আল জাজিরার প্রতিবেদন
প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ২৯ মে ২০২৬ ১৫:১৮ পিএম
আপডেট : ২৯ মে ২০২৬ ১৫:৩৩ পিএম
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ছবি: রয়টার্স
প্রায় এক দশক আগে পাকিস্তানকে আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করার হুমকি দিয়েছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় দেখা যাচ্ছে, পাকিস্তান এখন বৈশ্বিক রাজনীতিতে আবারও গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অংশীদার হিসেবে নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা বলছে, ইসলামাবাদকে কোণঠাসা করার ভারতের কৌশল শেষ পর্যন্ত উল্টো ফল দিতে শুরু করেছে।
২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে ভারতশাসিত কাশ্মীরে সশস্ত্র হামলায় ১৮ ভারতীয় সেনা নিহত হওয়ার পর দক্ষিণ ভারতের কেরালায় এক সমাবেশে মোদি পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কঠোর ভাষায় বক্তব্য দেন।
মঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি বলেছিলেন,“ভারত তোমাদের বিচ্ছিন্ন করতে সফল হয়েছে এবং আমরা সেই প্রচেষ্টা আরও জোরদার করব। বিশ্বজুড়ে তোমাদের একঘরে করা হবে”।
তিনি আরও বলেন, “পাকিস্তানের নেতাদের শুনে রাখা উচিত, আমাদের ১৮ সেনার আত্মত্যাগ বৃথা যাবে না”।
সেই সময় ভারত সরকার পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কূটনৈতিক চাপ বাড়ানো, আন্তর্জাতিক ফোরামে ইসলামাবাদকে ‘সন্ত্রাসবাদে মদদদাতা’ হিসেবে তুলে ধরা এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা কাঠামো সার্ককে কার্যত অচল করে দেওয়ার মতো পদক্ষেপ নেয়।
তবে সময়ের সঙ্গে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। বর্তমানে পাকিস্তান চীনের অন্যতম ঘনিষ্ঠ কৌশলগত মিত্র। সম্প্রতি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ বেইজিং সফরে গেলে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং দুই দেশের সম্পর্ককে ‘অটুট বন্ধুত্ব’বলে উল্লেখ করেন।
একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও পাকিস্তানের সম্পর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে। গত এক বছরে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির ও প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ, দুজনই হোয়াইট হাউস সফর করেছেন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চলমান উত্তেজনার মধ্যেও ইসলামাবাদ মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও একাধিকবার পাকিস্তানি নেতৃত্বের প্রশংসা করেছেন। এমনকি তিনি পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনিরকে ‘অসাধারণ মানুষ’বলেও উল্লেখ করেছেন। ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে বিরল খনিজ সম্পদ, ক্রিপ্টোকারেন্সি ও কৌশলগত বিনিয়োগ নিয়ে পাকিস্তানের চুক্তিও সম্পর্ক উন্নয়নে ভূমিকা রেখেছে।
আল-জাজিরার এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে বলা হয়, পাকিস্তান কৌশলী কূটনীতি ও পরিবর্তিত বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক বাস্তবতাকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের অবস্থান পুনর্গঠন করতে সক্ষম হয়েছে। একই সঙ্গে এটি মোদি সরকারের কিছু কৌশলগত ভুলের প্রতিফলনও।
আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক জ্যেষ্ঠ ফেলো মাইকেল কুগেলম্যান আল-জাজিরাকে বলেন, “নিশ্চিতভাবেই, ভারত যে কৌশলের মাধ্যমে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিকভাবে পাকিস্তানকে কোণঠাসা ও বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করেছিল, তা বড় ধরনের উল্টো ফল দিয়েছে”।
বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৫ সালের ভারত-পাকিস্তান সামরিক সংঘর্ষের পর পরিস্থিতি আরও বদলে যায়। ওই সংঘাতের পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেন এবং দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় দুই দেশ সংঘাত বন্ধে সম্মত হয়েছে।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ দ্রুত ট্রাম্পকে ধন্যবাদ জানালেও ভারত সরকার প্রকাশ্যে তাকে কৃতিত্ব দিতে অস্বীকৃতি জানায়। এতে ওয়াশিংটনের সঙ্গে নয়াদিল্লির সম্পর্কে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা।
আল-জাজিরার প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ভারত দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের “কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন” নীতির অনুসারী হিসেবে তুলে ধরলেও মোদি সরকারের সময় সেই অবস্থান বদলেছে। বিশেষ করে ইসরায়েলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি, ফিলিস্তিন ইস্যুতে নীরবতা এবং মুসলিমবিরোধী ঘটনাগুলোর কারণে মুসলিম বিশ্বে ভারতের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
অন্যদিকে পাকিস্তান ইসলামোফোবিয়া ইস্যুতে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সক্রিয় ভূমিকা নিয়ে মুসলিম বিশ্বে নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে এখন নতুন বাস্তবতা তৈরি হচ্ছে। ভারত এখনও অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে শক্তিশালী অবস্থানে থাকলেও পাকিস্তান কূটনৈতিকভাবে পুনরায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
ফলে একসময় যে পাকিস্তানকে আন্তর্জাতিকভাবে ‘একঘরে’ করার ঘোষণা দিয়েছিলেন মোদি, সেই পাকিস্তানই এখন চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও মুসলিম বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে নতুন কূটনৈতিক অবস্থান গড়ে তুলছে।