, “আমরা কোনোভাবেই ইরানকে পরমাণু অস্ত্র তৈরি করতে দিতে পারি না এবং তারা এরই মধ্যে এ বিষয়ে সম্মতি জানিয়েছে। এটি একটি বড় চুক্তি।”
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির বর্তমান শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে ধোঁয়াশা থাকলেও ট্রাম্প দাবি করেন, মোজতবা পর্দার আড়ালে আলোচনা সচল রেখেছেন এবং সুবিধাজনক সময়ে তিনি তার সঙ্গে সশরীরে সাক্ষাৎ করতে চান। তবে ট্রাম্পের এমন দাবির বিপরীতে তেহরানের তরফে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধের প্রথম দিনে এক বোমা হামলায় ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনি নিহত হওয়ার পর তার ছেলে মোজতবা খামেনি দায়িত্ব নেন। তবে ওই হামলায় মোজতবা নিজেও গুরুতর আহত হন এবং এরপর থেকে তাকে জনসমক্ষে দেখা যায়নি। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও কংগ্রেসের এক শুনানিতে জানিয়েছেন, জনসমক্ষে না এলেও শান্তি আলোচনায় মোজতবার প্রভাব ও অংশগ্রহণ দিন দিন বাড়ছে।
ট্রাম্পের এই দাবির মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। কুয়েত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইরানের ড্রোন হামলায় একজন নিহত ও বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। এই হামলার পর সাময়িকভাবে বিমানবন্দরটির কার্যক্রম স্থগিত করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে অবরোধ ভেঙে ইরানের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করা একটি তেলবাহী ট্যাংকারে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী ‘হেলফায়ার’ ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে সেটির ইঞ্জিন অকেজো করে দেওয়ার পর এই পাল্টা ড্রোন হামলা চালায় ইরান।
এর জবাবে ইরান বাহরাইনে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তরেও ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়, যদিও যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী তা প্রতিহত করার দাবি করেছে। ট্রাম্প অবশ্য সাফ জানিয়েছেন, ইরানের সামরিক সক্ষমতার বড় অংশই বিমান হামলার মাধ্যমে ধ্বংস করা হয়েছে, তাই সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের স্থলসেনা পাঠানোর কোনো প্রয়োজন ‘অন্তত এই মুহূর্তে নেই’।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনের মধ্যস্থতায় লেবাননে যুদ্ধবিরতির চেষ্টা চললেও দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি বিমান হামলা অব্যাহত রয়েছে। ইসরায়েলি হামলায় সিডন শহরের কাছে একই পরিবারের ছয়জনসহ অন্তত আটজন নিহত হয়েছেন। হিজবুল্লাহর ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত নাবাতিয়াহ শহরের বাসিন্দাদের এলাকা ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। হিজবুল্লাহও দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি সাঁজোয়া যান লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালিয়েছে।
কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, লেবাননে ইসরায়েলের এই লাগাতার হামলায় ক্ষুব্ধ হয়েছেন ট্রাম্প। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে এক উত্তপ্ত ফোনালাপে ট্রাম্প হিজবুল্লাহর সঙ্গে ক্রমাগত যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য নেতানিয়াহুকে তীব্র ভাষায় তিরস্কার করেন।
ট্রাম্প বলেন, “আমি বিবিকে (নেতানিয়াহু) বলেছি, এটা এবার বন্ধ করতে হবে। আমার কারণেই আজ ইসরায়েল টিকে আছে।”
মধ্যপ্রাচ্যের এই দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের জেরে বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসতে পারে বলে সতর্ক করেছে অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থা। প্যারিসভিত্তিক এই সংস্থার সর্বশেষ পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালেও যদি এই যুদ্ধ অব্যাহত থাকে, তবে বিশ্ব জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে কমে ২ দশমিক ১ শতাংশে নেমে আসবে, যা অনেক উন্নত দেশকে মন্দার দিকে ঠেলে দেবে। জ্বালানি সংকটের কারণে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের রেশনিং করতে হতে পারে।
এমনকি বর্তমান বিশ্বের তথ্যপ্রযুক্তির অন্যতম চালিকাশক্তি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই খাতের বিপুল বিনিয়োগ ও ডাটা সেন্টারের পরিচালন ব্যয় অত্যধিক বৃদ্ধি পাওয়ায় এই প্রযুক্তি খাতও স্থবির হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। ইরান যদি লেবাননে ইসরায়েলের হামলা বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত আলোচনা বর্জন করে চলে, তবে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ সংকুচিত হয়ে দীর্ঘমেয়াদি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট তৈরি করবে।