× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

কোকা-কোলার জন্মকথা: এক ফার্মাসিস্টের পরীক্ষাগার থেকে বিশ্বজয়

প্রবা প্রতিবেদন

প্রকাশ : ০৮ মে ২০২৬ ১০:০৪ এএম

আপডেট : ০৮ মে ২০২৬ ১১:২৬ এএম

কোকা-কোলা কোম্পানির শুরুর দিকের একটি ছবি। লিংকডিন থেকে নেওয়া

কোকা-কোলা কোম্পানির শুরুর দিকের একটি ছবি। লিংকডিন থেকে নেওয়া

১৮৮৬ সালের এক গরম দুপুর। আটলান্টা শহরের একটি ছোট পরীক্ষাগারে বসে নতুন ধরনের পানীয় তৈরির চেষ্টা করছিলেন একজন ফার্মাসিস্ট। তাঁর নাম জন স্টিথ পেম্বারটন। সেই পরীক্ষার ফলই পরে পৃথিবীর সবচেয়ে পরিচিত ব্র্যান্ডগুলোর একটিতে রূপ নেয় কোকা-কোলা।

বর্তমানে কোকা-কোলা শুধু একটি কোমল পানীয় নয়; এটি বিশ্বায়ন, আধুনিক বিপণন, বিজ্ঞাপন, ভোক্তা সংস্কৃতি এবং ব্র্যান্ড পরিচয়ের এক শক্তিশালী প্রতীক। পৃথিবীর ২০০টিরও বেশি দেশে প্রতিদিন প্রায় ১.৯ বিলিয়ন গ্লাস বিক্রি হয় এই পানীয়ের। কিন্তু বিস্ময়কর বিষয় হলো, এর শুরুটা ছিল অত্যন্ত সাধারণ একজন ফার্মাসিস্টের চিকিৎসাবিষয়ক পরীক্ষাগার থেকে।

একজন ফার্মাসিস্টের স্বপ্ন

জন স্টিথ পেম্বারটন ছিলেন একজন রসায়নবিদ ও ফার্মাসিস্ট। সে সময় আমেরিকার গৃহযুদ্ধে অংশ নিয়ে আহত হন জন। ধারণা করা হয়, সেই আঘাতের চিকিৎসায় ব্যবহৃত ওষুধের প্রভাব থেকে মুক্তির পথ খুঁজতেই তিনি নানা ধরনের টনিক ও ঔষধি পানীয় তৈরি নিয়ে গবেষণা শুরু করেন।

সেই সময় আমেরিকায় “মেডিসিন ড্রিংক” বা ঔষধি পানীয়ের বেশ জনপ্রিয়তা ছিল। মানুষ বিশ্বাস করত, এসব পানীয় মাথাব্যথা, ক্লান্তি ও হজমের সমস্যায় উপকার করে। পেম্বারটনও এমন একটি পানীয় বানাতে চেয়েছিলেন যা একই সঙ্গে সতেজতা ও শক্তি দেবে।

১৮৮৬ সালে তিনি এক ধরনের সিরাপ তৈরি করেন, যাতে কোকা পাতার নির্যাস ও কোলা বাদামের নির্যাস ব্যবহার করা হয়েছিল। “কোকা” এবং “কোলা”—এই দুটি শব্দ থেকেই নাম হয় Coca-Cola।

প্রথমে এটি সাধারণ পানির সঙ্গে মিশিয়ে পান করা হতো। পরে দুর্ঘটনাবশত সোডা পানির সঙ্গে মিশে তৈরি হয় কার্বনেটেড সংস্করণ। আর সেখান থেকেই জন্ম নেয় আজকের পরিচিত ঝাঁঝালো কোকা-কোলা।

নাম, লোগো ও ব্র্যান্ড পরিচয়ের সূচনা

কোকা-কোলার বিখ্যাত নাম ও লোগো ডিজাইন করেছিলেন পেম্বারটনের হিসাবরক্ষক ফ্র্যাঙ্ক ম্যাসন রবিনসন। তার ধারণা ছিল, দুটি “C” পাশাপাশি থাকলে বিজ্ঞাপনে দেখতে আকর্ষণীয় লাগবে।

