× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

বেইজিংয়ে ট্রাম্প-শি বৈঠক: কোন পথে বিশ্ব

প্রবা প্রতিবেদন

প্রকাশ : ১৫ মে ২০২৬ ০৮:৩২ এএম

আপডেট : ১৫ মে ২০২৬ ০৮:৫৪ এএম

চীনের বেইজিংয়ে গ্রেট হল অব দ্য পিপলে আয়োজিত রাষ্ট্রীয় ভোজসভায় করমর্দন করছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও  যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্স

চীনের বেইজিংয়ে গ্রেট হল অব দ্য পিপলে আয়োজিত রাষ্ট্রীয় ভোজসভায় করমর্দন করছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্স

ভূতের মুখে রাম নাম। এই প্রবাদটিই যেন গতকাল বৃহস্পতিবার বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলের বারান্দায় প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল।

একসময় যে ডোনাল্ড ট্রাম্প চীনকে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পদ ‘লুটকারী’ ও ‘ধর্ষক’ বলে আখ্যা দিয়েছিলেন, কিংবা করোনা মহামারিকে ‘চীনা ভাইরাস’ বলে বিদ্রূপ করেছিলেন, সেই ট্রাম্পের মুখেই এখন চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের জন্য কেবলই স্তুতি।

তিন দিনের সফরে চীনে গিয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার ট্রাম্প যখন শিকে ‘মহান নেতা’ আর ‘অকৃত্রিম বন্ধু’ বলে সম্বোধন করছিলেন, তখন বিশ্ববাসী এক বড় সন্ধিক্ষণের সাক্ষী হচ্ছিল। একদিকে ইরান যুদ্ধের উত্তাপ আর অন্যদিকে তাইওয়ান নিয়ে নতুন সংঘাতের আশঙ্কাÑ সব মিলিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, বিশ্ব কি দীর্ঘমেয়াদি শান্তির পথে হাঁটছে, নাকি এটি কেবল এক প্রলয়ঙ্করী ঝড়ের আগের আপসকালীন নীরবতা?

আল জাজিরা ও দ্য গার্ডিয়ানের খবরে বলা হয়েছে, সফরের প্রথম দিনে দুই নেতাই নিজেদের মধ্যকার যোজন যোজন দূরত্ব ঘুচিয়ে পারস্পরিক বোঝাপড়া ও অংশীদারত্ব বাড়ানোর দিকে নজর দিয়েছেন। বিশেষ করে, মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে ইরানের নিয়ন্ত্রণে থাকা কৌশলগত হরমুজ প্রণালি খোলার ব্যাপারে দুই নেতাই বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন বলে জানিয়েছে হোয়াইট হাউস। তবে এই আতিথেয়তা আর হাসিমুখের আড়ালে আসল লড়াইটা যে তাইওয়ান নিয়ে, তা মনে করিয়ে দিতে ভুল করেননি শি জিনপিং। বৈঠকের শুরুতেই তিনি ট্রাম্পকে কড়া ভাষায় সতর্ক করে বলেন, তাইওয়ান প্রশ্নে যেকোনো ভুল পদক্ষেপ দুই দেশকে সরাসরি যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে। ফলে, বেইজিংয়ের এই বৈঠক থেকে শান্তির বারতা এলেও যুদ্ধের শঙ্কা তাতে পুরোপুরি মুছে যায়নি।

