প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ১৫ মে ২০২৬ ১৮:২৮ পিএম
আপডেট : ১৮ মে ২০২৬ ১৪:২৩ পিএম
দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে চলমান ইরান সংকট এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে শুধুমাত্র সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে আর কোনো পক্ষই কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জন করতে পারছে না। যুক্তরাষ্ট্র বুঝতে পেরেছে যে, ইরানকে সামরিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করা, অবরোধ আরোপ করা কিংবা রাজনৈতিক চাপ বৃদ্ধি করলেও তেহরানকে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণে বাধ্য করা সহজ নয়—বিশেষ করে স্থল আক্রমণের মতো বড় ধরনের সামরিক পদক্ষেপ ছাড়া, যা ওয়াশিংটনের পক্ষে রাজনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।
অন্যদিকে, ইরানও পারস্য উপসাগরে অস্থিরতা সৃষ্টি এবং সংঘাতের ব্যয় বাড়াতে সক্ষম হলেও, তা দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চাপ ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কমাতে কার্যকর হচ্ছে না। ফলে দুই দেশ কার্যত এক ধরনের অচলাবস্থায় আটকে গেছে।
এই পরিস্থিতিতে উভয় পক্ষই এমন একটি কূটনৈতিক চ্যানেলের প্রয়োজন অনুভব করছে, যার মাধ্যমে প্রকাশ্যে পরাজয় স্বীকার না করেই সংঘাতের সমাপ্তির পথ খুঁজে পাওয়া সম্ভব হবে। সেই কারণেই পাকিস্তানকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে সামনে আনা হয়।
মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হিসেবে তেহরানের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক তুলনামূলকভাবে সৌহার্দ্যপূর্ণ। একই সঙ্গে ওয়াশিংটনের সঙ্গেও ইসলামাবাদের দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক যোগাযোগ রয়েছে। উপসাগরীয় অঞ্চলেও পাকিস্তানের প্রভাব রয়েছে। এসব কারণে চলতি বছরের এপ্রিল মাসে ইসলামাবাদে প্রথম দফার আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। যদিও ওই বৈঠকে কোনো সমঝোতা হয়নি, তবুও উভয় পক্ষ ভবিষ্যতে আলোচনার পথ খোলা রাখার বিষয়ে সম্মত হয়।
তবে শুরুতে আশাব্যঞ্জক মনে হলেও পাকিস্তানের এই মধ্যস্থতা এখন ধীরে ধীরে বিশ্বাসযোগ্যতা হারাচ্ছে। তেহরান ও ওয়াশিংটন—উভয় পক্ষই ইসলামাবাদের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছে।
ইরানের অভিযোগ, পাকিস্তান কেবল বার্তা আদান-প্রদানের মধ্যস্থতাকারী নয়; বরং তারা যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থসংশ্লিষ্ট একটি কাঠামো ইরানের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। ইরানি পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি কমিশনের মুখপাত্র ইব্রাহিম রেজায়ী সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে মন্তব্য করেন, “পাকিস্তানের মধ্যস্থতার জন্য প্রয়োজনীয় বিশ্বাসযোগ্যতা নেই।”
তিনি অভিযোগ করেন, পাকিস্তান ট্রাম্প প্রশাসনের স্বার্থকে গুরুত্ব দিয়ে অবস্থান নিয়েছে এবং ওয়াশিংটনের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের বিষয়গুলো প্রকাশ্যে তুলে ধরতে অনীহা দেখিয়েছে। বিশেষ করে লেবানন ইস্যু ও ইরানের জব্দকৃত সম্পদ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসার ঘটনাকে পাকিস্তান প্রকাশ্যে সমালোচনা করেনি বলে অভিযোগ তেহরানের।
ইরানের আশঙ্কার আরেকটি কারণ হলো, পাকিস্তান যেভাবে ওয়াশিংটনের দাবি তেহরানের কাছে উপস্থাপন করছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা, আঞ্চলিক মিত্রগোষ্ঠী এবং হরমুজ প্রণালিতে তেহরানের ভূমিকা। ইরান এসব বিষয়কে নিজেদের নিরাপত্তা ও প্রতিরোধ কৌশলের মূল অংশ হিসেবে বিবেচনা করে এবং এ বিষয়ে ছাড় দিতে অনাগ্রহী।
তেহরানের অভিযোগ, পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রের দাবিগুলো গ্রহণে ইরানকে বেশি চাপ দিচ্ছে, কিন্তু ইরানের পক্ষ থেকে উত্থাপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, অবরোধ শিথিল, জব্দকৃত সম্পদ ফেরত এবং নিরাপত্তা নিশ্চয়তার মতো বিষয়গুলো ওয়াশিংটনের কাছে সমান গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরছে না।
এ অবস্থায় পাকিস্তানকে আর নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে দেখছে না ইরানের একটি বড় অংশ। বরং ইসলামাবাদ যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত কাঠামোকেই আলোচনার ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানও সম্প্রতি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, তেহরান কোনো “চাপিয়ে দেওয়া আলোচনা” মেনে নেবে না।
বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যস্থতাকারী হিসেবে টিকে থাকতে হলে পাকিস্তানকে উভয় পক্ষের কাছেই সমান দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। অন্যথায় ইসলামাবাদের কূটনৈতিক উদ্যোগ ব্যর্থ হওয়ার ঝুঁকি আরও বাড়বে।