প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ২৩ মে ২০২৬ ২২:৫২ পিএম
আপডেট : ২৩ মে ২০২৬ ২৩:০০ পিএম
২০২২ সালের ডিসেম্বরে ইউক্রেনের দোনেৎস্ক অঞ্চলের বাখমুতের কাছে রুশ অবস্থানে একটি ড্রোন উৎক্ষেপণ করছে ইউক্রেনীয় সেনারা। ছবি: এবিসি নিউজ/এপি/ লিবকোস
যুদ্ধ চলছে ইউরোপ আর মধ্যপ্রাচ্যে। কিন্তু সেই সব যুদ্ধে প্রাণ হারাচ্ছেন বাংলাদেশের মানুষ। ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন চলছে। জবাব দিচ্ছে ইউক্রেনও। মধ্যপ্রাচ্যের ইরানে চলা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আগ্রাসনের জবাবে ইরানও ওই অঞ্চলের কয়েকটি দেশে যুক্তরাষ্ট্রের স্থাপনায় হামলা চালিয়ে জবাব দেয়।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এখন ভঙ্গুর একটি যুদ্ধবিরতি চলছে। তবে এই দুটি যুদ্ধে এখন পর্যন্ত ৪৬ জন বাংলাদেশির নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ৩৯ জন নিহত হয়েছেন রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যকার চলমান যুদ্ধে। আর ৭ জন প্রাণ হারিয়েছেন ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে। তবে ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের সহযোগী পরিচালক শরিফুল ইসলামের দাবি, এসব যুদ্ধে নিহত বাংলাদেশির সংখ্যা পঞ্চাশের বেশি হবে।
অভিযোগ রয়েছে, ভালো বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে বিভিন্ন রিক্রুটিং এজেন্সি ও দালাল চক্র বাংলাদেশি যুবকদের রাশিয়া পাঠাচ্ছে। পরে সেখানে পৌঁছার পর অনেককে সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হচ্ছে। ব্যাংককভিত্তিক ফর্টিফাই রাইটস এবং ইউক্রেনভিত্তিক ট্রুথ হাউন্ডস নামে দুটি সংগঠন সম্প্রতি বাংলাদেশে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে বাংলাদেশি যুবকদের অংশগ্রহণের ওপর একটি যৌথ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
গবেষণায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশ থেকে যাওয়া পরিবারগুলো তাদের সন্তানদের ঋণ করে বিদেশে পাঠিয়েছে। ফলে তারা লাখ লাখ টাকার ঋণে ডুবে আছে। বাংলাদেশে বসে পরিবারগুলো যুদ্ধক্ষেত্রে ছেলে বা স্বামীর নিহত হওয়ার খবর পাচ্ছে। এতে পরিবারগুলোর ওপর শোক ও আর্থিক চাপ ভারী হচ্ছে। সরকারের তরফ থেকে নজরদারির কথা বলা হলেও রাশিয়ায় মানব পাচার থামছে না। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো প্রিয়জনদের লাশ পাঠানোর অনুরোধ করলেও তাতে সাড়া মিলছে না।
ফর্টিফাই রাইটস ও ট্রুথ হাউন্ডসের প্রতিবেদন
গত ৩ মার্চ ফর্টিফাই রাইটস এবং ট্রুথ হাউন্ডসের রিপোর্ট প্রকাশিত হয়। গবেষণা রিপোর্টটি বাংলাদেশ এবং ইউক্রেনের ২৪ জনের সাক্ষাৎকারের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। ২০২৫ সালের মে ও ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যে এসব সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। এর মধ্যে যুদ্ধ থেকে বেঁচে যাওয়া ব্যক্তি, নিহতদের পরিবার এবং শ্রীলঙ্কা ও নেপালের যুদ্ধবন্দির সাক্ষাৎকারও রয়েছে।
প্রকাশিত প্রতিবেদনে ইউক্রেনীয় তথ্যের ভিত্তিতে কমপক্ষে ১০৪ জন বাংলাদেশিকে এই যুদ্ধে নিয়োগ করা হয়েছে বলে চিহ্নিত করা হয়েছে, যার মধ্যে কমপক্ষে ৩৯ জন মারা গেছেন। ৬২ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে প্রতারণা, বলপ্রয়োগ ও নির্যাতনের মাধ্যমে বাংলাদেশি পুরুষদের কীভাবে ইউক্রেনের সম্মুখসমরে অংশ নিতে বাধ্য করা হয়েছে- সেসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। গবেষকরা বলেছেন, নিহতদের প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে এবং অনেকে সাক্ষাৎকারে ‘ডজন ডজন’ বাংলাদেশি নিহত হতে পারে বলে উল্লেখ করেছেন।
বেঁচে যাওয়া ভুক্তভোগীদের রক্ষা করতে ও সংশ্লিষ্ট মানব পাচার চক্র ভেঙে দিতে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়েছে, ২০২২ সালে ইউক্রেনে শুরু হওয়া রাশিয়ার সামরিক আগ্রাসন এখনও বৈশ্বিক শান্তি ও নিরাপত্তাকে বিঘ্নিত করছে। এর সুযোগ নিয়ে আর্থিকভাবে দুর্বল পুরুষদের টার্গেট করে এশিয়া ও আফ্রিকা থেকে রাশিয়ায় মানব পাচারের একটি সুসংগঠিত প্রক্রিয়া চালু হয়েছে।
প্রতিবেদনে ফর্টিফাই রাইটসের পরিচালক জন কুইনলে বলেন, “প্রতারণার মাধ্যমে পাচারপূর্বক বাংলাদেশি পুরুষদের ইউক্রেনে রাশিয়ার অবৈধ যুদ্ধে অংশ নিতে বাধ্য করা হয়েছে। তাদের প্রতি নির্যাতনের মাত্রা সম্ভবত আমরা যা নথিবদ্ধ করতে পেরেছি, তার চেয়েও অনেক বেশি। এর পরিপ্রেক্ষিতে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন বন্ধে আন্তর্জাতিক মহলের দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে”।
ট্রুথ হাউন্ডসের নির্বাহী সহপরিচালক ওকসানা পোকালচুক বলেন, “আমরা দেখেছি, কীভাবে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও জাতিগত বৈষম্যের শিকার এমন পুরুষদের রাশিয়া তার যুদ্ধ টিকিয়ে রাখতে শোষণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। রাশিয়া তার পক্ষের প্রাণহানিতে বিদেশি নাগরিকদেরও জড়াচ্ছে। এটি রাশিয়ার যুদ্ধে নিছক মানব-সরবরাহের ঘটনা নয়, বরং সর্বোচ্চ মাত্রার শোষণে রূপ নিয়েছে”।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, মানব পাচারকারী দালাল চক্র প্রথমে ভুয়া কাজের কথা বলে ভুক্তভোগী বাংলাদেশি পুরুষদের রাশিয়ার সশস্ত্র বাহিনীতে যোগ দিতে প্রলুব্ধ করে। তারপর রুশ ভাষায় লিখিত চুক্তিপত্রে তাদের স্বাক্ষর করায়, যেটি ভুক্তভোগীরা পড়তেও পারে না। এরপর তৃতীয় একটি দেশের মধ্য দিয়ে তাদের পাচার করে দ্রুত রাশিয়ার সামরিক স্থাপনাগুলোতে পাঠানো হয়। সেখান থেকে ইউক্রেনে গিয়ে রাশিয়ার পক্ষে সৈন্য হিসেবে যুদ্ধ করতে বাধ্য করা হয়।
প্রতিবেদনে তারা বাংলাদেশ, ইউক্রেন ও রাশিয়ার সরকার এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কাছে কিছু সুপারিশ করেছে। সেগুলো হলো— পাচার থেকে বেঁচে ফেরা ভুক্তভোগীদের সাহায্য করা, বলপূর্বক ও অবৈধভাবে জনবল সরবরাহ ঠেকানো এবং রাশিয়ার আগ্রাসী যুদ্ধে মানব পাচার বন্ধ করা।
ইউক্রেন যুদ্ধে নিহত ৩৯ জন
ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রুশ বাহিনীর হয়ে যুদ্ধে নিহত বাংলাদেশির সংখ্যা বেড়ে ৩৯ জনে দাঁড়িয়েছে। এই যুদ্ধে সর্বশেষ আরও দুই বাংলাদেশির মৃত্যু হয়েছে। তারা হলেন— মাদারীপুরের সুরুজ কাজী (৩৫) এবং কিশোরগঞ্জের জাহাঙ্গীর হোসেন (২৪)। এর বাইরে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এক ভিডিওবার্তায় কুমিল্লার ইউসুফ খান নামের আরেক বাংলাদেশির মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
পরিবারের দাবি, মাদারীপুর সদর উপজেলার দক্ষিণ খাগড়াছড়া এলাকার বাসিন্দা সুরুজ কাজী জীবিকার খোঁজে রাশিয়া গিয়েছিলেন। বুধবার রাতে যুদ্ধক্ষেত্রে তার মৃত্যুর খবর আসে। সুরুজ তিন ভাই ও এক বোনের মধ্যে সবার বড় ছিলেন।
তার বাবা শাহাবুদ্দিন কাজী বলেন, ছেলেটা ভালো থাকার আশায় বিদেশে গিয়েছিল। এখন সব শেষ হয়ে গেল। তিনি ছেলের মরদেহ শেষবারের মতো দেখতে চান বলে জানান।
অন্যদিকে কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার জয়কা ইউনিয়নের বাগপাড়া গ্রামের জাহাঙ্গীর হোসেন চার মাস আগে রাশিয়া যান। বৃহস্পতিবার রাতে খবর আসে তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত হয়েছেন। এর আগে চলতি মাসেই একই জেলার আরেক যুবক রিয়াদ রশিদ ড্রোন হামলায় নিহত হন রাশিয়ায়।
গোপালগঞ্জ জেলার কয়েকটি পরিবারের অভিযোগ, নির্মাণ খাতে চাকরির আশ্বাস দিয়ে তাদের স্বজনদের রাশিয়ায় নেওয়া হলেও পরে যুদ্ধ করতে বাধ্য করা হয়েছে। এ ঘটনায় একটি রিক্রুটিং এজেন্সির বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগও করা হয়েছে।
সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওবার্তায় রাশিয়ায় অবস্থানরত এক বাংলাদেশি তরুণ দাবি করেন, চাকরির কথা বলে তাদের সাতজনকে নেওয়া হয়েছিল। পরে তাদের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়। তার ভাষ্য, তাদের মধ্যে তিনজন ইতোমধ্যে মাইন ও ড্রোন বিস্ফোরণে নিহত হয়েছেন।
ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার হয়ে যুদ্ধে অংশ নিতে গিয়ে নিহতদের আরও কয়েকজন হলেন, ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার মো. আ. রহিম (৩০), কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক আব্দুর রশিদের ছেলে মো. রিয়াদ রশিদ (২৮) ও ময়মনসিংহের গৌরীপুরের ইয়াসিন শেখ।
বেঁচে যাওয়া কিছু ভুক্তভোগী জানিয়েছেন, কোনো উল্লেখযোগ্য প্রশিক্ষণ ছাড়াই তাদের সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়েছে। স্থলমাইন ও ড্রোন আক্রমণে কেউ কেউ আহত হয়েছেন। কিছু ভুক্তভোগী কমান্ডারদের মারধরের শিকার হয়েছেন। তাদের বেতন আটকে রাখা হয়েছে এবং কোনো ছুটিও দেওয়া হয়নি। এমনকি পাসপোর্টও জব্দ করা হয়েছিল। পালানোর চেষ্টা করলে মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হতো।
সরকারের তরফ থেকে বলা হয়েছে, কেউ যেন যুদ্ধের উদ্দেশ্যে রাশিয়া বা ইউক্রেনে যেতে না পারে, সে বিষয়ে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে বলে জানানো হয়েছে। সরকার বলছে, বিদেশে কর্মসংস্থানের নামে প্রতারণা ও মানব পাচার ঠেকাতে নজরদারি আরও জোরদার করা হবে।
মধ্যপ্রাচ্যে মারা গেলেন ৭ জন
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে এখন পর্যন্ত ৭ জন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। তাদের মধ্যে ৪ জনের মরদেহ দেশে আনা হয়েছে।
খবরে বলা হয়েছে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের আজমানে নিহত হয়েছেন সিলেটের বড়লেখা উপজেলার বাসিন্দা সালেহ আহমেদ। বাহরাইনে নিহত হয়েছেন চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ উপজেলার আজিমপুর ইউনিয়নের মোহাম্মদ তারেক (৪৮)। লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ড্রোন হামলায় নিহত হয়েছেন নরসিংদীর শিবপুর উপজেলার কাজম আলীর ছেলে করিম মিয়া (৪৬)। লেবাননের নাবাতিয়েহ এলাকায় ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন সাতক্ষীরা সদরের শফিকুল ইসলাম ও আশাশুনির নাহিদুল ইসলাম এবং কলারোয়া পৌরসভার শ্রীপতিপুর গ্রামের শুভ দাস।
লেবাননের বৈরুতে ইসরায়েলি হামলায় নিহত হয়েছেন ফরিদপুরের চরভদ্রাসনের শেখ মোফাজ্জলের মেয়ে দিপালী বেগম (৩৪)। সৌদি আরবে নিহত হয়েছেন, ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলার আব্দুল্লাহ আল মামুন। গত ৬ এপ্রিল তার মরদেহ দেশে পৌঁছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতে নিহত হন প্রবাসী শাহ আলম ভূঁইয়া। গত ৭ এপ্রিল হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তার মরদেহ গ্রহণ করেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম।
এ বিষয়ে ব্র্যাকের পক্ষ থেকে প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলা হয়, “রাশিয়া-ইউক্রেন ও ইরান যুদ্ধে বাংলাদেশি নাগরিকদের মৃত্যুর বিষয়ে আমরা গত বছরের শেষের দিকে তথ্য হালনাগাদ করেছিলাম। গত কয়েক মাসে আরও অনেকের মৃত্যু হয়েছে। এরই মধ্যে কোনো কোনো গণমাধ্যম রাশিয়া-ইউক্রেনে ৩৯ জন এবং ইরান যুদ্ধে ৭ জনের মৃত্যুর তথ্য উল্লেখ করে প্রতিবেদন করছে। বাস্তবে এর সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। ধারণা করছি, তা অর্ধশতের বেশি হবে”।