৯ বছর পর চীন সফরে যাওয়া ট্রাম্পকে বেইজিং বরণ করে নিয়েছে নজিরবিহীন জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনে। লাল গালিচা সংবর্ধনা, গান স্যালুট আর দুদেশের পতাকা হাতে শিশুদের উল্লাসের মধ্য দিয়ে ট্রাম্পকে যখন গ্রেট হল অব দ্য পিপলে স্বাগত জানানো হয়, তখন তাকে বেশ উচ্ছ্বসিত দেখাচ্ছিল। করমর্দনের সময় ট্রাম্পকে দেখা যায় শি জিনপিংয়ের বাহুতে মৃদু চাপ দিয়ে সখ্য প্রকাশের চেষ্টা করতে। সিনহুয়া নিউজ এজেন্সির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্প বারংবার শি জিনপিংকে একজন ‘মহান নেতা’ হিসেবে অভিহিত করেন। ট্রাম্প বলেন, “আপনার বন্ধু হতে পারা আমার জন্য সম্মানের। আমাদের মধ্যকার সম্পর্ক আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে ভালো হতে যাচ্ছে।” অথচ, ২০১৬ সালের নির্বাচনি প্রচারে এই ট্রাম্পই বলেছিলেন, “চীন তার বাণিজ্যনীতি দিয়ে আমাদের দেশকে ধর্ষণ করছে।” ২০২০ সালে ট্রাম্প বলেছিলেন, “চীন যুক্তরাষ্ট্রকে এমনভাবে ঠকিয়েছে যা আগে কেউ করেনি।” রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের বরাতে সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিজের রাজনৈতিক ব্র্যান্ড ‘চায়না টাফ’ ইমেজের বাইরে গিয়ে ট্রাম্পের এই স্তুতি মূলত বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতির চাপে এক কৌশলগত পশ্চাদপসরণ।

বৈঠকের অন্যতম প্রধান আলোচনার বিষয় ছিল ইরান যুদ্ধ এবং এর ফলে সৃষ্ট বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট। হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ট্রাম্প ও শি জিনপিং একমত হয়েছেন যে হরমুজ প্রণালি অবশ্যই উন্মুক্ত রাখতে হবে, যাতে জ্বালানি তেলের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করা যায়। ইরান যুদ্ধের কারণে অবরুদ্ধ এই নৌপথটি বিশ্ব অর্থনীতির নাভিশ্বাস তুলে ছেড়েছে। শি স্পষ্ট করেছেন, চীন এই প্রণালির সামরিকীকরণ ও ব্যবহারের জন্য কোনো প্রকার মাশুল আদায়ের ঘোর বিরোধী। চীন বর্তমানে ইরানের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার। তাই তেহরানকে আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনতে বেইজিংয়ের প্রভাবকে ব্যবহার করতে চান ট্রাম্প। বিনিময়ে চীন ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে সরাসরি আরও বেশি অপরিশোধিত তেল আমদানির আগ্রহ দেখিয়েছে, যা দুদেশের বাণিজ্যিক ঘাটতি কমাতে সহায়ক হতে পারে।

বৈঠকের পরিবেশ অত্যন্ত হৃদ্যতাপূর্ণ থাকলেও তাইওয়ান ইস্যুতে শির অবস্থান ছিল হিমশীতল ও কঠোর। আল জাজিরার প্রতিবেদন মতে, শি সতর্ক করে বলেছেন, “তাইওয়ান প্রশ্নটি চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং স্পর্শকাতর বিষয়। এটি সঠিকভাবে সামলাতে না পারলে দুই দেশ সরাসরি সংঘর্ষে লিপ্ত হতে পারে, যা পুরো বিশ্বকে এক ভয়াবহ পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দেবে।”

বেইজিংয়ের পক্ষ থেকে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে, বাণিজ্য বা প্রযুক্তিতে ছাড় দেওয়া সম্ভব হলেও তাইওয়ান প্রশ্নে কোনো আপস করা হবে না। শি প্রশ্ন তুলেছেন, দুই দেশ কি অনিবার্য যুদ্ধ এড়িয়ে চলতে পারবে? বেইজিংয়ের দাবি, ওয়াশিংটনকে ‘এক চীন’ নীতি অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে হবে এবং তাইওয়ানে অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করতে হবে। তবে বৈঠকে ট্রাম্প এ বিষয়ে কী প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তা নিয়ে ওয়াশিংটন বা বেইজিংÑ কোনো পক্ষই বিস্তারিত কিছু জানায়নি।

