সিএনএন
প্রকাশ : ২৩ মে ২০২৬ ০১:২৮ এএম
আপডেট : ২৩ মে ২০২৬ ১১:৫৩ এএম
যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালক তুলসি গ্যাবার্ড। ছবি: সিএনএন
যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় গোয়েন্দা বিভাগের পরিচালক তুলসি গ্যাবার্ড শুক্রবার ঘোষণা দিয়েছেন, জুনের শেষ দিকে তিনি পদত্যাগ করবেন।
স্বামী আব্রাহামের ক্যানসার শনাক্ত হওয়ায় তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানিয়েছেন।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে লেখা এক চিঠিতে তিনি বলেন, “দুর্ভাগ্যবশত, আমাকে পদত্যাগপত্র জমা দিতে হচ্ছে, যেটি ৩০ জুন, ২০২৬ থেকে কার্যকর হবে।”
তিনি চিঠিতে আরও বলেন, “আমার স্বামী আব্রাহামের শরীরে সম্প্রতি অত্যন্ত বিরল ধরনের হাড়ের ক্যানসার শনাক্ত হয়েছে। এ কারণে তাকে সামনের কয়েক সপ্তাহ ও মাসগুলোতে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে।
“এই মুহূর্তে তার পাশে থাকা এবং এই লড়াইয়ে পূর্ণ সমর্থন দেওয়ার জন্য আমাকে দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়াতে হচ্ছে।”
গ্যাবার্ডের ঘোষণার পরপরই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার প্রশংসা করেন এবং ঘোষণার দেন, জাতীয় গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান উপপরিচালক অ্যারন লুকাস ভারপ্রাপ্ত পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে লেখেন, “তার (তুলসী গ্যাবার্ড) স্বামী আব্রাহামের শরীরে সম্প্রতি বিরল ধরনের হাড়ের ক্যানসার ধরা পড়েছে। স্বাভাবিকভাবেই তিনি এখন তার পাশে থাকতে চান এবং একসঙ্গে কঠিন এই লড়াই মোকাবিলা করতে চান।”
তিনি আরও লেখেন, গ্যাবার্ড “অবিশ্বাস্য রকম ভালো কাজ করেছেন, আমরা তার অভাব অনুভব করব।”
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তাদের মধ্যে গুঞ্জন ছিল, গ্যাবার্ড প্রশাসন ছাড়তে পারেন। তবে দুই সপ্তাহ আগেও তিনি প্রশাসন ছাড়ার বিষয়টি অস্বীকার করেছিলেন বলে এক জ্যেষ্ঠ প্রশাসনিক কর্মকর্তা জানান।
গ্যাবার্ড শুক্রবার ওভাল অফিসে ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে পদত্যাগপত্র দেন বলে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে।
চিঠিতে গ্যাবার্ড লিখেছেন, তিনি তার স্বামীকে এই সংকট একা মোকাবিলা করতে দিতে পারেন না।
তিনি লেখেন, “আমাদের ১১ বছরের দাম্পত্য জীবনে আব্রাহাম সবসময় আমার সবচেয়ে বড় ভরসা ছিলেন। পূর্ব আফ্রিকায় যৌথ বিশেষ অভিযান মিশনে, একাধিক রাজনৈতিক প্রচারে এবং এই দায়িত্ব পালনের সময় তিনি অটলভাবে আমার পাশে থেকেছেন।
“তার শক্তি ও ভালোবাসা আমাকে প্রতিটি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সাহস জুগিয়েছে। যখন আমি এই কঠিন ও সময়সাপেক্ষ পদে কাজ চালিয়ে যাচ্ছি, তখন আমি বিবেকের তাড়নায় তাকে একা এই লড়াইয়ের মুখোমুখি হতে বলতে পারি না।”
গ্যাবার্ডে তার দায়িত্বকালে নানা বিতর্কের মধ্যে দিয়ে গেছেন।বিশেষ করে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ প্রসঙ্গে— যা অনেক সময় তাকে হোয়াইট হাউসের বিরাগভাজন করে তুলেছিল।
ট্রাম্পের হাতে হোমল্যান্ড সিকিউরিটি মন্ত্রী ক্রিস্টি নোয়েম ও অ্যাটর্নি জেনারেল পাম বন্ডি পদচ্যুত হওয়ার এবং শ্রমমন্ত্রী লরি শাভেজ-ডিরেমারের বিদায়ের পর তিনিই হবেন মন্ত্রিসভার সর্বশেষ পদত্যাগকারী সদস্য।
ট্রাম্পকে লেখা চিঠিতে গ্যাবার্ড উল্লেখ করেছেন, “ওডিএনআইয়ে নজিরবিহীন স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সততা পুনঃপ্রতিষ্ঠার কাজ উল্লেখযোগ্যভাবে এগিয়েছে। তবে আমি স্বীকার করি, এখনও গুরুত্বপূর্ণ অনেক কাজ বাকি আছে।
একই সঙ্গে তিনি দায়িত্ব হস্তান্তর প্রক্রিয়া নির্বিঘ্ন করতে সহায়তার অঙ্গীকার করেন।
ইরান ইস্যুতে ট্রাম্পের সঙ্গে মতবিরোধ
ইরান প্রসঙ্গে গ্যাবার্ডের অবস্থান অনেক সময় হোয়াইট হাউসের বক্তব্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ছিল। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুদ্ধ শুরুর কয়েক মাস আগ থেকেই এই মতপার্থক্য স্পষ্ট হতে থাকে।
ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলার কয়েকদিন আগে—২০২৫ সালের জুনে সিএনএনের করা প্রতিবেদন অনুযায়ী, হোয়াইট হাউসের একজন ঊর্ধ্বতন উপদেষ্টার মতে, ওয়েস্ট উইংয়ের অনেকেই গ্যাবার্ডের কার্যকলাপে হতাশ।
ওই উপদেষ্টা আরও জানান, ট্রাম্প মনে করতেন ইসরায়েল-ইরান সংঘাত নিয়ে গ্যাবার্ড ‘অফ মেসেজ’ অবস্থান নিচ্ছেন।
ওই মাসেই গ্যাবার্ডের একটি প্রকাশিত ভিডিওবার্তার কারণে ট্রাম্পের বিরক্তি চরমে পৌঁছে।
যে ভিডিওতে সতর্ক করে গ্যাবার্ড বলেন, বিশ্ব “আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে পারমাণবিক ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে” রয়েছে। এবং তিনি পারমাণবিক শক্তিধর দেশগুলোর মধ্যে ভয় ও উত্তেজনা বাড়ানোর ক্ষেত্রে ‘রাজনৈতিক অভিজাত ও যুদ্ধবাজদের’ দায়ী করেন।
ওই সময় একটি সূত্র সিএনএনকে জানায়, ট্রাম্প এই ভিডিওকে ইরানে হামলার অনুমতি দেওয়ার বিষয়ে তার বিবেচনার পরোক্ষ সমালোচনা হিসেবে দেখেন। হোয়াইট হাউসের অনেক কর্মকর্তাও মনে করেন, গ্যাবার্ড সীমা লঙ্ঘন করেছেন।
ইরান সক্রিয়ভাবে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে না, কংগ্রেসে এমন সাক্ষ্য দেওয়ার পর ওই মাসের শেষ দিকে ট্রাম্প প্রকাশ্যে গ্যাবার্ডকে ভর্ৎসনা করেন।
তিনি বলেন, “সে (গ্যাবার্ড) কী বলেছে তাতে আমার কিছু যায় আসে না। আমার মনে হয় তারা (ইরান) খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল।”
ওই দিনই ট্রাম্প ‘অপারেশন মিডনাইট হ্যামার’ নামে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে হামলার অনুমোদন দেন।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের বিরুদ্ধে শুরু করা যুদ্ধকে বৈধতা দিতে ট্রাম্প প্রশাসন দাবি করে, ২০২৫ সালের হামলার পরও ইরান আবার পারমাণবিক কর্মসূচি পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে এবং যা একটি আসন্ন হুমকি।
কিন্তু এক মাসেরও কম সময় পরে সিনেট ইন্টেলিজেন্স কমিটিতে প্রস্তুতকৃত বক্তব্যে গ্যাবার্ড বলেন, “(জুনে) অপারেশন মিডনাইট হ্যামারের ফলে ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। এরপর থেকে তারা তা পুনর্গঠনের কোনো চেষ্টা করেনি।”
তবে কংগ্রেসের শুনানির সময় তিনি বক্তব্যের ওই অংশ পাঠ করেননি।
কেন পড়েননি জানতে চাইলে তিনি বলেন, “সময় শেষ হয়ে যাচ্ছিল।” তবে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মূল্যায়ন এখনও একই কি না জানতে চাইলে তিনি ‘হ্যাঁ’ বলেন।
একই শুনানিতে তাকে জিজ্ঞেস করা হয়, ইরান আসন্ন হুমকি কি না। জবাবে তিনি বলেন, “কোনটি হুমকি আর কোনটি নয়, তা নির্ধারণের ক্ষমতা শুধু প্রেসিডেন্টের।”
তিনি আরও বলেন, “কোনটি আসন্ন হুমকি আর কোনটি নয়, তা নির্ধারণ করা গোয়েন্দাদের দায়িত্ব নয়”
গ্যাবার্ডের অধীনে সন্ত্রাসবিরোধী শীর্ষ কর্মকর্তা জো কেন্ট যুদ্ধ শুরুর তিন সপ্তাহের মধ্যেই পদত্যাগ করেন। যুদ্ধ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে তিনি বলেন, ইরান কোনো ‘আসন্ন হুমকি’ ছিল না।
পরবর্তীতে গ্যাবার্ড কেন্টের মন্তব্য থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে নেন। প্রতিনিধি পরিষদের এক শুনানিতে কেন্টের মন্তব্য উদ্বেগজনক কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, “হ্যাঁ।”