আজও সেই হাতে লেখা স্ক্রিপ্ট ফন্টের লোগো পৃথিবীর সবচেয়ে পরিচিত ব্র্যান্ড পরিচিতিগুলোর একটি। লাল রঙের ব্যাকগ্রাউন্ড ও সাদা অক্ষরের এই নকশা শুধু একটি লোগো নয়—এটি এখন বৈশ্বিক বাণিজ্যের প্রতীক।

প্রথম বিক্রি: দিনে মাত্র ৯ গ্লাস

১৮৮৬ সালের ৮ মে আটলান্টার একটি ফার্মেসির সোডা ফাউন্টেনে প্রথম কোকা-কোলা বিক্রি শুরু হয়। প্রতি গ্লাসের দাম ছিল ৫ সেন্ট।

কিন্তু শুরুটা মোটেও সফল ছিল না। প্রথম বছরে গড়ে প্রতিদিন মাত্র ৯ গ্লাস কোকা-কোলা বিক্রি হতো। পুরো বছরে আয় হয়েছিল প্রায় ৫০ ডলার, অথচ উৎপাদন ও বিজ্ঞাপনে খরচ হয়েছিল তারও বেশি।

পেম্বারটন হয়তো কখনো কল্পনাও করতে পারেননি, তার এই ছোট্ট পরীক্ষাই একদিন বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী ব্র্যান্ডগুলোর একটিতে পরিণত হবে।

পেম্বারটনের মৃত্যু ও কোকা-কোলার নতুন যাত্রা

অসুস্থতা ও আর্থিক সংকটের কারণে জন পেম্বারটন ধীরে ধীরে কোকা-কোলার মালিকানা বিক্রি করে দেন। ১৮৮৮ সালে তার মৃত্যু হয়। তখনও কোকা-কোলা কোনো বড় ব্যবসায়িক সাফল্য পায়নি।

পরে ব্যবসায়ী এসা গ্রিগস ক্যান্ডলার কোকা-কোলার অধিকার কিনে নেন এবং এটিকে জাতীয় ব্র্যান্ডে রূপ দেন।

পণ্যের প্রচারণায় ক্যান্ডলার ব্যাপক বিজ্ঞাপন চালু করেন, বিনামূল্যে কুপন বিতরণ করেন এবং আমেরিকার বিভিন্ন শহরে কোকা-কোলাকে জনপ্রিয় করে তোলেন। তার হাত ধরেই কোকা-কোলা একটি ছোট ফার্মেসির পানীয় থেকে জাতীয় পরিচিতি লাভ করে।

বোতলের নকশা: ব্যবসা থেকে শিল্পে উত্তরণ

প্রথম দিকে কোকা-কোলা শুধু সোডা ফাউন্টেনে বিক্রি হতো। পরে বোতলে ভরে বাজারজাত করা শুরু হয়।

১৯১৫ সালে রুট গ্লাস কোম্পানি কোকা-কোলার বিখ্যাত কনট্যুর বা বাঁকানো বোতল ডিজাইন করে। ধারণা করা হয়, এর নকশা কোকো ফলের আকৃতি থেকে অনুপ্রাণিত।

বোতলটি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছিল যাতে অন্ধকারেও মানুষ সেটিকে চিনতে পারে। পরবর্তীতে এটি শুধু একটি বোতল নয়, বরং বিশ্ব সংস্কৃতির প্রতীকে পরিণত হয়।

খ্যাতিমান শিল্পী এন্ডি ওয়ারহুল (Andy Warhol) তার বিখ্যাত পপ আর্টে কোকা-কোলার বোতল ব্যবহার করেন। তার শিল্পকর্মে এই বোতল গণউৎপাদন, ভোক্তাবাদ ও জনপ্রিয় সংস্কৃতির প্রতীক হয়ে ওঠে।

বিশ্বযুদ্ধ ও বৈশ্বিক বিস্তার

১৯১৯ সালে আর্নেস্ট উডরুফ (Ernest Woodruff) কোকা-কোলার মালিকানা গ্রহণ করেন। এরপর কোম্পানিটি আন্তর্জাতিকভাবে সম্প্রসারণ শুরু করে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মার্কিন সেনাদের কাছে কোকা-কোলা পৌঁছে দিতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বোতলজাত কারখানা স্থাপন করা হয়। যুদ্ধ শেষে সেই দেশগুলোর সাধারণ মানুষও পানীয়টির সঙ্গে পরিচিত হয়ে যায়।

