প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ০৯ মে ২০২৬ ০৯:৩৭ এএম
আপডেট : ০৯ মে ২০২৬ ০৯:৩৮ এএম
হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সামরিক উত্তেজনা নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
যুদ্ধবিরতির এক মাস পূর্ণ হওয়ার দিনে গতকাল শুক্রবার কৌশলগত হরমুজ প্রণালিতে পাল্টাপাল্টি হামলায় জড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান।
যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের জন্য উভয় পক্ষ একে অপরকে দায়ী করছে। ফলে, যুদ্ধ বন্ধের যে আশা দেখা দিয়েছিল, হরমুজ নিয়ন্ত্রণের এই লড়াই উল্টো আশঙ্কার আবহ তৈরি করল।
কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মধ্যেই ওয়াশিংটনের এমন আক্রমণের তীব্র সমালোচনা করে তেহরান সাফ জানিয়ে দিয়েছে, তারা কখনোই কোনো চাপের কাছে মাথা নত করবে না।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অবশ্য এই হামলাকে ‘আদরের টোক’ বলে দাবি করেছেন, যুদ্ধবিরতি অক্ষুণ্ন রয়েছে।
এদিকে, এই সামরিক উত্তেজনার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার (সিআইএ) এক গোপন প্রতিবেদনে বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য।
এতে বলা হয়েছে, ব্যাপক যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বোমাবর্ষণের পরও ইরানের সামরিক সক্ষমতা ও ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদ প্রায় অক্ষতই রয়ে গেছে। খবর দ্য গার্ডিয়ান, ওয়াশিংটন পোস্ট ও মিডল ইস্ট আইয়ের।
২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর আকস্মিক ও একতরফা সামরিক আগ্রাসন শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও এর মধ্যপ্রাচ্যের মিত্র ইসরায়েল।
ওয়াশিংটন ভেবেছিল, সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে হত্যার মধ্য দিয়ে ইরানকে পায়ের তলায় পিষতে পারবে। কিন্তু তেহরান পশ্চিমাদের পদতলে লুটিয়ে পড়েনি, উল্টো শিরদাঁড়া সোজা রেখে অপ্রতিরোধ্য প্রত্যাঘাত করে গেছে।
৮ এপ্রিল পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় প্রথমে ১৪ দিনের যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। এরপর ‘শান্তি চুক্তির সম্ভাবনা’র কথা বলে ট্রাম্প অনির্দিষ্টকালের জন্য যুদ্ধিবিরতির মেয়াদ বাড়ান।
হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সংঘাত
হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ইরানের সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে।
ওয়াশিংটনের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি ডেসট্রয়ারের ওপর হামলার জবাবে তারা এই পাল্টা হামলা চালিয়েছে।
কিন্তু তেহরানের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্রই প্রথম একটি তেলের ট্যাংকার ও আরেকটি জাহাজে হামলা চালিয়ে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করেছে, যার জবাবে তারা তাৎক্ষণিক পাল্টা হামলা চালিয়েছে।
পাল্টাপাল্টি এই হামলায় ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতিটি ভেস্তে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হলেও ট্রাম্প দাবি করেছেন, যুদ্ধবিরতি এখনও কার্যকর রয়েছে।
এবিসি নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এই হামলাকে নিছক একটি ‘আদরের টোকা’ বলে অভিহিত করেন তিনি।
লিঙ্কন মেমোরিয়াল পরিদর্শনের সময় সাংবাদিকদের তিনি বলেন, “হ্যাঁ, যুদ্ধবিরতি চলছে। তারা আমাদের সঙ্গে একটু ছিনিমিনি খেলেছে। আমরাও তাদের উড়িয়ে দিয়েছি। আমি একে একটি তুচ্ছ ঘটনা বলব।”
