প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ০৭ মে ২০২৬ ১০:৫৮ এএম
আপডেট : ০৭ মে ২০২৬ ১১:৩৭ এএম
কলকাতার টালিগঞ্জে তৃণমূল কংগ্রেসের কার্যালয়ে ভাঙচুর চালানোর পর ব্যানার-পোস্টার ছিঁড়ে ফেলছেন বিজেপির সমর্থকরা। ছবি: ইন্ডিয়া টুডে
ভাঙচুর, আগুন, খুন। ভোটের পর সহিংসতায় রাজ্য রক্তস্নাত। বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির বাজিমাতের দুই দিনের মধ্যেই ঝরে গেল চার প্রাণ। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি। এমনকি সন্দেশখালিতে পুলিশ সদস্যও গুলিবিদ্ধ। যেন আতঙ্কের এক ভয়াল জনপদ পশ্চিমবঙ্গ। নির্বাচন কমিশন হিংসা দমনে কঠোর হওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেসকে ধরাশায়ী করে নির্বাচনে বাজিমাত করা বিজেপিও পরিস্থিতি শান্ত রাখতে নেতাকর্মীদের কঠোর নির্দেশনা দিয়েছে। খবর দ্য হিন্দু, ইন্ডিয়া টুডে ও ইকোনমিক টাইমসের।
আরও পড়ুন: পশ্চিমবঙ্গে উত্তেজনা চরমে, গুলিতে নিহত শুভেন্দুর ঘনিষ্ঠ সহযোগী |
পশ্চিমবঙ্গ বিধাসভার নির্বাচনে ২৩ ও ২৯ এপ্রিল দুই দফায় ভোট হয়। ফল প্রকাশ হয় ৪ মে। একটি আসনে পরে পুনরায় ভোট হবে। অপর ২৯৩ আসনের মধ্যে সরকার গঠনে দরকার ছিল ১৪৭টি। ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) একাই ২০৭টি আসন পায়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীণ টানা তিনবারের ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেস মাত্র ৮০টি আসন পেয়েছে। স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী মমতা তার ভবানীপুর আসনটি হেরে গেছেন শুভেন্দুর কাছে, যার কাছে তিনি একুশের নির্বাচনে নন্দীগ্রাম আসন হারিয়েছিলেন।
তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ দেখা গেল ফল প্রকাশে পালাবাদলের চিত্র স্পষ্ট হতেই। হাওড়া ও নিউটাউনে দুই বিজেপি কর্মী খুন হয়েছেন। অন্যদিকে বীরভূমের নানুরে ও কলকাতার বেলেঘাটায় তৃণমূল কংগ্রেসের দুই কর্মী নিহত হয়েছেন।
পশ্চিমবঙ্গের নাট্যকার উদয়শঙ্কর মুখোপাধ্যায় গতকাল হোয়াটসঅ্যাপে দেওয়া সাক্ষাৎকারে প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘১৫ বছর অপশাসন চালিয়েছে তৃণমূল সরকার। পুরোপুরি ব্যর্থ এই সরকার একটা অরাজক পরিবেশ তৈরি করেছিল। যে সরকারের পতন হয়েছে, সেই তৃণমূল সরকারের প্রতি সাধারণ মানুষের অসামান্য ক্ষোভ, অসামান্য ঘৃণা তো ছিলই, পাশাপাশি সুযোগসন্ধানী মানুষ ও নেতারা হিংসায় প্ররোচনা দেয়, সক্রিয় অংশ নেয়।’
ইন্ডিয়া টুডের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হাওড়ার উদয়নারায়ণপুরে বিজয়োল্লাস করে ফেরার পথে লোহার রড দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে বিজেপি কর্মী যাদব বারকে। নিউটাউনে আনন্দ মিছিল চলাকালে বচসার জেরে তৃণমূল কর্মীদের পিটুনিতে প্রাণ হারিয়েছেন আরেক বিজেপি কর্মী মধু মণ্ডল। অন্যদিকে বীরভূমের নানুরে দুই দলের সংঘর্ষে খুন হয়েছেন তৃণমূলের অঞ্চল কমিটির সদস্য আবির শেখ। কলকাতার বেলেঘাটায় বিশ্বজিৎ পট্টনায়ক নামের এক তৃণমূল কর্মীর মরদেহ উদ্ধার হয়েছে; তার পরিবারের অভিযোগ, তাকে পিটিয়ে মারা হয়েছে।
দ্য হিন্দুর খবরে বলা হয়েছে, তৃণমূলের কার্যালয়ে আগুন ও সদর দপ্তরে হামলা পরাজয়ের ধাক্কার পাশাপাশি তৃণমূল কংগ্রেসকে এখন রাজ্যজুড়ে ব্যাপক ভাঙচুর ও হামলার শিকার হতে হচ্ছে। খোদ কলকাতার প্রাণকেন্দ্রে তৃণমূলের সদর দপ্তরে রাতের আঁধারে হামলা চালিয়েছে দুর্বৃত্তরা। সেখানে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিশাল সব পোস্টার ও ব্যানার ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে। পানিহাটিতে আর জি করের নিহত চিকিৎসকের মা রত্না দেবনাথ তৃণমূল প্রার্থীকে বিপুল ভোটে হারানোর পর, সেখানেও একটি তৃণমূল অফিস ভাঙচুর করে রাতারাতি দখল নিয়েছে উত্তেজিত জনতা।
ইকোনমিক টাইমসের খবরে বলা হয়েছে, পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত যে, উত্তর ২৪ পরগনার সন্দেশখালিতে গভীর রাতে টহল দেওয়ার সময় দুষ্কৃতদের গুলিতে আহত হয়েছেন ন্যাজাট থানার ওসি ভরত পুরকাইতসহ তিন পুলিশ কর্মকর্তা ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর দুই জওয়ান।
নাট্যকার উদয়শঙ্কর মুখোপাধ্যায় এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘ভোট-পরবর্তী হিংসা পশ্চিমবঙ্গে চিরাচরিত প্রথা ও ব্যাধি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখান থেকে বেরিয়ে আসা দরকার। আমরা দেখছি, বিজেপির নেতারা ঘোষণা করেছেন, রাজনৈতিক হিংসা বন্ধ হোক; বন্ধ না হলে তারা ব্যবস্থা নেবেন। এটা একটা সদার্থক দিক।’
ইন্ডিয়া টুডের খবরে বলা হয়, পরিস্থিতি ক্রমশ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে দেখে কড়া পদক্ষেপ নিয়েছে ভারতের নির্বাচন কমিশনও। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার ‘শূন্য সহনশীলতা’ নীতির নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, সহিংসতা, ভাঙচুর বা উস্কানিমূলক কাজে জড়িতদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার করতে হবে।
বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারীও গতকাল বলেছেন, ‘ভোট-পরবর্তী হিংসার একটি ঘটনাও বরদাস্ত করা হবে না। বিজেপি ধর্ম-সম্প্রদায়ের ঊর্ধ্বে উঠে গুন্ডাদমন করবে।’
মমতার ক্ষমতার অবসান এবং অগণতান্ত্রিক দম্ভ
আজ তৃণমূল সরকারের মেয়াদ শেষ হচ্ছে। কিন্তু হেরেও ভোট লুটের অভিযোগ তুলে মঙ্গলবার মমতা বলেছেন, তিনি পদত্যাগ করবেন না। এ বিষয়ে উদয়শঙ্কর বলেন, ‘আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও [২০২০ সালের নির্বাচনে] যখন হেরে গিয়েছিলেন, তিনি চেয়ার ছাড়তে চাইছিলেন না। ঠিক অনুরূপভাবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও একই প্রক্রিয়ায় পদত্যাগ করতে চাইছেন না। হেরে যাওয়ার পরও পদ আঁকড়ে বসে থাকাটা নির্বুদ্ধিতা, ফ্যাসিবাদী ও স্বৈরাচারীর নিদর্শন। অসম্ভব দাম্ভিকতাও বটে।’ তিনি মনে করিয়ে দেন, ‘[২০১১ সালে] যখন বামফ্রন্ট সরকারের পতন হয়, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। তিনি পদত্যাগপত্র রাজ্যপালকে জমা দিয়ে বাড়ি চলে গিয়েছিলেন, মাথা নিচু করে। তাই তার মাথা এখনও আমাদের সামনে উঁচু হয়ে আছে।’
শুভেন্দু অধিকারী গতকাল রাজ্য নির্বাচন কমিশনের দপ্তর থেকে বেরিয়ে বলেছেন, তিনবারের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ‘রাজ্য রাজনীতিতে বর্তমানে অপ্রাসঙ্গিক।’
শুভেন্দুই কি মুখ্যমন্ত্রী
২০২১ সালেই পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার গঠন করতে চেয়েছিল। পারেনি। কিন্তু তখন থেকে প্রতিমুহূর্তে দলের নেতাকর্মীদের চাঙ্গা রাখা, দলকে শক্তিশালী করে তোলাÑ গত পাঁচ বছরে শুভেন্দু অধিকারী বেশ ভালোভাবেই দায়িত্ব সামলেছেন। বিজেপি ও বাম নেতাদের অভিযোগ, গত ১৫ বছরে তৃণমূল সরকার শিক্ষা, চাকরি ও ব্যবসার বাজার নষ্ট করেছে; শিল্পকে ধ্বংস করেছে। বর্ধমান প্রয়াস নাট্য সংস্থার নির্দেশক উদয়শঙ্কর মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই করার যে স্পৃহা, যে আত্মত্যাগ আমরা তার ভেতর দেখেছি; লড়াই করে টিকে থাকার যে ক্ষমতা, মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শুভেন্দু অধিকারীই সবচেয়ে বড় দাবিদার।’ তবে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ কলকাতায় গিয়ে চূড়ান্ত নেতা নির্বাচন করার কথা।
এখন দেখার বিষয়, বিজেপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার পশ্চিমবঙ্গে তরুণদের চাকরির ব্যবস্থা করতে পারে কি না, রাজ্যে শিল্পকে ফিরিয়ে আনতে পারে কি না। কলুষমুক্ত শিক্ষার পরিবেশ ও শিক্ষার্থী সংসদ নির্বাচন করা, সবার জন্য সমান সুযোগ, নারীদের সুরক্ষা এবং সার্বিকভাবে মানুষের নিরাপত্তা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অন্যান্য প্রত্যাশিত পরিষেবাগুলো নিশ্চিত করাই নতুন সরকারের কাছে জনতার দাবি। কিন্তু নতুন সরকারের আমলে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও সহিংসতার কথা অনেকেই আশঙ্কা করছেন। উদয়শঙ্কর মুখোপাধ্যায় বলেন, রাজনৈতিক হানাহানিটা পশ্চিমবঙ্গে বন্ধ হওয়া ভীষণ দরকার। আমরা সৌহার্দ্য চাই, সৌভাতৃত্ব চাই। মানুষের সাথে মানুষের সুসম্পর্ক চাই। আমরা সেই আশাতেই বুক বাঁধব, পশ্চিমবঙ্গবাসী।’