প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ০৭ মে ২০২৬ ০৯:১৩ এএম
আপডেট : ০৭ মে ২০২৬ ০৯:১৫ এএম
সমঝোতা স্মারকের অনেক শর্তই চূড়ান্ত চুক্তির ওপর নির্ভর করছে। ফলে আবারও যুদ্ধ শুরু বা দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তা তৈরির আশঙ্কাও থেকে যাচ্ছে। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
যুদ্ধ বন্ধ ও বিস্তারিত পরমাণু আলোচনার রূপরেখা সংক্রান্ত একটি এক পৃষ্ঠার সমঝোতা স্মারকের মাধ্যমে ইরানের সঙ্গে চুক্তির কাছাকাছি পৌঁছে গেছে যুক্তরাষ্ট্র।
হোয়াইট হাউসের দুই কর্মকর্তা ও বিষয়টি সম্বন্ধে অবগত আরও দুটি সূত্রের বরাত দিয়ে অ্যাক্সিওস বুধবার এ খবর দিয়েছে বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
গুরুত্বপূর্ণ কিছু শর্তের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের কাছ থেকে আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে প্রতিক্রিয়া পাওয়ারও আশা করছে বলে জানিয়েছে অ্যাক্সিওস।
দুই পক্ষ এখনও এ স্মারকের ব্যাপারে একমত হয়নি। তবে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ওয়াশিংটন ও তেহরান চুক্তির এতটা কাছাকাছিও আর কখনও আসেনি বলে দাবি করেছে অ্যাক্সিওস।
উভয়পক্ষ রাজি হলে ওই সমঝোতা স্মারকের মাধ্যমেই পশ্চিম এশিয়ায় চলা যুদ্ধের ইতি ঘোষিত হবে। দ্বিতীয় দফা আলোচনা ইসলামাবাদ অথবা জেনেভায় হতে পারে। সর্বশেষ খবরে বলা হয়েছে, সমঝোতার অংশ হিসেবে ইরান তার সমৃদ্ধ করা ইউরেনিয়ামের মজুদ ত্যাগ করবে। তার বিনিময়ে ইরানের জব্দ করা দুই হাজার কোটি ডলার ফেরত দেবে যুক্তরাষ্ট্র। এমন চুক্তিই হচ্ছে বলে যুক্তরাষ্ট্রের দুই কর্মকর্তা ও আলোচনার বিষয়ে অবগত আরও দুটি সূত্র জানিয়েছে।
যেসব শর্ত রয়েছে সমঝোতায়
সমঝোতার খসড়া অনুযায়ী, ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থগিত রাখার প্রতিশ্রুতি দেবে। বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করবে এবং আটকে থাকা কয়েকশ কোটি ডলার অর্থ ছাড় দেবে। এ ছাড়া উভয় পক্ষই হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের ওপর থাকা সব বিধিনিষেধ তুলে নেবে।
সমঝোতা অনুযায়ী এই অঞ্চলে যুদ্ধের অবসান ঘোষণা করা হবে। এরপর শুরু হবে ৩০ দিনের নিবিড় আলোচনা। এ সময়ে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করা এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়ে একটি চূড়ান্ত ও বিস্তারিত চুক্তিতে পৌঁছানোর চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া হবে। দুটি সূত্রের দেওয়া তথ্য বলছে, এই আলোচনা ইসলামাবাদ অথবা জেনেভায় হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তা জানান, ওই ৩০ দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালিতে ইরানের দেওয়া বিধিনিষেধ এবং যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ পর্যায়ক্রমে তুলে নেওয়া হবে। তবে আলোচনা ব্যর্থ হলে যুক্তরাষ্ট্র আবার অবরোধ আরোপ করতে পারবে, অথবা সামরিক পদক্ষেপ নিতে পারবে।
ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থগিত রাখার মেয়াদ নিয়ে এখন মূল দরকষাকষি চলছে। তিনটি সূত্র বলছে, এই মেয়াদ হবে অন্তত ১২ বছর। তবে একটি সূত্র জানায়, এটি ১৫ বছর হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। ইরান ৫ বছরের প্রস্তাব দিলেও যুক্তরাষ্ট্র ২০ বছরের দাবিতে অটল ছিল।
সূত্রটি জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র চুক্তিতে এমন একটি শর্ত যুক্ত করতে চায়, যাতে ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের নিয়ম ভাঙলে স্থগিতাদেশের মেয়াদ আরও বেড়ে যাবে। আর এই মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ইরান ৩ দশমিক ৬৭ শতাংশ পর্যন্ত নিম্ন মাত্রার ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করতে পারবে। ১৪ দফাবিশিষ্ট ওই সমঝোতা স্মারক নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দূত স্টিভ উইটকফ ও জারেড কুশনারের সঙ্গে একাধিক ইরানি কর্মকর্তার প্রত্যক্ষ ও মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে পরোক্ষ আলোচনা চলছে বলেও প্রতিবেদনে বলেছে তারা।
প্রোজেক্ট ফ্রিডম স্থগিত
কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে প্রোজেক্ট ফ্রিডম অভিযান শুরু করার মাত্র এক দিন পরেই প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তা স্থগিত করেছেন। গত মঙ্গলবার ট্রুথ সোশ্যালে এক পোস্টে ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইরানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনায় একটি ‘পূর্ণাঙ্গ ও চূড়ান্ত চুক্তির দিকে বিরাট অগ্রগতি’ হওয়ায় মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তান ও অন্যান্য দেশের ‘অনুরোধের ভিত্তিতে’ হরমুজ অভিযান স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি।
ট্রাম্পের এ ভাষ্যের বিষয়ে ইরানের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া আসেনি। ইরানের সঙ্গে আলোচনায় কী অগ্রগতি হয়েছে, সে বিষয়ে রয়টার্সের মন্তব্যের অনুরোধে হোয়াইট হাউসও তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া দেয়নি। তবে ট্রাম্পের পোস্টের পর ব্রেন্টের অপরিশোধিত তেলের ব্যারেলপ্রতি দাম এক দশমিক দুই শতাংশ কমে ১০৮ ডলার ৬০ সেন্টে দাঁড়িয়েছে।
চুক্তি না হলে ‘আরও তীব্র’ বোমা হামলা
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, চুক্তি হলে ইরান যুদ্ধের ও যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধের অবসান হতে পারে। তবে ইরান রাজি না হলে বোমা হামলা আরও তীব্র হতে পারে।
তার মালিকানাধীন সোশাল প্লাটফর্ম ট্রুথ সোশ্যালে বুধবার তিনি বলেন, “যা নিয়ে সমঝোতা হয়েছে, ইরান যদি তা দেয় তাহলে অপারেশন এপিক ফিউরি শেষ হয়ে যাবে।”
তবে ট্রাম্প নিজেই নিশ্চিত নন যে ইরান আসলে সেই শর্তগুলো মেনে নেবে কি না। তিনি আরও বলেন, শর্ত মেনে নিলে হরমুজ প্রণালীতে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর যে মার্কিন অবরোধ চলছে, সেটি তখন তুলে নেওয়া হবে এবং ইরানসহ সবার জন্য হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত থাকবে।
চীনকে তিন লক্ষ্যের কথা জানাল ইরান
চীন সফরে থাকা ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বেইজিংয়ের কাছে তিনটি লক্ষ্য জানিয়েছে। এসব নিয়ে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে তিনি ইতিবাচক বৈঠকও করেছেন। গতকাল বুধবার আল জাজিরা জানিয়েছে, ইরানের বিষয়গুলোয় চীন সম্মত হয়েছে। বেইজিং আশ্বস্ত করেছে ভবিষ্যতেও তারা তেহরানের পক্ষে থাকবে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, তারা এমন একটি শান্তিপূর্ণ ও স্থায়ী সমাধান চায়, যা তাদের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি ন্যায্য ও বিস্তৃত চুক্তির পথ খুলবে। দ্বিতীয় লক্ষ্য ছিল বেইজিং ও তেহরানের মধ্যে অংশীদারত্বের দৃঢ়তা পুনর্ব্যক্ত করা। বেইজিং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এমন কোনো আপস করবে না, যা ইরানের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। তৃতীয় লক্ষ্য হলো, উভয় পক্ষই একমত হয়েছে, পারস্য উপসাগর ও মধ্যপ্রাচ্যে একটি নতুন শান্তি ও নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলা উচিত, যা চীনের সহায়তায় বাস্তবায়িত হতে পারে। বৈঠকে ইরান জানিয়েছে, আলোচনার মধ্য দিয়ে ‘একটি ন্যায্য ও পূর্ণাঙ্গ চুক্তি’শুধু গ্রহণযোগ্য হতে পারে।
অনিশ্চয়তার শঙ্কাও রয়েছে
সমঝোতা স্মারকের অনেক শর্তই চূড়ান্ত চুক্তির ওপর নির্ভর করছে। ফলে আবারও যুদ্ধ শুরু বা দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তা তৈরির আশঙ্কাও থেকে যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে সম্মুখযুদ্ধ থামলেও শেষ পর্যন্ত কোনো স্থায়ী সমাধান না-ও হতে পারে।
হোয়াইট হাউস মনে করছে, ইরানের বর্তমান নেতৃত্ব কয়েক ভাগে বিভক্ত। তাই দেশটির বিভিন্ন রাজনৈতিক পক্ষের মধ্যে ঐকমত্য তৈরি করা কঠিন হতে পারে। এমনকি প্রাথমিকভাবে কোনো চুক্তিতে পৌঁছানো যাবে কি না, তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু কর্মকর্তা সংশয় প্রকাশ করেছেন।