ট্রাম্পের এই সফরে তার সফরসঙ্গী হিসেবে রয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের ৩০ জন শীর্ষস্থানীয় সিইও। এদের মধ্যে রয়েছেন ইলন মাস্ক (টেসলা), টিম কুক (অ্যাপল) ও এনভিডিয়ার প্রধান জেনসেন হুয়াং। ট্রাম্প রাষ্ট্রীয় ভোজসভায় এই ব্যবসায়ীদের ব্যক্তিগতভাবে শির সাথে পরিচয় করিয়ে দেন। চীনের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংকটÑ বিশেষ করে আবাসন খাতের অস্থিরতা এবং ক্রমবর্ধমান বেকারত্বের মুখে বেইজিং এখন বিদেশি বিনিয়োগের জন্য মরিয়া। শি আশ্বস্ত করেছেন, “চীনের দরজা বাইরের বিশ্বের জন্য আরও উন্মুক্ত হবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলো এখানে উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ খুঁজে পাবে।” এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে ১০টি চীনা কোম্পানিকে এনভিডিয়ার শক্তিশালী চিপ কেনার অনুমতি দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে। এটি দীর্ঘদিনের প্রযুক্তিগত যুদ্ধের একটি বড় বরফগলা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

দুই নেতা তাদের ভবিষ্যৎ সম্পর্ককে ‘গঠনমূলক, কৌশলগত ও স্থিতিশীল’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করতে একমত হয়েছেন। শির মতে, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রকে প্রতিদ্বন্দ্বী নয় বরং অংশীদার হিসেবে কাজ করতে হবে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, দুই দেশ কি অনিবার্য যুদ্ধ এড়িয়ে নতুন এক বিশ্বব্যবস্থা গড়তে পারবে?

শি তার ভাষণে বলেছেন, “চীনা জাতির মহান পুনর্জাগরণ ও ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ স্লোগান হাতে হাত রেখে চলতে পারে।” ট্রাম্প এর জবাবে শিকে আগামী সেপ্টেম্বরে হোয়াইট হাউস সফরের আমন্ত্রণ জানান।

এদিকে, ট্রাম্প যখন বেইজিংয়ে অবস্থান করছেন, তখনই ক্রেমলিন থেকে বড় এক ঘোষণা এসেছে। দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন শিগগির বেইজিং সফরে যাচ্ছেন। ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে চীন ও রাশিয়ার ‘সীমাহীন বন্ধুত্ব’ যখন তুঙ্গে, তখন ট্রাম্পের এই সফরের পরপরই পুতিনের আগমন ওয়াশিংটনের জন্য কিছুটা অস্বস্তিকর হতে পারে। পুতিন ও শি এ পর্যন্ত ৪০ বারের বেশি দেখা করেছেন, যা তাদের গভীর সামরিক ও কৌশলগত মৈত্রীর প্রমাণ দেয়।

বিশ্লেষকদের বরাতে সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীনে বর্তমানে বেকারত্ব, আবাসন সংকট ও ঋণের বোঝা বাড়ছে; অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে ইরান যুদ্ধের কারণে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা নিম্নমুখী। তাই এই ‘মহাসম্মেলন’ আসলে বিশ্বশান্তির চেয়েও বেশি ছিল দুই নেতার রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার চেষ্টা। বেইজিং এখন বিশ্বের দ্বিতীয় প্রধান রাজধানীতে পরিণত হয়েছেÑ ট্রাম্পের এই প্রশংসাসূচক সফর যেন সেই সত্যকেই সিলমোহর দিল। শেষ পর্যন্ত এই ‘মধুর সম্পর্ক’ কতদিন টেকে, নাকি তাইওয়ানের ‘মেঘে ঢাকা’ পড়ে যায় সব, সেটাই দেখার বিষয়।



শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা