মিয়ানমার
প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ০১ মে ২০২৬ ১৫:২৪ পিএম
আপডেট : ০১ মে ২০২৬ ২০:০০ পিএম
রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন বন্দিদশায় থাকা নোবেল বিজয়ী মিয়ানমারের অং সান সু চির একটি ছবি সম্প্রচার করেছে। ছবি: বিবিসি
মিয়ানমারের কারাবন্দি সাবেক নেত্রী অং সান সু চি-কে কারাগার থেকে সরিয়ে গৃহবন্দি করা হয়েছে বলে দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। ৮০ বছর বয়সী এই নোবেল বিজয়ী ২০২১ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে বন্দি ছিলেন। ধারণা করা হয়, তাকে রাজধানী নেপিদোর একটি সামরিক কারাগারে রাখা হয়েছিল।
অভ্যুত্থানের নেতৃত্বদানকারী সামরিক প্রধান মিন অং হ্লাইং এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, তিনি সু চির অবশিষ্ট সাজা নির্ধারিত বাসভবনে কাটানোর নির্দেশ দিয়ে সাজা কমিয়ে দিয়েছেন।
অং সান সু চি ২০১৫ সালে মিয়ানমারে গণতান্ত্রিক সংস্কারের পর ক্ষমতায় এসেছিলেন। এর আগে কয়েক দশকের সামরিক শাসনামলে তিনি গণতন্ত্রপন্থী কর্মী হিসেবে ১৫ বছরেরও বেশি সময় গৃহবন্দী ছিলেন।
দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ইউনিফর্ম পরা দুজন নিরাপত্তা কর্মীর সঙ্গে সু চির বসে থাকার একটি ছবি প্রকাশ করেছে। তবে তার ছেলে কিম আরিস এই ঘোষণার বিষয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান, তার মা আদৌ বেঁচে আছেন কি না, সেটির কোনো প্রমাণও তার কাছে নেই। কিম আরিসের মতে, প্রকাশিত ছবিটি অর্থহীন কারণ এটি ২০২২ সালে তোলা হয়েছিল।
বিবিসিকে তিনি বলেন, ‘আমি আশা করি খবরটি সত্যি। কিন্তু তাকে যে সত্যিই সরিয়ে নেওয়া হয়েছে, তার কোনো বাস্তব প্রমাণ আমি এখনও দেখিনি। যতক্ষণ না আমি তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছি অথবা কোনো স্বাধীন মাধ্যম তার অবস্থান নিশ্চিত করছে, ততক্ষণ আমি কিছুই বিশ্বাস করছি না’।
এই ঘোষণার আগে সু চির স্বাস্থ্য বা জীবনযাত্রার পরিস্থিতি সম্পর্কে কিছুই জানা সম্ভব হয়নি। তার আইনি দল রয়টার্সকে জানিয়েছে, সু চি-কে গৃহবন্দী করার বিষয়ে তাদের আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি।
পাঁচ বছর আগে সামরিক বাহিনী নির্বাচিত সরকারকে হটিয়ে ক্ষমতা দখলের পর থেকে সু চি-কে জনসমক্ষে খুব একটা দেখা যায়নি। গত তিন বছরে তার আইনজীবীরা এবং গত দুই বছর ধরে তার পরিবার তার সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করতে পারেনি। ২০২১ সালের মে মাসে বিচারের শুরুতে তাকে আদালতে শেষবারের মতো দেখা গিয়েছিল। তার বিরুদ্ধে আনা সামরিক বাহিনীর সব অভিযোগই বিশ্বজুড়ে বানোয়াট হিসেবে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে।
বর্তমানে তার ৩৩ বছরের কারাদণ্ড কয়েক দফায় কমানো হয়েছে। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে তার হঠাৎ উপস্থিতির এই খবর ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, সামরিক কর্তৃপক্ষ সম্ভবত তার অবস্থার আরও পরিবর্তনের প্রস্তুতি নিচ্ছে—হয়তো তাকে আংশিক বা সম্পূর্ণ মুক্তি দেওয়া হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, সেনাপ্রধান মিন অং হ্লাইং তার শাসনের আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা দূর করতে মরিয়া এবং সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক কিছু লড়াইয়ে জয়ের পর তিনি কিছুটা আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছেন। এছাড়া, চলতি বছরের শুরুতে জান্তা সরকার একটি নির্বাচন দিলেও তাতে মূলত সামরিক নেতারাই ক্ষমতায় রয়েছেন।
সু চির সাবেক অর্থনৈতিক উপদেষ্টা শন টার্নেল বিবিসিকে বলেন, ‘মিয়ানমারের সামরিক জান্তা বর্তমানে একটি বড় ধরনের জনসংযোগ অভিযানে নেমেছে। তারা বিশ্বকে বোঝাতে চায় যে তারা একটি বৈধ সরকার এবং সু চি-কে গৃহবন্দী করার খবরটি সেই প্রচেষ্টারই অংশ’।
টার্নেল নিজেও ২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পর সু চির সঙ্গে একই কারাগারে বন্দি ছিলেন। তিনি সেই কারাগারের পরিবেশকে মধ্যযুগীয় ও ভয়াবহ বলে বর্ণনা করেছেন। তার মতে, ৮০ বছর বয়সী সু চির জন্য ওই পরিবেশ অত্যন্ত অমানবিক ছিল।
দীর্ঘদিন লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকলেও মিয়ানমারের জনগণের কাছে সু চির জনপ্রিয়তা বিন্দুমাত্র কমেনি। টার্নেলের মতে, জনগণের সঙ্গে সু চির সম্পর্ক অনেকটা আধ্যাত্মিক এবং দেশের মানুষ এখনো তার চূড়ান্ত মুক্তির অপেক্ষায় রয়েছে।
তবে ২০১৭ সালে রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর সামরিক বাহিনীর নৃশংসতার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে সাফাই গাওয়ায় বিশ্বজুড়ে সু চির ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। তা সত্ত্বেও, মিয়ানমারের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের লড়াইয়ে তাকে এখনও প্রধান প্রতিকৃতি হিসেবে দেখা হয়।