প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ২৬ এপ্রিল ২০২৬ ০৯:৩৭ এএম
বিশ্লেষকদের মতে, এই সংঘাতে মূল লড়াইটি এখন অর্থনীতি ও ধৈর্যের। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, তার প্রশাসনের নৌ-অবরোধে অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে ইরান। সামাজিক মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, অবরোধের কারণে ইরান প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অর্থ হারাচ্ছে এবং দ্রুত সমাধান চাইছে।
গত ১৩ এপ্রিল ইরানি বন্দরগুলো লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্র নৌ-অবরোধ জোরদার করে। এর প্রতিক্রিয়ায় হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিদেশি জাহাজ চলাচলে কড়াকড়ি আরোপ করে তেহরান। এই প্রণালি বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ।
অবরোধে ইরানের ক্ষতি কতটা?
বিশ্লেষকদের মতে, অবরোধ ইরানের তেল ও পণ্য রপ্তানিতে চাপ সৃষ্টি করলেও দেশটি এখনও উল্লেখযোগ্য আয় ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে প্রতিদিন গড়ে ১.৭-১.৮ মিলিয়ন ব্যারেল তেল রপ্তানি করেছে ইরান। উচ্চমূল্যের কারণে গত এক মাসে তাদের তেল আয়ে বরং উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি দেখা গেছে।
তবে কেপলারসহ বিভিন্ন সংস্থার বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, দীর্ঘমেয়াদে অবরোধ কার্যকর থাকলে রপ্তানি ধীর হয়ে যাবে এবং স্থলভাগে তেল মজুদের ওপর চাপ বাড়বে।
‘দীর্ঘমেয়াদি খেলা’ খেলছে তেহরান
মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান মিডল ইস্ট কাউন্সিল অন গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সের বিশ্লেষকদের মতে, ইরান আগেই এমন পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি নিয়েছে। তাদের হাতে বিকল্প রপ্তানি পথ, শ্যাডো নেটওয়ার্ক এবং ভাসমান তেলের মজুদ রয়েছে।
বিশ্লেষণে বলা হয়, বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন সাগরে ১৬০-১৮০ মিলিয়ন ব্যারেল ইরানি তেল ভাসমান অবস্থায় রয়েছে, যা আগামী কয়েক মাস পর্যন্ত রাজস্ব প্রবাহ বজায় রাখতে সহায়তা করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের চ্যালেঞ্জ কোথায়?
অন্যদিকে অবরোধ দীর্ঘদিন ধরে চালিয়ে যাওয়া যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও সহজ নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই সামরিক তৎপরতা চালানোর ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময়সীমা রয়েছে, যা দ্রুত শেষ হয়ে আসছে। এ ছাড়া চীনের মতো বড় ক্রেতা দেশ যদি ইরানি তেল কেনা অব্যাহত রাখে, তবে অবরোধের কার্যকারিতা প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। চীন ইতোমধ্যেই এ ধরনের নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা করেছে।
বৈশ্বিক প্রভাব ও মিত্রদের চাপ
ইরানের পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণ ও জাহাজ চলাচলে সীমাবদ্ধতা আরোপ বিশ্ববাজারে জ্বালানির দামে অস্থিরতা তৈরি করেছে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোও অর্থনৈতিক চাপের মুখে পড়ছে।
মজুদ ও বিকল্প আয়ের পথ
ইরানের তেল উৎপাদন ও শোধন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্য হলেও অবরোধের ফলে মজুদের জায়গা সংকট তৈরি হতে পারে। এজন্য পুরনো ট্যাংকারকে ভাসমান গুদাম হিসেবে ব্যবহারের মতো কৌশলও নিচ্ছে তেহরান। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাতায়াতকারী জাহাজ থেকে ‘টোল’ আদায়ের মাধ্যমে নতুন রাজস্ব উৎস তৈরির চেষ্টা করছে দেশটি।
শেষ পর্যন্ত কার ধৈর্য বেশি?
বিশ্লেষকদের মতে, এই সংঘাতে মূল লড়াইটি এখন অর্থনীতি ও ধৈর্যের। ইরান দীর্ঘমেয়াদি চাপ সহ্য করার প্রস্তুতি নিয়ে এগোচ্ছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিক, রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক চাপ সামাল দিতে হচ্ছে।
পর্যবেক্ষকদের ভাষায়, প্রশ্নটা এখন আর শুধু অবরোধ কতটা কার্যকর তা নয়; বরং কে বেশি দিন এই চাপ সহ্য করতে পারবে, সেটাই নির্ধারণ করবে পরবর্তী সমীকরণ।