তেহরান টাইমসের প্রতিবেদন
প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ২৫ এপ্রিল ২০২৬ ১৮:৪৭ পিএম
ইসরায়েলি ডিটেনশন সেন্টারগুলো, বিশেষ করে নেগেভ মরুভূমির কুখ্যাত ‘সদে তেইমান’ কেন্দ্রটি বর্তমানে ফিলিস্তিনি বন্দিদের ওপর পদ্ধতিগত যৌন নির্যাতনের এক গবেষণাগারে পরিণত হয়েছে। ছবি: তেহরান টাইমস
ফিলিস্তিনি বন্দিদের মারধর বা না ঘুমাতে দেওয়ার মতো ইসরায়েলি নির্যাতনের খবরে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় আগে থেকেই অভ্যস্ত। তবে ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে সামনে আসা বিভিন্ন বিস্তারিত সাক্ষ্য ও তথ্যপ্রমাণ এক ভয়াবহ ও বিকৃত বাস্তবতাকে উন্মোচিত করেছে।
ইসরায়েলি ডিটেনশন সেন্টারগুলো, বিশেষ করে নেগেভ মরুভূমির কুখ্যাত ‘সদে তেইমান’ কেন্দ্রটি বর্তমানে ফিলিস্তিনি বন্দিদের ওপর পদ্ধতিগত যৌন নির্যাতনের এক গবেষণাগারে পরিণত হয়েছে। সেখানে ফিলিস্তিনি বন্দিদের ওপর প্রশিক্ষিত কুকুর লেলিয়ে দিয়ে পাশবিক যৌন নির্যাতন চালানো হচ্ছে।
প্রতিবেদন অনুসারে, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং ফিলিস্তিনিদের সামাজিক ও ব্যক্তিগত সত্ত্বাকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করার লক্ষ্যে গৃহীত একটি সুপরিকল্পিত নীতি।
ভয়াবহতার অভ্যন্তরীণ স্বীকৃতি
ইসরায়েলি সামরিক সেন্সরশিপের দেয়াল ভেঙে সম্প্রতি এই পাশবিকতার সত্যতা প্রকাশ্যে এসেছে। ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং সাবেক সেনাসদস্য শায়েল বিন-এফ্রায়িম গত ১৮ এপ্রিল এক শিউরে ওঠার মতো তথ্য প্রকাশ করেন। সদে তেইমান কেন্দ্রের দুজন প্রহরীর সাক্ষাৎকার নেওয়ার পর বিন-এফ্রায়িম জানান, বন্দিদের ওপর কুকুর লেলিয়ে দিয়ে যৌন নির্যাতন চালানো সেখানে একটি ‘ওপেন সিক্রেট’ বা সবার জানা বিষয়।
একজন রক্ষী স্বীকার করেছেন যে, তিনি এমন কিছু দৃশ্য দেখেছেন যা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। অন্য একজন নিশ্চিত করেছেন যে, সেখানকার কর্মীদের মধ্যে কুকুর দিয়ে ধর্ষণের বিষয়টি ব্যাপকভাবে প্রচলিত ও স্বীকৃত। বিন-এফ্রায়িমের মতে, এই নির্যাতনের প্রমাণ পাহাড়সম এবং এটি বর্তমানেও চলমান একটি বাস্তব পরিস্থিতি।
এই তথ্যগুলো বি’তসেলেম ইউরো-মেডিটেরিনিয়ান হিউম্যান রাইটস মনিটর এবং ফিলিস্তিনি সেন্টার ফর হিউম্যান রাইটসের তদন্তের সঙ্গে মিলে যায়। এই সংস্থাগুলো জানিয়েছে, ইসরায়েলি জিজ্ঞাসাবাদ কেন্দ্রগুলো এখন ‘নির্যাতন ক্যাম্পে’ পরিণত হয়েছে, যার মূল লক্ষ্য ফিলিস্তিনিদের মনস্তাত্ত্বিকভাবে গুঁড়িয়ে দেওয়া। এই ক্ষেত্রে কুকুরের ব্যবহার অত্যন্ত সুপরিকল্পিত, কারণ এটি ভুক্তভোগীর সামাজিক মর্যাদা ও ধর্মীয় সংবেদনশীলতাকে আঘাত করে দীর্ঘমেয়াদী ট্রমা এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা তৈরি করে।
জীবন্ত দুঃস্বপ্নের বর্ণনা
বেঁচে ফেরা বন্দিরা এমন সব নিষ্ঠুরতার বর্ণনা দিয়েছেন যা সাধারণ সামরিক শৃঙ্খলাকেও হার মানায়। ৩৫ বছর বয়সী এ.এ. (ছদ্মনাম), যিনি সদে তেইমানে ১৯ মাস বন্দি ছিলেন। তিনি জানান, তাকে এমন এক করিডোরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল যেখানে কোনো ক্যামেরা ছিল না। সেখানে তাকে বিবস্ত্র করে একটি প্রশিক্ষিত কুকুর দিয়ে প্রায় তিন মিনিট ধরে পাশবিক নির্যাতন চালানো হয়। এই সময় ইসরায়েলি সেনারা দাঁড়িয়ে হাসাহাসি করছিল এবং তার চোখেমুখে পিপার স্প্রে ছিটানো হচ্ছিল।
অন্যান্য বন্দিদের বর্ণনাও সমান ভয়াবহ। ৪৩ বছর বয়সী ওয়াজদি জানান, তাকে একটি লোহার খাটে বেঁধে একজন সেনা এবং একটি কুকুর দিয়ে পালাক্রমে ধর্ষণ করা হয়েছিল। রক্ষীরা এই পুরো দৃশ্যটি ভিডিও করছিল যাতে পরবর্তীতে তাকে ব্ল্যাকমেইল করা যায়। অন্য এক বন্দি জানান, তিনি নিজের চোখে এক সহবন্দির যৌনাঙ্গ কুকুর দিয়ে কামড়ে ছিঁড়ে ফেলতে দেখেছেন এবং রক্তক্ষরণে সেই ব্যক্তি তার কোলেই মারা যান।
দায়মুক্তির কাঠামো
এই ভয়াবহ নিষ্ঠুরতা ইসরায়েলের একটি বিশেষ আইনি ও রাজনৈতিক কাঠামোর মাধ্যমে সুরক্ষিত। সেখানে নির্যাতনকারীদের শাস্তির হার নেই বললেই চলে। গত মার্চ মাসে সদে তেইমান কেন্দ্রে এক বন্দিকে গণধর্ষণের অভিযোগে অভিযুক্ত পাঁচ রিজার্ভিস্ট সেনার বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে নেওয়া হয়। উল্টো কট্টরপন্থী মন্ত্রী ইতামার বেন-গভির এবং বেজালেল স্মোট্রিচ সেই অভিযুক্তদের ‘বীর’ হিসেবে আখ্যা দেন।
ইসরায়েলি সংসদ নেসেটে লিকুদ পার্টির এমপি হানোচ মিলউইডস্কি খোলাখুলি ঘোষণা করেছেন যে, বন্দিদের সঙ্গে যেকোনো ধরণের আচরণ—এমনকি মলদ্বারে বস্তু প্রবেশ করানোও বৈধ। জাতিসংঘের বিশেষ দূত ফ্রান্সেস্কা আলবানিজ মন্তব্য করেছেন যে, এই নির্যাতন এখন একটি ‘কাঠামোগত বৈশিষ্ট্যে’ পরিণত হয়েছে, যা ফিলিস্তিনিদের মর্যাদা ধ্বংস করার একটি অস্ত্র।
আন্তর্জাতিক নীরবতা ও সহযোগিতা
এই দুঃস্বপ্নের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কেও দায়বদ্ধ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। যুক্তরাষ্ট্র পররাষ্ট্র দপ্তর মাঝে মাঝে ‘গভীর উদ্বেগ’ প্রকাশ করলেও ইসরায়েলে সামরিক সহায়তা ও কূটনৈতিক সুরক্ষা দিয়ে আসছে। আন্তর্জাতিক আইন প্রয়োগে এই ব্যর্থতা ইসরায়েলকে কুকুরের মাধ্যমে এমন যৌন সন্ত্রাস চালিয়ে যেতে পরোক্ষভাবে উৎসাহ দিচ্ছে।
প্রতিবেদনটির শেষে বলা হয়েছে, এটি এমন এক দখলদারিত্বের চূড়ান্ত রূপ যা কখনো জবাবদিহিতার মুখোমুখি হয়নি। সদে তেইমানের অন্ধকার করিডোরে কুকুরের চিৎকার আর ভুক্তভোগীদের আর্তনাদ যেন বিশ্ববিবেকের নীরবতারই এক চরম ধিক্কার।