নিজের মালিকানাধীন সামাজিক মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লিখেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধজাহাজের কোনো ক্ষতি হয়নি, তবে আক্রমণকারী ইরানিদের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
তিনি আরও হুমকি দিয়ে বলেন, “তারা যদি দ্রুত চুক্তিতে স্বাক্ষর না করে, তবে ভবিষ্যতে আমরা তাদের আরও অনেক বেশি শক্ত ও ভয়ংকরভাবে আঘাত করব।”
যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত এক পৃষ্ঠার ওই চুক্তিতে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া এবং ৩০ দিনের জন্য যুদ্ধ বন্ধ রাখার কথা বলা হয়েছে।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক উপদেষ্টা অ্যামোস হকস্টাইন সম্প্রতি বলেছেন, ট্রাম্প যতই চেষ্টা করুন না কেন, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ আসলে চিরদিন ইরানের হাতেই থাকবে।
সব সময় কূটনীতিই বলির পাঁঠা হয়
যুক্তরাষ্ট্রের এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি।
সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে ‘বেপরোয়া সামরিক অভিযানের’ জন্য অভিযুক্ত করেন।
তিনি বলেন, “যখনই আলোচনার টেবিলে কোনো কূটনৈতিক সমাধানের পথ তৈরি হয়, তখনই যুক্তরাষ্ট্র বেপরোয়া সামরিক অভিযানের পথ বেছে নেয়।
“এটি কি স্রেফ চাপ প্রয়োগের কোনো জঘন্য কৌশল? নাকি এর পেছনে থাকা কোনো ইন্ধনদাতা ডোনাল্ড ট্রাম্পকে আবারও একটি চোরাবালির দিকে ঠেলে দিচ্ছে?”
আরাগচি স্পষ্ট করে বলেন, “কারণ যা-ই হোক না কেন, ফলাফল একই : ইরানিরা কখনই চাপের কাছে মাথা নত করে না এবং এখানে সব সময় কূটনীতিই বলির পাঁঠা হয়।”
অক্ষুণ্ন আছে ইরানের সামরিক সক্ষমতা
দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি সপ্তাহে সিআইএ ট্রাম্প প্রশাসনকে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ সত্ত্বেও ইরান অন্তত আরও তিন থেকে চার মাস শক্তভাবে টিকে থাকতে পারবে।
শুধু তা-ই নয়, সিআইএ জানিয়েছে, টানা কয়েক সপ্তাহ যুক্তরাষ্ট্রে ও ইসরায়েলের হামলার পরও তেহরানের কাছে এখনও ‘উল্লেখযোগ্য ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা’ রয়ে গেছে।
সিআইএর এই তথ্য ট্রাম্প প্রশাসনের প্রকাশ্য দাবিগুলোর সম্পূর্ণ বিপরীত।
বুধবার ট্রাম্প ওভাল অফিসে বসে দাবি করেছিলেন, ইরানের বেশিরভাগ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ধ্বংস হয়ে গেছে এবং তাদের হাতে যুদ্ধপূর্ব মজুদের মাত্র ১৮ বা ১৯ শতাংশ অবশিষ্ট রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধমন্ত্রী পিট হেগসেথও এপ্রিলে দাবি করেছিলেন যে, ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ ইরানের সামরিক বাহিনীকে ধ্বংস করে দিয়েছে।
কিন্তু সিআইএ বলছে, যুদ্ধপূর্ব সময়ের প্রায় ৭০ শতাংশ ক্ষেপণাস্ত্র ও ৭৫ শতাংশ মোবাইল লঞ্চার এখনও ইরানের হাতে মজুদ আছে। এমনকি ইরান তাদের ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র সংরক্ষণাগারগুলোও পুনরায় চালু করতে সক্ষম হয়েছে।
তবে সিআইএর এই পরিসংখ্যানকেও ভুল বলে দাবি করেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি।
তিনি যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা তথ্যকে উপহাস করে বলেন, “সিআইএ ভুল বলছে। ২৮ ফেব্রুয়ারির তুলনায় আমাদের ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদ ও লঞ্চারের সক্ষমতা ৭৫ শতাংশে নেমে আসেনি।
“এর সঠিক পরিসংখ্যান হলো ১২০ শতাংশ। আর আমাদের জনগণকে রক্ষা করার প্রস্তুতির কথা যদি বলেন, সেটি এক হাজার শতাংশ।”