নবান্নের চাবিকাঠি শেষ পর্যন্ত উঠছে ‘মমতাবধের নেতা’ শুভেন্দু অধিকারীর হাতেই। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতার পালাবদলে সব জল্পনার অবসান ঘটিয়ে নবান্নের চাবিকাঠি শেষ পর্যন্ত উঠল ‘মমতাবধের নেতা’ শুভেন্দু অধিকারীর হাতেই। আর দক্ষিণে তিন দশকের দ্রাবিড় রাজনীতির সমীকরণ ভেঙে তামিলনাড়ুর মসনদে বসছেন জনপ্রিয় অভিনেতা ও টিভিকে দলের প্রধান বিজয় থালাপতি। দুই রাজ্যেই এক অভূতপূর্ব রাজনৈতিক পটপরিবর্তন দেখল ভারত। আজ শনিবার কলকাতার ঐতিহ্যবাহী ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে শপথ নেবে পশ্চিমবঙ্গের প্রথম বিজেপি সরকার, যেখানে উপস্থিত থাকবেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। অন্যদিকে, ছোট কয়েকটি দলের সমর্থন নিয়ে আজ তামিলনাড়ুতেও শপথ নিচ্ছেন বিজয়। খবর আনন্দবাজার পত্রিকা ও এনডিটিভির।
২০১১ সাল থেকে পশ্চিমবঙ্গ শাসন করে আসছিল তৃণমূল কংগ্রেস। দলটির প্রধান নেতা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের সময়ই প্রথম চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। সেবার তারা লোকসভায় রাজ্যের ৪২ আসনের ১৮টিতে জয় পায় বিজেপি। তখন তারা মমতাকে বলেছিল, ‘উনিশে হাফ, একুশে সাফ।’ তবে, ২০২১ সালের বিধানসভায় মমতাকে হারাতে না পারলেও এ বছর তারা ঠিকই পরাজিত করেছে মমতাকে।
সোনার বাংলা গড়ার প্রত্যয় শুভেন্দুর : পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভায় ২৯৪টি আসন। ২৯৩টি আসনের ভোটফল প্রকাশ হয় গত ৪ মে; অন্য আসনে পরে পুনরায় ভোটগ্রহণ হবে। সরকার গঠনের জন্য দরকার ছিল ১৪৭ আসন। বিজেপি একাই পেয়েছে ২০৭টি। তৃণমূল কংগ্রেস পেয়েছে মাত্র ৮০টি। কিন্তু ভোট লুটের অভিযোগ তুলে মমতা নিজ থেকে পদত্যাগ করতে চাননি, যদিও ৭ মে তার সরকারের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে।
আনন্দবাজার পত্রিকার অনলাইন সংস্করণে কয়েকটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, গত তিন দিন ধরে বিজেপির অন্দরমহলে মুখ্যমন্ত্রী কে হবেন তা নিয়ে যে জল্পনা চলছিল। গতকাল শুক্রবার এর অবসান ঘটে। বিকালে নিউটাউনের বিশ্ববাংলা কনভেনশন সেন্টারে ২০৭ জন বিজয়ী বিধায়কের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক করেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। সর্বসম্মতিক্রমে পরিষদীয় দলনেতা হিসেবে শুভেন্দু অধিকারীর নাম চূড়ান্ত হওয়ার পর শাহ আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়ে বলেন, ‘আটটি প্রস্তাব এসেছিল এবং সব কটিতে একটিই নাম ছিল। তাই শুভেন্দু অধিকারীকে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে ঘোষণা করছি।’
প্রথমে ২০২১ সালে নন্দীগ্রামে এবং এবার স্বয়ং ভবানীপুরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে হারানো এই নেতাকেই মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে বেছে নেওয়ার বিষয়ে বিজেপির অন্দরমহলে খুব একটা সংশয় ছিল না। নাম ঘোষণার পর প্রথম ভাষণে শুভেন্দু বলেছেন, ‘আমি একা নই, ‘আমরা’ নীতিতে চলবে বিজেপি সরকার। কথা কম, কাজ বেশি হবে।’ স্বামী বিবেকানন্দের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি জানান, তার সরকারের মূলমন্ত্র হবে ‘চরৈবেতি’ তথা ‘এগিয়ে চলো’। শুভেন্দু আরও বলেন, রাজ্যে এবার ‘ডাবল ইঞ্জিন’ সরকার চলবে। প্রধানমন্ত্রী মোদির ‘সবকা সাথ, সবকা বিকাশ’ নীতির ওপর জোর দিয়ে কেন্দ্র ও রাজ্য একসঙ্গে কাজ করবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘বিজেপি ৪৬ শতাংশ মানুষের সমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে। আগামী নির্বাচনে আমাদের ইতিবাচক কাজ করে ৬০ শতাংশের বেশি মানুষকে পাশে আনতে হবে। মা-বোনদের পাশে আনতে হবে এবং বাংলাকে সোনার বাংলায় পরিণত করতে হবে।’ সেই সঙ্গে অমিত শাহের দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, দুর্নীতি ও নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে কমিশন গঠনের কথাও পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।
ভারতে আজ পঁচিশে বৈশাখ। রবীন্দ্রজয়ন্তীর দিনটিকে শপথের জন্য বেছে নিয়েছে বিজেপি। ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে কলকাতাজুড়ে প্রায় চার হাজার পুলিশ মোতায়েন করে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার চাদর তৈরি করা হয়েছে। আকাশপথে নজরদারির পাশাপাশি রাস্তায় থাকছে কুইক রেসপন্স টিম। প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছাড়াও বিজেপি শাসিত বিভিন্ন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীরা এই ঐতিহাসিক অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন।
তবে বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পদত্যাগ না করায় শুক্রবার পর্যন্ত এক অভূতপূর্ব সাংবিধানিক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। গত বৃহস্পতিবার রাজ্যপাল বিধানসভা ভেঙে দেওয়ার পর রাজ্যের শাসনভার আপাতত তার হাতেই রয়েছে।
দক্ষিণে বিজয়ের উত্থান, ‘ইন্ডিয়া’ জোটে ফাটল : পশ্চিমবঙ্গের মতোই তামিলনাড়ুতেও ঘটেছে বড় ধরনের রাজনৈতিক ভূমিকম্প। গত সাত দশকের ডিএমকে-এডিএমকে দ্বিদলীয় আধিপত্য ভেঙে দিয়ে একক বৃহত্তম দল হিসেবে উঠে এসেছে অভিনেতা বিজয়ের দল ‘টিভিকে’। তবে ২৩৪ আসনের বিধানসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য ১১৮টি আসন প্রয়োজন হলেও, বিজয়ের দল জিতেছিল ১০৮টি। কংগ্রেস ও অন্যান্য বাম দলগুলোর সমর্থন নিয়ে বিজয় যখন সরকার গঠনের দাবি জানাচ্ছিলেন, তখন রাজ্যপাল তাকে পরপর দুদিন ফিরিয়ে দেন। রাজ্যপাল স্পষ্ট জানিয়েছিলেন, ১১৮ জন বিধায়কের লিখিত সমর্থন ছাড়া তিনি সরকার গঠনের আমন্ত্রণ জানাবেন না।
তবে এনডিটিভির খবরে বলা হয়েছে, শুক্রবার নাটকীয় মোড় নেয় তামিল রাজনীতি। কংগ্রেসের পাশাপাশি বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী এমকে স্ট্যালিনের ডিএমকের পুরনো মিত্র সিপিএম, সিপিআই ও দলিত সংগঠন ভিসিকে বিজয়কে সমর্থনের ঘোষণা দেয়। এর ফলে ১১৮ জনেরও বেশি বিধায়কের সমর্থন নিয়ে শুক্রবার সন্ধ্যায় রাজ্যপালের কাছে গিয়ে সরকার গঠনের আনুষ্ঠানিক দাবি পেশ করেন বিজয়। আজ শনিবার সকাল ১১টায় তার মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার কথা রয়েছে।
এদিকে, বিজয়ের এই উত্থান শুধু তামিলনাড়ুতেই নয়, সর্বভারতীয় রাজনীতিতেও বড় প্রভাব ফেলেছে। কংগ্রেস বিজয়কে সমর্থন দেওয়ায় ক্ষুব্ধ হয়ে ডিএমকে জাতীয় পর্যায়ে বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’ এবং সংসদে কংগ্রেসের সঙ্গ ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছে। লোকসভায় ডিএমকের নেত্রী কানিমোঝি স্পিকারকে চিঠি দিয়ে তাদের বসার আসন কংগ্রেসের পাস থেকে সরিয়ে দেওয়ারও অনুরোধ করেছেন। ডিএমকের এই সিদ্ধান্তে লোকসভায় প্রধানমন্ত্রী মোদির সরকারের বিরুদ্ধে বিরোধীদের ঐক্যবদ্ধ লড়াইয়ের পথ বেশ দুর্বল হয়ে পড়ল বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।