ইরান সংকটে নতুন মোড়
প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ০১ মে ২০২৬ ১১:১৫ এএম
পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ নিরসনে ইরান সরকার যতক্ষণ পর্যন্ত চুক্তিতে রাজি না হবে, ততক্ষণ দেশটির ওপর নৌ-অবরোধ বহাল থাকবে বলে জানিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সংবাদ মাধ্যম অ্যাক্সিওসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এই কঠোর অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন।
ইরানকে আলোচনার টেবিলে বসতে বাধ্য করতে দেশটির বিভিন্ন স্থাপনায় একের পর এক, ‘সংক্ষিপ্ত ও শক্তিশালী হামলার’ পরিকল্পনা প্রস্তুত করা হয়েছে বলেও জানানো হয়েছে।
এদিকে যতক্ষণ তেহরানের ওপর হুমকি থাকবে, ততক্ষণ এই প্রণালিতে নৌ-চলাচলে বিধিনিষেধ থাকবে বলে আবারও পুনর্ব্যক্ত করেছে তেহরান। হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, ইরান-সংশ্লিষ্ট নৌযানগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ অব্যাহত থাকলে তেহরান ‘নজিরবিহীন সামরিক পদক্ষেপ’ নেবে। ওয়াশিংটন ও তেহরান যখন একে অপরকে পাল্টা হুমকি-ধমকি দিয়ে যাচ্ছে, এরই মাঝে মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তান তখন উত্তেজনা কমিয়ে আনার চেষ্টা করছে। কিন্তু কোনো কিছুই কাজে আসছে না। দুই পক্ষের এই সংঘাত থামাতে সব উদ্যোগই অচলাবস্থায় পতিত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র এখন ইরানের তেল রপ্তানি বন্ধ করে অর্থনৈতিকভাবে আরও চেপে ধরতে তাদের বন্দরগুলোকে নিশানা করে নৌ-অবরোধ আরোপ করেছে।
এর মাধ্যমে ট্রাম্প ইরানের দেওয়া প্রস্তাব সরাসরি নাকচ করে দিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার ভাষায়Ñ ইরান কোনো অবস্থাতেই পারমাণবিক অস্ত্র পেতে পারে না। তেহরান বলছে, তাদের পারমাণবিক আকাঙ্ক্ষা একেবারেই শান্তিপূর্ণ।
ইরানের প্রস্তাবে প্রথমে হরমুজ খুলে দেওয়া ও অবরোধ প্রত্যাহার এবং পারমাণবিক আলোচনা পরবর্তী সময়ের জন্য স্থগিত রাখার কথা বলা হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের হুমকির মুখে পরমাণু ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা রক্ষায় তাদের অনড় অবস্থানের কথা জানিয়েছে ইরান।
ইরানের পরমাণু এবং ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতাকে দেশের ‘জাতীয় সম্পদ’ হিসেবে অভিহিত করে তা যেকোনো মূল্যে রক্ষার ঘোষণা দিয়েছেন মোজতবা খামেনি। ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের এই সামরিক সক্ষমতাগুলো ধ্বংস করতে চানÑ এমন বার্তার প্রেক্ষিতেই তিনি এই হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
ইরানি সংবাদ সংস্থা ইরনার বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে, মোজতবা খামেনি বলেছেন, “ইরানিরা তাদের পরমাণু এবং ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতাকে জাতীয় সম্পদ হিসেবে দেখে। দেশের জল, স্থল ও আকাশসীমার মতো এগুলোকেও তারা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে পাহারা দেবে।” একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান অস্থিতিশীলতার জন্য সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতিকে দায়ী করেছেন খামেনি। তিনি বলেন, পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে আমেরিকানদের অবস্থানই এ অঞ্চলের নিরাপত্তাহীনতার প্রধান কারণ। তিনি আরও বলেন, “আমেরিকার পুতুল ঘাঁটিগুলোর নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মতো সামর্থ্য নেই। সুতরাং যারা মনে করেন আমেরিকা তাদের নিরাপত্তা দেবে, তাদের সেই আশা বৃথা।”
জাতীয় পারস্য উপসাগর দিবস উপলক্ষে দেওয়া এক বিবৃতিতে মোজতবা খামেনি বলেন, “আমেরিকানদের লজ্জাজনক ব্যর্থতার পর পারস্য উপসাগর এবং হরমুজ প্রণালিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে।” উল্লেখ্য, ১৬২২ সালে হরমুজ থেকে পর্তুগিজ বাহিনীকে বিতাড়িত করার স্মরণে এই দিবসটি পালন করা হয়। এদিকে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) ইরানের ওপর ‘স্বল্পমেয়াদি কিন্তু শক্তিশালী’ এক দফার বিমান হামলার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করে রেখেছে বলে এই বিষয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তিনটি সূত্র জানিয়েছে। আলোচনার বর্তমান অচলাবস্থা কাটানোর লক্ষ্যেই এই হামলার ছক কষা হয়েছে। এই পরিকল্পনায় মূলত ইরানের বিভিন্ন অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করা হবে, যাতে তেহরানকে পুনরায় আলোচনার টেবিলে ফিরে আসতে এবং নমনীয় হতে বাধ্য করা যায়। এদিকে যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হতে পারেÑ এই আশঙ্কায় তেলের দাম চার বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
হরমুজ খুলতে আন্তর্জাতিক জোট গঠনে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগ
মধ্যপ্রাচ্যের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ হরমুজ প্রণালিতে নৌ-চলাচল স্বাভাবিক করতে আন্তর্জাতিক জোট গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের বরাতে জানা গেছে, মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট ইতোমধ্যে এ বিষয়ে অংশীদার দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছে। প্রস্তাবিত এই জোটের নাম দেওয়া হয়েছে ‘ম্যারিটাইম ফ্রিডম কন্সট্রাক্ট’, যার লক্ষ্য হবে প্রণালিটিতে অবাধ ও নিরাপদ জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করা।
প্রায় দুই মাস আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথ সামরিক হামলার পর থেকে ইরান কার্যত হরমুজ প্রণালিতে নিজেদের ছাড়া অন্যসব জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে। বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে প্রণালীটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে তীব্র অস্থিরতা তৈরি হয়েছে এবং দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা বাড়ছে।
এরই প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে। বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুড একপর্যায়ে ব্যারেলপ্রতি ১২৫ ডলার ছাড়িয়ে যায়, যা গত কয়েক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। বছরের শুরু থেকে তেলের দাম দ্বিগুণের বেশি বৃদ্ধি পাওয়ায় বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে এবং অনেক দেশে জ্বালানির মূল্য রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।
এই অচলাবস্থা নিরসনে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর চাপ বাড়াতে নৌ অবরোধ আরোপের পরিকল্পনা করছে। ওয়াশিংটনের ধারণা, এতে তেহরান অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়বে এবং পুনরায় আলোচনায় ফিরতে বাধ্য হবে। এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নতুন সামরিক পরিকল্পনা নিয়ে ব্রিফিং দেওয়ার কথা রয়েছে। ইতোমধ্যে তিনি তেল কোম্পানির নির্বাহীদের সঙ্গে বৈঠক করে সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদি অবরোধের কৌশল নিয়েও আলোচনা করেছেন।
অন্যদিকে, ইরান স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে, তারা নিজেদের নিরাপত্তা হুমকির মুখে মনে করলে হরমুজ প্রণালীতে নৌ-চলাচলে বিঘ্ন ঘটানো অব্যাহত রাখবে। তেহরান সতর্ক করেছে, ইরান-সংশ্লিষ্ট জাহাজে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ অব্যাহত থাকলে তারা ‘অভূতপূর্ব সামরিক পদক্ষেপ’ নিতে পারে। একই সঙ্গে দেশটি দাবি করছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ এবং বেসামরিক উদ্দেশ্যে পরিচালিত।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ভিন্ন। ওয়াশিংটন স্পষ্ট জানিয়েছে, ইরানকে কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের সুযোগ দেওয়া হবে না। বর্তমানে ইরানের কাছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুদ রয়েছে, যা আরও পরিশোধিত হলে একাধিক পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জন করতে পারে বলে পশ্চিমা দেশগুলোর আশঙ্কা।
সংঘাত নিরসনে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এখনও স্থবির হয়ে আছে। ইরান চায়, যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি এবং হরমুজ প্রণালিতে নৌ-চলাচল স্বাভাবিক হওয়ার পরই পারমাণবিক ইস্যুতে আলোচনা শুরু হোক। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র শুরুতেই এই ইস্যুতে অগ্রগতি চায়, ফলে দুই পক্ষের অবস্থানের মধ্যে স্পষ্ট বিরোধ রয়ে গেছে।
এদিকে, প্রস্তাবিত আন্তর্জাতিক জোটে ফ্রান্স ও ব্রিটেনসহ কয়েকটি দেশ আগ্রহ দেখালেও তারা জানিয়েছে, সংঘাত চলাকালে সরাসরি সম্পৃক্ত হতে চায় না। বরং পরিস্থিতি শান্ত হলে তারা হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করতে সহায়তা করতে পারে।
এরই প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে। বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুড েএকপর্যায়ে ব্যারেলপ্রতি ১২৫ ডলার ছাড়িয়ে যায়, যা গত কয়েক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। বছরের শুরু থেকে তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে এবং অনেক দেশে জ্বালানির মূল্য রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। এই অচলাবস্থা নিরসনে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর চাপ বাড়াতে নৌ অবরোধ আরোপের পরিকল্পনা করছে।