এভাবেই কোকা-কোলা একটি আমেরিকান পানীয় থেকে বৈশ্বিক ব্র্যান্ডে পরিণত হয়।

যুদ্ধকালীন আমদানি নিষেধের কারণে কোকা-কোলার জার্মান শাখা ‘ফান্টা’ তৈরি করে, যা পরবর্তীতে আলাদা জনপ্রিয়তা অর্জন করে।

বিজ্ঞাপন, আবেগ ও সংস্কৃতির রাজনীতি

কোকা-কোলা শুধু পানীয় বিক্রি করেনি; বিক্রি করেছে আবেগ, আনন্দ ও জীবনধারা। ১৯৭১ সালে “I’d Like to Buy the World a Coke” বিজ্ঞাপনটি বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তোলে। এতে শান্তি, সম্প্রীতি ও বৈশ্বিক ঐক্যের বার্তা দেওয়া হয়েছিল। যা মানুষের মনে বিশেষ জায়গা করে নেয়।

পরে “Share a Coke” প্রচারণায় মানুষের নাম লেখা বোতল বাজারে এনে ভোক্তাদের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক তৈরি করা হয়—যা আধুনিক বিপণনের অন্যতম সফল উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত।

পণ্যের বিবর্তন ও উদ্ভাবন

পরিবর্তিত বাজারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কোকা-কোলা নিয়মিত নতুন পণ্য বাজারে আনে। এর মধ্যে রয়েছে Diet Coke, Cherry Coke, Vanilla Coke এবং Coke Zero Sugar। ১৯৮৫ সালে “নিউ কোক” নামে পরিবর্তিত ফর্মুলা বাজারে আনা হলেও তা ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে। পরে কোম্পানি আবার পুরোনো “ক্লাসিক” ফর্মুলায় ফিরে যেতে বাধ্য হয়।

সমালোচনা, স্বাস্থ্যঝুঁকি ও পরিবেশ বিতর্ক

বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় হলেও কোকা-কোলাকে নানা সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয়েছে। অতিরিক্ত চিনি, স্থূলতা, ডায়াবেটিস এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক রয়েছে।

একই সঙ্গে প্লাস্টিক বর্জ্য ও কার্বন নিঃসরণ নিয়ে পরিবেশবাদীদের সমালোচনাও বাড়তে থাকে। এর জবাবে কোম্পানি কম চিনি ও সুগার-ফ্রি পানীয় বাজারে আনে এবং পুনর্ব্যবহারযোগ্য প্যাকেজিং ব্যবহারের উদ্যোগ নেয়।

“World Without Waste” কর্মসূচির মাধ্যমে তারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বিক্রি হওয়া প্রতিটি বোতল বা ক্যানের সমপরিমাণ পুনর্ব্যবহার নিশ্চিত করার।

এছাড়া “PlantBottle” নামে আংশিক উদ্ভিদভিত্তিক উপাদানে তৈরি বোতলও বাজারে আনা হয়েছে।

কোকা-কোলা: একটি পানীয়ের চেয়েও বেশি

বর্তমানের কোকা-কোলা শুধু একটি কোমল পানীয় নয়; এটি আধুনিক বিপণন, ব্র্যান্ডিং, বিশ্বায়ন এবং গণসংস্কৃতির প্রতীক।

একসময় আটলান্টার ছোট্ট একটি পরীক্ষাগারে জন্ম নেওয়া পানীয়টি এখন পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি দেশে পরিচিত। বিজ্ঞাপন, ক্রীড়া পৃষ্ঠপোষকতা, সাংস্কৃতিক প্রভাব এবং ব্যবসায়িক কৌশলের মাধ্যমে কোকা-কোলা এমন এক অবস্থানে পৌঁছেছে, যেখানে এটি শুধু একটি ব্র্যান্ড নয়, একটি বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা।

আর সেই বিশাল সাম্রাজ্যের সূচনা হয়েছিল একজন ফার্মাসিস্টের নিঃশব্দ পরীক্ষাগারে, ১৮৮৬ সালের এক দুপুরে।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা