প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ৩০ এপ্রিল ২০২৬ ০৯:০৮ এএম
আপডেট : ৩০ এপ্রিল ২০২৬ ০৯:১৩ এএম
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিপক্ষে যুদ্ধে ইরানের দুই হাজারেরও বেশি নাগরিক প্রাণ হারিয়েছে। যুদ্ধে নিহত এসব নাগরিকের ছবি সংবলিত ব্যানার তেহরানের রাস্তায় টানানো হয়েছে। ছবি: এএফপি
ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়াতে নতুন করে ৩৫ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মঙ্গলবার ঘোষিত এই পদক্ষেপে তেহরানের কথিত ‘ছায়া ব্যাংকিং’ নেটওয়ার্ককে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে, যার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে বিপুল অঙ্কের আর্থিক লেনদেন পরিচালিত হয়ে আসছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীন অফিস অব ফরেন অ্যাসেটস কন্ট্রোল (ওএফএসি) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তালিকাভুক্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলো পূর্বের নিষেধাজ্ঞা ফাঁকি দিয়ে কয়েক হাজার কোটি ডলারের লেনদেনে সহায়তা করেছে এবং এর মাধ্যমে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীগুলোর অর্থায়নে ভূমিকা রেখেছে।
ওএফএসি বিশেষভাবে সতর্ক করেছে, যারা ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) বা ইরান সরকারের সঙ্গে আর্থিক লেনদেন চালিয়ে যাচ্ছে, বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী ব্যবহার সংক্রান্ত অর্থ প্রদান, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে চীনের শানডং প্রদেশের তথাকথিত ‘টিপট’ শোধনাগারগুলোর সঙ্গে যুক্ত ব্যাংকগুলোকেও সরাসরি সতর্ক করা হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, এসব প্রতিষ্ঠানের কিছু অংশ যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক ব্যবস্থাকে ব্যবহার করে ডলারে লেনদেন চালিয়ে যাচ্ছে এবং এমনকি দেশটির পণ্যও ক্রয় করছে, যা নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনের শামিল। তবে চীন এ ধরনের একতরফা নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা করেছে এবং এটিকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য ক্ষতিকর বলে উল্লেখ করেছে।
মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট এক বিবৃতিতে বলেন, ইরানের এই ‘ছায়া ব্যাংকিং’ কাঠামো দেশটির সামরিক কর্মকাণ্ডের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক লাইফলাইন হিসেবে কাজ করছে। তার ভাষায়, এই নেটওয়ার্ক বৈশ্বিক বাণিজ্যে বিঘ্ন ঘটানোর পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে সহিংসতা উস্কে দিচ্ছে। তিনি আরও সতর্ক করেন, যারা এই নেটওয়ার্ককে সহায়তা করবে, তাদের ‘মারাত্মক পরিণতি’ ভোগ করতে হবে।
ওএফএসি জানায়, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত ইরান-সংশ্লিষ্ট প্রায় ১,০০০ ব্যক্তি, জাহাজ ও বিমানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। পশ্চিমা আর্থিক ব্যবস্থায় প্রবেশে বাধার মুখে ইরানি ব্যাংকগুলো ‘রাহবার’ নামে পরিচিত বেসরকারি কোম্পানির নেটওয়ার্ক ব্যবহার করছে, যারা বিদেশে হাজার হাজার শেল কোম্পানির মাধ্যমে আমদানি-রপ্তানির অর্থ লেনদেন নিশ্চিত করে।
নিষেধাজ্ঞার তালিকায় থাকা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে ফারাব সোরোশ আফাক কেশম কোম্পানি, যা ইরানের শহর ব্যাংকের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তেল বিক্রিতে ভূমিকা রাখে। এছাড়া ব্যাংক সিনা ও ব্যাংক সেপাহর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের নামও যুক্ত করা হয়েছে, যেগুলো সামরিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিতে অর্থ জোগানের অভিযোগে অভিযুক্ত।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের ওপর ‘সর্বোচ্চ চাপ’ প্রয়োগের কৌশল জোরদার করতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে ট্রাম্প প্রশাসন পাঁচটি চীনা শোধনাগারের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। জ্বালানি বিশ্লেষণা প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, ইরান সমুদ্রপথে যে তেল রপ্তানি করে, তার ৮০ শতাংশের বেশি কেনে চীন।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, চীনা ব্যাংকগুলোর বিরুদ্ধে সরাসরি কঠোর ব্যবস্থা না নিলে এই নিষেধাজ্ঞা তেমন কার্যকর নাও হতে পারে। ওবিসিডিয়ান রিস্ক অ্যাডভাইজারসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ব্রেট এরিকসন বলেন, তেহরানের আর্থিক নেটওয়ার্ক ভাঙতে হলে মূল অর্থায়নকারীদের লক্ষ্যবস্তু করাই হবে সবচেয়ে কার্যকর কৌশল।
বর্তমানে চলমান আঞ্চলিক উত্তেজনা ও ইরান সংশ্লিষ্ট সংঘাতের প্রেক্ষাপটে এই নতুন নিষেধাজ্ঞা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।