আল জাজিরা এক্সপ্লেইনার
প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ০১ মে ২০২৬ ১৮:০৪ পিএম
আপডেট : ০১ মে ২০২৬ ২১:৩৭ পিএম
সীমান্তে বিএসএফের নজরদারি। ছবি: আনন্দবাজার
ভারত সরকার বাংলাদেশ সীমান্তে অবৈধ অভিবাসন এবং চোরাচালান রোধে এক বিতর্কিত ও নজিরবিহীন পরিকল্পনা নিয়েছে। যেসব নদীমাতৃক এলাকায় কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া কঠিন, সেখানে প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধক হিসেবে কুমির এবং বিষধর সাপের মতো শিকারি প্রাণী ছেড়ে দেওয়ার প্রস্তাব করেছেন দেশটির কর্মকর্তারা।
ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্তের কিছু অংশ অত্যন্ত দুর্গম। পাহাড়, নদী ও জলাভূমি বেষ্টিত এসব জায়গায় স্থায়ী বেড়া নির্মাণ করা নয়াদিল্লির জন্য কার্যত অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গত ২৬শে মার্চ ভারতের সীমান্ত সুরক্ষা বাহিনীর (বিএসএফ) একটি অভ্যন্তরীণ চিঠিতে এই নতুন পরিকল্পনার কথা জানানো হয়। বিএসএফ সদর দপ্তর থেকে পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব ফ্রন্টের কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যেন তারা ‘নদীপথের ফাঁকফোকরগুলোতে সরীসৃপ মোতায়েনের সম্ভাব্যতা’ যাচাই করেন।
ভারতের এই পদক্ষেপ মানবাধিকার কর্মী এবং বন্যপ্রাণী সংরক্ষণবাদী উভয়ের মধ্যেই তীব্র উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। প্রশ্ন উঠছে—সীমান্তের দুই পাশের সাধারণ মানুষ এবং এই অঞ্চলের বাস্তুতন্ত্রের ওপর এর প্রভাব কী হবে?
যে কারণে বিএসএফ এই বিপজ্জনক বন্যপ্রাণী মোতায়েন করতে চায়
ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, আসাম, মেঘালয় এবং মিজোরাম রাজ্যের ওপর দিয়ে প্রবাহিত। এর বড় একটি অংশ জলাভূমি ও নদীপথ, যেখানে দুই পাশেই ঘন জনবসতি রয়েছে।
নয়াদিল্লি ইতিমধ্যে প্রায় ৩,০০০ কিলোমিটার সীমান্তে বেড়া দিলেও বাকি অংশে ভৌগোলিক কারণে তা সম্ভব হয়নি। নর্থইস্ট নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিএসএফ কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যেন তারা এই জলপথগুলোতে সরীসৃপ ব্যবহারের বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেন এবং গৃহীত কার্যক্রমের রিপোর্ট জমা দেন।
ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের গত বছরের এক প্রতিবেদনে স্বীকার করা হয়েছে যে, নদী এলাকা, সীমান্তের কাছাকাছি জনবসতি এবং ভূমি অধিগ্রহণ সংক্রান্ত জটিলতার কারণে কিছু জায়গায় বেড়া দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। বিএসএফ মনে করছে, এসব জায়গায় কুমির বা সাপ মোতায়েন করলে মানুষ ভয় পাবে এবং সীমান্ত পারাপার কমবে।
তবে গবেষক অংশুমান চৌধুরী এই পরিকল্পনাকে ভয়ংকর হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, ‘এটি হাস্যকর মনে হলেও আসলে অত্যন্ত বিপজ্জনক। কোনো কুমির বা সাপ কি চিনতে পারবে কে বাংলাদেশি আর কে ভারতীয়? এটি অভিবাসীদের প্রতি চরম অমানবিকতা এবং প্রকৃতিকে মানুষের বিরুদ্ধে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের একটি নতুন রূপ’।
এ পরিকল্পনার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন হিন্দুত্ববাদী সরকার দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে যে, অবৈধ অভিবাসীরা ভারতের জনতাত্ত্বিক পরিবর্তন ঘটাচ্ছে এবং জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি। মানবাধিকার কর্মীদের মতে, এই অজুহাতে বিশেষ করে পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব ভারতের বাঙালি মুসলমানদের হয়রানি করা হচ্ছে।
মানবাধিকার কর্মী হর্ষ মন্দার আল জাজিরাকে বলেন, ‘ভারত সরকার আইনি প্রক্রিয়া বা দ্বিপাক্ষিক আলোচনার বদলে এমন সব বিচারবহির্ভূত পদ্ধতি বেছে নিচ্ছে যা আন্তর্জাতিক নীতি ও মানবিকতার পরিপন্থী। এটি আসলে বাঙালি মুসলমানদের মনে সর্বদা এই ভয় জাগিয়ে রাখার চেষ্টা যে, যে কোনো সময় তাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া হতে পারে’।
অংশুমান চৌধুরীর মতে, আসামে এনআরসি এবং বিদেশি ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে হাজার হাজার মানুষকে রাষ্ট্রহীন করার যে প্রক্রিয়া চলছে, সীমান্তে কুমির ও সাপ মোতায়েনের চিন্তা সেই একই বৈষম্যমূলক নীতিরই বর্ধিত রূপ।
বাস্তুতন্ত্র ও পরিবেশের ওপর প্রভাব
ওয়াইল্ডলাইফ ট্রাস্ট অফ ইন্ডিয়ার স্ট্র্যাটেজি প্রধান রথীন বর্মন বলেন, বাংলাদেশ সীমান্তের নদীগুলোতে কুমির প্রাকৃতিকভাবে পাওয়া যায় না। সুন্দরবন বা আসামের সংরক্ষিত এলাকায় কুমির থাকলেও এই সীমান্ত অঞ্চলে তারা বেঁচে থাকতে পারবে না।
তিনি সতর্ক করে বলেন, “কোনো প্রাণীকে জোর করে নতুন পরিবেশে নিয়ে এলে পুরো বাস্তুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এছাড়া এই এলাকাগুলো বন্যাপ্রবণ। বন্যার সময় এই বিষধর সাপ বা কুমিরগুলো লোকালয়ে ঢুকে পড়বে, যা সীমান্ত সংলগ্ন গ্রামবাসী ও জেলেদের জীবনের জন্য চরম ঝুঁকি হয়ে দাঁড়াবে’।
বিশ্বের আর কোথাও কি এমন নজির আছে?
আধুনিক ইতিহাসে আন্তর্জাতিক সীমান্তে শিকারি প্রাণী মোতায়েন করার কোনো সফল নজির নেই। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে মেক্সিকো সীমান্তে সাপ ও কুমির ভর্তি পরিখা নির্মাণের প্রস্তাব দিয়েছিলেন বলে গুঞ্জন উঠেছিল, যদিও তিনি পরে তা অস্বীকার করেন।
তবে প্রতিবেদনে একটি তুলনামূলক উদাহরণ দেওয়া হয়েছে। ২০২৫ সালের জুলাই মাসে ফ্লোরিডায় ‘অ্যালিগেটর আলকাট্রাজ’ নামে পরিচিত একটি ডিটেনশন সেন্টার নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। সেখানকার দুর্গম জলাভূমি ও শিকারি প্রাণীর উপস্থিতিকে পালানোর পথ বন্ধ করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে, যা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মতে অত্যন্ত অমানবিক।