যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান যুদ্ধ শেষ করার জন্য ওয়াশিংটনের দেওয়া একটি শান্তি প্রস্তাব তেহরান পর্যালোচনা করছে। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান যুদ্ধ শেষ করার জন্য ওয়াশিংটনের দেওয়া একটি শান্তি প্রস্তাব তেহরান পর্যালোচনা করছে বলে জানিয়েছে।
এই যুদ্ধ বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকট তৈরি করেছে।
দ্য গার্ডিয়ান গতকাল এক প্রতিবেদনে বলেছে, যদিও শান্তি চুক্তির বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বেশ আশাবাদী, কিন্তু ইরান খুবই সতর্কতার সঙ্গে এগোচ্ছে।
পারমাণবিক অস্ত্র বানানোর অপ্রমাণিত অভিযোগ তুলে ইরানের ওপর ২৮ ফেব্রুয়ারি একতরফা সামরিক অভিযান শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও এর মধ্যপ্রাচ্যের মিত্র ইসরায়েল।
যেভাবে ইরানকে আত্মসমর্পণ করাতে বাধ্য করবে বলে ওয়াশিংটন ও তেল আবিব ভেবেছিল, সেই হিসাব কার্যত ভুল প্রমাণিত হয়েছে।
শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করে ইসরায়েলে এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিগুলোয় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে।
পরে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ৮ এপ্রিল উভয় পক্ষের মধ্যে ১৪ দিনের যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। আজ এই যুদ্ধবিরতির এক মাস পূর্ণ হলো।
যুদ্ধ বন্ধের বিষয়ে বলতে গিয়ে ট্রাম্প বুধবার বলেছেন, “আমাদের মধ্যে বেশ ভালো আলোচনা হয়েছে এবং আমরা একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে পারি বলে প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।”
এক্সিওসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুই পক্ষ ১৪ দফার খসড়া চুক্তির কাছাকাছি পৌঁছেছে।
এই চুক্তির আওতায় ইরান অন্তত ১২ বছরের জন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থগিত করবে এবং পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না।
বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর থেকে অবরোধ তুলে নেবে এবং আটকে থাকা কয়েকশ কোটি ডলারের সম্পদ অবমুক্ত করবে।
চুক্তির ৩০ দিনের মধ্যে দুপক্ষই হরমুজ প্রণালির অবরোধ তুলে নেবে।
তবে এই প্রস্তাবের অনেক শর্ত নিয়েই ধোঁয়াশা রয়েছে। ইরানের প্রস্তাবিত আগের ১৪ দফার সঙ্গে এর কতটা অমিল, তা পরিষ্কার নয়।
ইরানের এক আইনপ্রণেতা এই মার্কিন প্রস্তাবকে ‘বাস্তবতার বদলে আমেরিকার ইচ্ছার তালিকা’ বলে বর্ণনা করেছেন।
অন্যদিকে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় একটি শান্তি চুক্তির খবরকে স্বাগত জানালেও এখনই কোনো বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করতে চায় না ইসলামাবাদ।
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্র ‘মুক্তির প্রকল্প’ (প্রজেক্ট ফ্রিডম) নামে যে সামরিক অভিযান ঘোষণা করেছিল, মাত্র দুদিনের মাথায় তা স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছেন ট্রাম্প।
এনবিসি নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছিল সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত।
সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটি ও আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি দিতে অস্বীকৃতি জানায়।
আগাম আলোচনা ছাড়াই এ ধরনের একতরফা সিদ্ধান্তে উপসাগরীয় মিত্ররা বেশ বিরক্ত হয়েছিল।
এর ফলেই বাধ্য হয়ে ট্রাম্প এই অভিযান স্থগিত করেছেন বলে জানা গেছে।
আল জাজিরার বিশ্লেষক আলী আকবর দারেইনি মনে করেন, ট্রাম্প হরমুজ প্রণালি খুলতে সামরিকভাবে ব্যর্থ হয়ে এখন একটি চুক্তির মাধ্যমে ‘মুখ লুকানোর’ চেষ্টা করছেন।
তার মতে, ইসরায়েল ও ইহুদি লবি ট্রাম্পকে ভুল বুঝিয়েছিল যে, আক্রমণ করলে ইরান আত্মসমর্পণ করবে; কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। বরং ইরান প্রণালির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ আরও মজবুত করেছে।
এদিকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান দেশটির সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির সঙ্গে প্রায় আড়াই ঘণ্টার এক দীর্ঘ সাক্ষাৎ করেছেন।
গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় তার পিতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যুর পর থেকে মোজতবাকে প্রকাশ্যে দেখা যায়নি।
পেজেশকিয়ান এই আলোচনাকে ‘গভীর আন্তরিক ও আত্মবিশ্বাসের’ বলে উল্লেখ করেছেন।
শান্তি আলোচনার খবরের প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে। তেলের দাম কিছুটা কমেছে।
তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, শান্তি চুক্তি নিয়ে প্রাথমিক উচ্ছ্বাস থাকলেও চূড়ান্ত সমাধানের পথ এখনও বেশ দীর্ঘ।