বিশ্লেষকদের মত
যুদ্ধবিরতি থাকলেও নিয়ম মানছে না ইসরায়েল। লেবাননের বিভিন্ন স্থানে বিরতিহীন হামলা চালাচ্ছে আগ্রাসী বাহিনী। সোমবার লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে বোমা বিস্ফোরণের পর বড় ধোঁয়ার কুণ্ডলী। ছবি: এএফপি
গাজা উপত্যকায় চলমান অস্থিরতার মধ্যে আবারও বড় ধরনের সামরিক অভিযানের হুমকি দিয়েছে ইসরায়েল। দীর্ঘদিন ধরে কার্যকর থাকা তথাকথিত যুদ্ধবিরতির মাঝেও সেখানে সহিংসতা থামেনি। বরং প্রতিদিনই বিভিন্ন এলাকায় বিস্ফোরণ ও ড্রোনের শব্দে আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে সাধারণ মানুষ।
আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দক্ষিণ গাজার খান ইউনিস ও দেইর আল-বালাহসহ বিভিন্ন এলাকায় এখনও ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে মরদেহ উদ্ধার চলছে। স্থানীয় চিকিৎসা সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরও এ পর্যন্ত অন্তত ৮২৮ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে গাজার বাসিন্দাদের মধ্যে নতুন করে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরুর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। কারণ, ইসরায়েলি নেতৃত্ব ইঙ্গিত দিচ্ছেÑ এই ভঙ্গুর সমঝোতা বাতিল করে হামাসকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করতে আবারও বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করা হতে পারে।
রবিবার জেরুজালেমে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নির্ধারিত নিরাপত্তা বৈঠক হঠাৎ বাতিল করে সীমিত পরিসরে আলোচনা করেন। একই সময়ে দেশটির সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকেও নতুন করে যুদ্ধ শুরু করার পক্ষে চাপ বাড়ছে বলে জানা গেছে।
সামরিক সূত্রের বরাতে বলা হয়েছে, হামাস অস্ত্র সমর্পণে রাজি না হওয়া এবং যুদ্ধবিরতি তদারকির দায়িত্বে থাকা আন্তর্জাতিক বাহিনীর ব্যর্থতার কারণে সংঘাত পুনরায় শুরু হওয়া ‘প্রায় অনিবার্য’ হয়ে উঠেছে।
এদিকে ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী ধীরে ধীরে গাজায় নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বিস্তার করছে। যুদ্ধবিরতির আওতায় নির্ধারিত সীমারেখা পশ্চিম দিকে সরিয়ে নিয়ে গিয়ে তারা ইতোমধ্যে প্রায় ৫৯ শতাংশ এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। প্রতিদিনই যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের মাধ্যমে এই দখল আরও সুসংহত করা হচ্ছে।
এ ছাড়া লেবানন সীমান্ত থেকে অতিরিক্ত সেনা সরিয়ে গাজা ও দখলকৃত পশ্চিম তীরে মোতায়েন করা হয়েছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
অন্যদিকে মিসরের রাজধানী কায়রোতে মধ্যস্থতাকারীরা নতুন একটি প্রস্তাব সামনে এনেছেন, যাতে ফিলিস্তিনি গোষ্ঠীগুলোর ওপর নিরস্ত্রীকরণের জন্য চাপ বাড়ানো হয়েছে। এই প্রস্তাবে ধাপে ধাপে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে হামাসকে সম্পূর্ণভাবে অস্ত্র ত্যাগ করতে বলা হয়েছে।
তবে হামাসসহ অন্যান্য ফিলিস্তিনি সংগঠন এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের দাবি, যুদ্ধবিরতির প্রথম ধাপ পূর্ণ বাস্তবায়ন করতে হবে, যার আওতায় প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ ত্রাণ গাজায় প্রবেশের কথা থাকলেও তা বাস্তবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
গাজার বিশ্লেষকদের মতে, নিরস্ত্রীকরণের এই চাপ আসলে রাজনৈতিক সমাধান চাপিয়ে দেওয়ার একটি কৌশল। তাদের ভাষায়, স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সুস্পষ্ট নিশ্চয়তা ছাড়া কোনো ধরনের নিরস্ত্রীকরণ বাস্তবসম্মত নয়।
তারা আরও মনে করেন, মানবিক সহায়তাকে শর্তের সঙ্গে যুক্ত করে চাপ প্রয়োগের চেষ্টা করা হচ্ছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, গাজায় নতুন করে সামরিক তৎপরতা বাড়ানোর পেছনে ইসরায়েলের বৃহত্তর কৌশলগত হিসাবও থাকতে পারে। তাদের ধারণা, অন্যান্য অঞ্চলে সামরিক ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের চাপ সামাল দিতে গাজা ইস্যুকে সামনে আনা হচ্ছে।
একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলে মনে করা হচ্ছে। সামনে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নেতৃত্ব নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করছে বলেও বিশ্লেষকদের মত।
তবে সামরিক বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, একাধিক ফ্রন্টে দীর্ঘদিন ধরে সংঘাতে জড়িয়ে থাকার কারণে ইসরায়েলি বাহিনী ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। এই অবস্থায় গাজায় নতুন করে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরু হলে তা কৌশলগতভাবে বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
সব মিলিয়ে, যুদ্ধবিরতির আড়ালে চলমান সংঘাত ও পারস্পরিক অবিশ্বাসের কারণে গাজা পরিস্থিতি আবারও বড় ধরনের অস্থিরতার দিকে এগোচ্ছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।