ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্র যদি পুনরায় আক্রমণ চালায়, তবে তারা ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মাত্রা বাড়িয়ে পারমাণবিক বোমা তৈরির পথে হাঁটবে, হুঁশিয়ারি ইরানের। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে আবার ঘনীভূত হচ্ছে যুদ্ধের কালো মেঘ। ৮ এপ্রিল থেকে কার্যকর হওয়া ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি এখন খাদের কিনারে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভাষায়, এই শান্তিপ্রক্রিয়া এখন ‘লাইফ সাপোর্টে’ আছে, যা টিকে থাকার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ।
বিপরীতে তেহরান স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়েছে, ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্র যদি পুনরায় আক্রমণ চালায়, তবে তারা ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মাত্রা বাড়িয়ে পারমাণবিক বোমা তৈরির পথে হাঁটবে।
এদিকে অন্য কোনো উপায় না পেয়ে যুক্তরাষ্ট্র এখন জরুরি মজুদ থেকে পাঁচ কোটি ব্যারেল তেল ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। খবর দ্য গার্ডিয়ান, আল জাজিরা ও সিএনএনের।
যুক্তরাষ্ট্র মনে করে, ইরান গোপনে পারমাণবিক অস্ত্র বানানোর প্রকল্প জারি রেখেছে। কিন্তু এ ধরনের অভিযোগ এখন পর্যন্ত পশ্চিমা বিশ্ব প্রমাণ করতে পারেনি। অথচ ইরানকে এমন প্রকল্প থেকে বিরত রাখার অজুহাতে একতরফা সামরিক আক্রমণ শুরু করেছিল যুক্তরাষ্ট্র ও এর মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধমিত্র ইসরায়েল। তেহরান নিরুপায় হয়ে আত্মসমর্পণ করবে, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর এমন ‘প্ররোচনায়’ যুদ্ধে জড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এরই মধ্যে ঘরে-বাইরে নিন্দা কুড়াচ্ছেন, জনপ্রিয়তা হারাচ্ছেন।
অদম্য ইরান পাল্টা আঘাতে প্রতিপক্ষকে শক্ত বার্তা দিয়েছেÑ কোনো অন্যায় চাপের কাছে তারা মাথা নোয়াবে না। ‘এক দিনে পুরো সভ্যতা ধ্বংস’ করার হুমকি দিয়েও সেজন্য পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় রণে ভঙ্গ দিয়েছিলেন ট্রাম্প। তবে এখনও স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার পথ মসৃণ হয়নি।
সর্বশেষ যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাব নিয়ে তেহরানের জবাব সম্পর্কে বলতে গিয়ে হোয়াইট হাউসে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অত্যন্ত কড়া ভাষায় সমালোচনা করেন।
তিনি ইরানের জবাবকে ‘আবর্জনা’ হিসেবে অভিহিত করে বলেন, “আমি এটি পুরোটা পড়ে দেখারও প্রয়োজন বোধ করিনি। ডাক্তার যেমন এসে বলেন, আপনার প্রিয়জনের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা মাত্র ১ শতাংশ, বর্তমান যুদ্ধবিরতির অবস্থাও ঠিক তেমন।”
যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে যুদ্ধ শুরু করতে পারেÑ এমন আশঙ্কার মধ্যেই তেহরানের পক্ষ থেকে কড়া সতর্কবার্তা শোনা গেল। ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক কমিশনের মুখপাত্র ইব্রাহিম রেজায়ি সামাজিক মাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে হুঁশিয়ারি দেন, “আবারও হামলা হলে ইরানের সামনে অন্যতম একটি বিকল্প হতে পারে ইউরেনিয়াম ৯০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ করা। আমরা পার্লামেন্টে বিষয়টি পর্যালোচনা করে দেখব।” এ কথার অর্থ হলো, আক্রান্ত হলে তারা পারমাণবিক বোমা বানানোর দিকে হাঁটবে, কারণ পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জন্য সাধারণত ৯০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের প্রয়োজন হয়।
পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, ইরান এখনও তাদের ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ করা ৪০০ কেজির বেশি ইউরেনিয়াম হস্তান্তর করেনি। বিশেষজ্ঞদের মতে, ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম থেকে খুব সহজেই এবং প্রযুক্তিগতভাবে অল্প সময়ের মধ্যে অস্ত্র তৈরির উপযোগী ৯০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামে পৌঁছানো সম্ভব।
যুদ্ধবিরতি ভেস্তে যাওয়ার উপক্রম হওয়ায় ওয়াশিংটন এখন হরমুজ প্রণালিতে পুনরায় সামরিক প্রহরা বা ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ চালুর কথা ভাবছে, যা ইরান কর্তৃক প্রণালীটি অবরোধের পাল্টাপাল্টি ব্যবস্থা হিসেবে দেখা হচ্ছে। তেহরান স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, তাদের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি না দিলে এই নৌ-অবরোধ সরবে না।
আন্তর্জাতিক মেরিটাইম অর্গানাইজেশন জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি সংলগ্ন এলাকায় বর্তমানে তেলবাহী দেড় হাজার ট্যাঙ্কার এবং ২০ হাজার নাবিক আটকা পড়ে আছেন। সপ্তাহ পার হয়ে যাওয়ায় সেখানে খাদ্য ও সুপেয় পানির সংকট দেখা দিচ্ছে। ওমান ও অন্যান্য প্রতিবেশী দেশগুলো মানবিক করিডোর তৈরির চেষ্টা করলেও যুদ্ধংদেহী মনোভাবের কারণে তা সফল হচ্ছে না।
এই যুদ্ধের প্রভাব শুধু মরুভূমির বুকেই সীমাবদ্ধ নেই, তা পৌঁছে গেছে জাপানের সুপারশপ থেকে আমেরিকার সাধারণ মানুষের পকেট পর্যন্ত। তেলের অভাবে কালির কাঁচামাল ‘ন্যাপথা’ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জাপানের বিখ্যাত স্ন্যাকস নির্মাতা কোম্পানি ‘কালবি’ তাদের রঙিন প্যাকেজিং বাদ দিয়ে সাদা-কালো প্যাকেট ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩.৮ শতাংশে। বিমানের ভাড়া বেড়েছে ২০ শতাংশের বেশি। বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০৫ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। তেলের ক্রমবর্ধমান দাম নিয়ন্ত্রণে আনতে ট্রাম্প প্রশাসন তাদের কৌশলগত মজুদ থেকে ৫ কোটি ৩০ লাখ ব্যারেলের বেশি তেল বাজারে ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) সঙ্গে সমন্বিত চুক্তির অংশ হিসেবে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। জরুরি বিনিময় কর্মসূচির আওতায় ৯টি কোম্পানির মাধ্যমে মজুদ তেল ছাড়ছে তারা। ওয়াশিংটন বলছে, গত মার্চ মাসে আইইএর সদস্য দেশগুলোর মধ্যে বৈশ্বিক তেলের বাজার স্থিতিশীল রাখতে ইতিহাসের বৃহত্তম মজুদ ছাড়ার যে সিদ্ধান্ত হয়েছিল, এটি তারই ধারাবাহিকতা। ওই চুক্তির আওতায় মোট ১৭ কোটি ২০ লাখ ব্যারেল তেল ছাড়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন। বিনিময় কর্মসূচির নিয়ম অনুযায়ী, যে ৯টি কোম্পানি এখন জরুরি মজুদ থেকে তেল নিচ্ছে, তাদের একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সমপরিমাণ তেল পুনরায় সরকারি ভান্ডারে ফেরত দিতে হবে।