ব্লুমবার্গ প্রতিবেদন
ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক জোট গঠনে সৌদি ও কাতারকে টানতে চেয়েছিল আরব আমিরাত। ছবি: গেটি ইমেজ
ইরানের বিরুদ্ধে যৌথ সামরিক পদক্ষেপ নিতে সৌদি আরব ও কাতারকে রাজি করানোর চেষ্টা করেছিল সংযুক্ত আরব আমিরাত। তবে সেই উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয় বলে জানিয়েছে ব্লুমবার্গ।
প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পরপরই আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্টে মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানসহ উপসাগরীয় অঞ্চলের নেতাদের সঙ্গে একাধিকবার টেলিফোনে কথা বলেন।
ওই হামলার জবাবে তেহরান উপসাগরীয় দেশগুলোর দিকে হাজার হাজার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপ করে। ২০২১ সালে তথাকথিত ‘আব্রাহাম চুক্তি’র মাধ্যমে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা আরব আমিরাতই সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়ে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশটির ওপর প্রায় তিন হাজার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন আঘাত হানে।
তবে সৌদি আরব ও অন্যান্য উপসাগরীয় দেশ ইরানের বিরুদ্ধে সমন্বিত সামরিক অভিযান চালানোর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। এর মধ্য দিয়ে ইরানকে ঘিরে সৌদি আরব ও আরব আমিরাতের মধ্যকার মতপার্থক্য আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সৌদি আরব সীমিত ও নিয়ন্ত্রিত প্রতিক্রিয়ার পথ বেছে নেয় এবং দ্রুতই মিত্র পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় কূটনৈতিক সমাধানের প্রচেষ্টায় মনোযোগ দেয়। অন্যদিকে আরব আমিরাত সরাসরি ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে।
দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে বলা হয়, এপ্রিলের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র যখন যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিচ্ছিল, ঠিক তখনই আরব আমিরাত পারস্য উপসাগরে অবস্থিত ইরানের লাভান দ্বীপে হামলা চালায়। এতে বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে এবং কয়েক মাসের জন্য ওই স্থাপনার উৎপাদনক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধবিরতির পক্ষে অবস্থান নিলেও ওই হামলা নতুন করে উত্তেজনা বাড়িয়ে তোলে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সৌদি আরবের তুলনায় আরব আমিরাতের জন্য ইরানের হুমকি বেশি। কারণ সৌদি আরবের কাছে লোহিত সাগরপথে তেল রপ্তানির বিকল্প ব্যবস্থা থাকলেও আরব আমিরাতের অর্থনীতি ও বাণিজ্য অনেক বেশি উপসাগরীয় নৌপথের ওপর নির্ভরশীল। পাশাপাশি এই যুদ্ধ দেশটির পর্যটন ও আর্থিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠা আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিতেও আঘাত হেনেছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ অব্যাহত রাখতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে প্রকাশ্যে ও গোপনে তদবির চালিয়েছে আবুধাবি। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নিয়ন্ত্রণ মোকাবিলায় সামরিক শক্তি ব্যবহারের অনুমতি চেয়ে জাতিসংঘে একটি প্রস্তাবও তোলে তারা, যদিও সেটি পাস হয়নি।
আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা আনোয়ার গারগাশ উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের ‘দুর্বল ভূমিকা’র সমালোচনা করেন। উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে এই টানাপড়েনের মধ্যেই চলতি মে মাসে আরব আমিরাত তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর জোট ওপেক থেকে নিজেদের প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয়।
একই সময়ে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করেছে আবুধাবি। ইসরায়েলে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি দাবি করেন, ইরানের হামলা মোকাবিলায় ইসরায়েল আরব আমিরাতে ‘আয়রন ডোম’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও সেগুলো পরিচালনার জন্য সেনা মোতায়েন করেছে।
চলতি মাসের শুরুতে তেল আবিবে এক অনুষ্ঠানে হাকাবি বলেন, আব্রাহাম চুক্তির ভিত্তিতে আরব আমিরাত ও ইসরায়েলের মধ্যে ‘অসাধারণ সম্পর্ক’ গড়ে উঠেছে।
তবে যুদ্ধ চলাকালে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর আরব আমিরাত সফরের দাবি নাকচ করেছে আবুধাবি। নেতানিয়াহুর কার্যালয় সফরের কথা জানালেও আরব আমিরাত আনুষ্ঠানিকভাবে তা অস্বীকার করেছে।
এদিকে গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানকে জাতিসংঘ, মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষক গণহত্যা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। একই ধরনের মন্তব্য করেছেন সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ও মিসরের প্রেসিডেন্ট আব্দেল ফাত্তাহ এল সিসি।