ফুলটন কাউন্টির নির্বাচন কার্যালয়ে বিতর্কিত অনুসন্ধান
২০২০ সালের নির্বাচনে কথিত ভোট জালিয়াতির তদন্তেও গ্যাবার্ড সক্রিয় ভূমিকা নেন। এতে ট্রাম্পের সঙ্গে তার সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয় বলে মনে করা হয়, কারণ তিনি ট্রাম্পের সেই মিথ্যা দাবির পক্ষে অবস্থান নেন যে ২০২০ সালের নির্বাচন তার কাছ থেকে চুরি করা হয়েছিল।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে এফবিআই জর্জিয়ার আটলান্টার কাছে ফুলটন কাউন্টির নির্বাচন কার্যালয়ে তল্লাশি চালালে গ্যাবার্ড ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। বিচার বিভাগ ওই কাউন্টির ভোটসংক্রান্ত তথ্য জব্দ ও কথিত জালিয়াতির প্রমাণ অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে এ অভিযান চালায়।
গোয়েন্দা প্রধান হিসেবে গ্যাবার্ডের সেখানে উপস্থিতি ছিল অস্বাভাবিক। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় গোয়েন্দা বিভাগের পরিচালকের কাজ সাধারণত বিদেশে গোয়েন্দা কার্যক্রম সমন্বয় করা, অভ্যন্তরীণ আইন প্রয়োগ বা তদন্তে অংশ নেওয়া নয়।
পরে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের শীর্ষ ডেমোক্র্যাট সদস্যদের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে গ্যাবার্ড জানান, প্রেসিডেন্টের অনুরোধেই তিনি সেখানে গিয়েছিলেন।
তবে পরে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কে তাকে পাঠিয়েছিল, সে বিষয়ে পরস্পরবিরোধী ব্যাখ্যা দেওয়ায় বিষয়টি বিভ্রান্তির সৃষ্টি করে।
সাবেক কয়েকজন জ্যেষ্ঠ গোয়েন্দা কর্মকর্তা ও নির্বাচন আইন বিশেষজ্ঞ সিএনএনকে বলেন, এফবিআইয়ের ওই অভিযানে গ্যাবার্ডের কোনো আইনি কর্তৃত্ব ছিল না।
ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির পর বৈদেশিক ও অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা কার্যক্রমের মধ্যকার একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমারেখা তৈরি করা হয়। তবে গ্যাবার্ডের উপস্থিতি এই গুরুত্বপূর্ণ সীমারেখাকে ক্ষুণ্ন করার ঝুঁকি তৈরি করেছিল বলেও জানান তারা।
ভোট জালিয়াতির অভিযোগের প্রমাণ খুঁজতে গিয়ে ওডিএনআই পুয়ের্তো রিকো থেকেও ভোটিং মেশিন সংগ্রহ করে এবং সেগুলোর নিরাপত্তাগত দুর্বলতা পরীক্ষা করে।
তবে পরে সংস্থাটির প্রকাশিত বিবৃতিতে যেসব সমস্যার কথা বলা হয়, সেগুলো নির্বাচন নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের কাছে আগে থেকেই পরিচিত ছিল এবং সমাধানও করা হয়েছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের আর্মি রিজার্ভে কর্মরত গ্যাবার্ড হাওয়াইয়ের দ্বিতীয় কংগ্রেশনাল জেলার সাবেক ডেমোক্র্যাট কংগ্রেসওম্যান। তিনি কংগ্রেসের প্রথম সামোয়ান বংশোদ্ভূত ও ধর্মপ্রাণ হিন্দু সদস্য হিসেবে ইতিহাস সৃষ্টি করেন।
২০২০ সালে তিনি ডেমোক্র্যাট প্রার্থী হিসেবে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। সে সময় নিজেকে ইরাক যুদ্ধের অভিজ্ঞ সেনা ও হস্তক্ষেপ-বিরোধী পররাষ্ট্রনীতির সমর্থক হিসেবে তুলে ধরেন। তবে দুই বছর পর তিনি দলটি ত্যাগ করেন।
পরে ২০২৪ সালের নির্বাচনে তিনি ট্রাম্পকে সমর্থন দেন, তার পক্ষে প্রচার চালান এবং তৎকালীন ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিসের সঙ্গে বিতর্কের প্রস্তুতিতেও সহায়তা করেন।
নির্বাচনের আগেই গ্যাবার্ড রিপাবলিকান পার্টিতে যোগ দেন এবং ট্রাম্পের নির্বাচনি দলে কাজ করেন।
পরে ট্রাম্প তাকে জাতীয় গোয়েন্দা বিভাগের পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেন—যা গোয়েন্দাদের অন্তর্ভুক্ত ১৮টি সংস্থার তত্ত্বাবধানকারী সর্বোচ্চ পদ।