ওয়াশিংটন ও তেহরান একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে। ছবি: এনডিটিভি
ইরান যুদ্ধের অবসান নিয়ে সম্ভাব্য কোনো চুক্তির বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ছাড়াই বৈঠক শেষ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
হোয়াইট হাউসের সিচুয়েশন রুমে শনিবার দুই ঘণ্টাব্যাপী এই বৈঠক হয়।
নিউইয়র্ক টাইমসকে এক জ্যেষ্ঠ প্রশাসনিক কর্মকর্তা জানান, চুক্তি প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছালেও ইরানের জব্দকৃত অর্থ ছাড়সহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখনও আলোচনায় রয়েছে।
হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা এক বিবৃতিতে বলেন, “প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এমন কোনো চুক্তি করবেন, যা যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষা করবে এবং তার নির্ধারিত সীমারেখা মেনে চলবে। ইরান কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্রের মালিক হতে পারবে না।”
বৈঠকের আগে ট্রাম্প বলেছিলেন, সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতি নিয়ে কীভাবে এগোনো হবে সে বিষয়ে ‘চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত’ নিতেই তিনি বৈঠকে যাচ্ছেন। তবে হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করা, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং অন্যান্য ইস্যুতে মতবিরোধ থাকায় ওয়াশিংটন ও তেহরানের অচলাবস্থার অবসানের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দাবি করেন, ইরান হরমুজ প্রণালিতে পেতে রাখা মাইন অপসারণ করবে, যুক্তরাষ্ট্র নৌ অবরোধ প্রত্যাহার করবে এবং জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হবে।
তিনি আরও বলেন, ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম খুঁজে বের করে ধ্বংস করা হবে। ইরানের পক্ষ থেকে ১২ বিলিয়ন ডলারের জব্দকৃত সম্পদ অবিলম্বে ছাড়ের দাবি করা হয়েছে- এমন প্রতিবেদনের প্রসঙ্গ টেনে ট্রাম্প বলেন, “পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত কোনো অর্থ লেনদেন হবে না।”
ইরানের বক্তব্য
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এখনো কোনো চূড়ান্ত চুক্তি হয়নি এবং দুই পক্ষের মধ্যে বার্তা বিনিময় অব্যাহত রয়েছে। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন আইআরআইবিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, বর্তমান আলোচনায় ইরানের প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে “যুদ্ধের অবসান ঘটানো”।
তিনি বলেন, “এই পর্যায়ে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো বিস্তারিত আলোচনা হচ্ছে না।”
হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালুর সম্ভাবনা সম্পর্কে বাঘাই বলেন, প্রণালিটির ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা কেবল ইরান ও ওমানের বিষয়। তিনি আরও বলেন, “৪৭ বছর আগেই ইসলামি প্রজাতন্ত্র ‘অবশ্যই মানতে হবে’ ধরনের ভাষাকে বিদায় জানিয়েছে।”
এদিকে ৮ এপ্রিল ঘোষিত নাজুক যুদ্ধবিরতির পর এক সপ্তাহ ধরে পাল্টাপাল্টি হামলা চলার প্রেক্ষাপটে ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, “আমরা আলোচনার মাধ্যমে নয়, ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে ছাড় আদায় করি।” তিনি বলেন, ইরান কোনো প্রতিশ্রুতি বা কথার ওপর আস্থা রাখে না এবং অপর পক্ষ আগে পদক্ষেপ না নিলে তেহরানও কোনো পদক্ষেপ নেবে না।
ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিশনের প্রধান এবং দেশটির শীর্ষ নেতৃত্বের ঘনিষ্ঠ ইব্রাহিম আজিজি শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, “শর্ত নির্ধারণ করছে ইরান- নগদের বিনিময়ে নগদ, ঋণের বিনিময়ে ঋণ; বিনিময় ছাড়া কিছুই নয়।”
প্রধান দাবি ও বিরোধের বিষয়: ইরানের পারমাণবিক মজুত
যুক্তরাষ্ট্র চায় ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করুক এবং ইতোমধ্যে সমৃদ্ধ করা ইউরেনিয়াম অন্য কোনো দেশের কাছে হস্তান্তর করুক। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) তথ্য অনুযায়ী, ইরানের কাছে বর্তমানে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ ৪৪০ দশমিক ৯ কেজি ইউরেনিয়াম রয়েছে, যা অস্ত্র-মানের ৯০ শতাংশ সমৃদ্ধতার খুব কাছাকাছি। ধারণা করা হচ্ছে, এসব মজুত গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের বোমা হামলার শিকার তিনটি পারমাণবিক স্থাপনার নিচে সংরক্ষিত রয়েছে।
হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু
বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল পরিবহনের এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ পুনরায় চালুর দাবি জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। পাশাপাশি ৩০ দিনের মধ্যে সেখানে পেতে রাখা মাইন অপসারণের কথাও বলেছে ওয়াশিংটন। অন্যদিকে ইরান দাবি করছে, হরমুজ প্রণালির ওপর তাদের অধিকার রয়েছে এবং ওমান ও ইরান যৌথভাবে এ পথ ব্যবহারকারী জাহাজের কাছ থেকে টোল আদায়ের ক্ষমতা রাখে।
ইসরায়েল-হিজবুল্লাহ যুদ্ধবিরতি
ইরান চায়, যেকোনো চুক্তির অংশ হিসেবে লেবাননে ইসরায়েল ও ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর মধ্যেও যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করা হোক। যদিও নামমাত্র যুদ্ধবিরতি কার্যকর রয়েছে, তবুও সেখানে সংঘাত বেড়েছে।
জব্দকৃত অর্থ ছাড়
তাসনিম সংবাদ সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান চুক্তির অংশ হিসেবে বিদেশে আটকে থাকা প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ ছাড় চায়। এর মধ্যে অন্তত ১২ বিলিয়ন ডলার চুক্তি ঘোষণার শুরুতেই ছাড় দিতে হবে বলে দাবি করেছে তেহরান। যদিও ইরানের বিদেশে আটকে থাকা সম্পদের সুনির্দিষ্ট সরকারি হিসাব নেই, দেশটির বিভিন্ন গণমাধ্যমের হিসাব অনুযায়ী এর পরিমাণ ১০০ থেকে ১২৩ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে।
নিশ্চয়তার দাবি
২০১৫ সালের ঐতিহাসিক পারমাণবিক চুক্তি থেকে ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেওয়ার পর থেকে ওয়াশিংটনের প্রতিশ্রুতির বিষয়ে সন্দিহান তেহরান। তাই নতুন যেকোনো চুক্তি বাস্তবায়নে যুক্তরাষ্ট্রের দৃঢ় নিশ্চয়তা চেয়েছে ইরান। দেশটির প্রধান আলোচকও বলেছেন, তেহরান যুক্তরাষ্ট্রের কথার চেয়ে বাস্তব পদক্ষেপকেই বেশি গুরুত্ব দেবে।
যুদ্ধবিরতি ভঙ্গের অভিযোগ
৮ এপ্রিল মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। সে সময় ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালিয়ে যেতে ট্রাম্পের কংগ্রেসের অনুমোদন প্রয়োজন কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল।
তবে চলতি সপ্তাহেও ওয়াশিংটন ও তেহরান একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে। হরমুজ প্রণালি ও এর আশপাশের এলাকায় যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দর শহর বন্দর আব্বাসে হামলা চালানো হলে এর জবাবে ইরানও পাল্টা হামলা চালায়।