হরমুজ সংকট ও অবরোধ
প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ২৫ এপ্রিল ২০২৬ ১০:১৪ এএম
যুদ্ধের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় তেহরানের মিনাবের স্কুলে নিহত শিক্ষার্থীদের ব্যবহৃত প্রতীকী জিনিসপত্র নিয়ে শুক্রবার তেহরানে ভালিসর স্কয়ারে সাজিয়ে তাদের স্মরণ করা হয়। ছবি: এফপি
মার্কিন নৌ অবরোধ ও চলমান আঞ্চলিক উত্তেজনার মুখে পড়েও ইরানের অর্থনীতি তাৎক্ষণিকভাবে ধসে পড়বেÑ এমন আশঙ্কা এখনই দেখছেন না বিশ্লেষকেরা। বরং তাদের মতে, স্বল্পমেয়াদে চাপ বাড়লেও দেশটি কিছুটা সময় পর্যন্ত পরিস্থিতি সামাল দিতে সক্ষম হতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত তীব্র হওয়ার পর কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে অচলাবস্থা। এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়ে বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের তেল পরিবাহিত হয়। সংঘাতের জেরে ইরান কার্যত এই প্রণালীতে চলাচল সীমিত করার হুমকি দিলে পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোতে নৌ অবরোধ আরোপ করে। এর উদ্দেশ্য তেহরানকে শান্তি আলোচনায় ছাড় দিতে বাধ্য করা।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এই কৌশল স্বল্প সময়ে প্রত্যাশিত ফল দেবে না। তেহরানের শহীদ বেহেশতি বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক সাঈদ লাইলাজ বলেন, অবরোধ যদি দুই থেকে তিন মাসের বেশি স্থায়ী হয়, তবেই তা ইরানের অর্থনীতিতে বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হতে পারে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, ইরান ক্ষতিগ্রস্ত হলে পারস্য উপসাগরের দক্ষিণের দেশগুলোর ওপরও এর প্রভাব পড়বে।
জ্বালানি খাতের ঝুঁকি বিশ্লেষক আর্নে লোহমান রাসমুসেনের মতে, অবরোধের ফলে ইরানের তেল সংরক্ষণ ক্ষমতা দ্রুত চাপে পড়তে পারে। ধারণা করা হয়েছিল, এক মাসের মধ্যে সংরক্ষণ সক্ষমতা শেষ হয়ে যেতে পারে। তবে বাস্তবে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই উৎপাদন আংশিক কমিয়ে আনতে হতে পারে।
এদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, ১২ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া মার্কিন অবরোধের কারণে ইরানের অর্থনীতি দ্রুত ধসে পড়ছে। তার প্রশাসনের ট্রেজারি প্রধানও সতর্ক করে বলেছেন, ইরানের প্রধান তেল রপ্তানি কেন্দ্র খার্গ দ্বীপে সংরক্ষণ সক্ষমতা শেষ হয়ে গেলে উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে। তবে এই মূল্যায়নের সঙ্গে একমত নন অনেক বিশ্লেষক। জ্বালানি গবেষণা প্রতিষ্ঠান মিডল ইস্ট ইকোনমিক সার্ভের (এমইইএস) ব্যবস্থাপনা সম্পাদক জেমি ইনগ্রাম বলেন, সংরক্ষণ সংকটের সময়সীমা দিন নয়, বরং কয়েক সপ্তাহে বিবেচনা করা উচিত। তার মতে, পরিস্থিতি চরমে পৌঁছানোর আগেই ইরান উৎপাদন কমিয়ে চাপ সামাল দেওয়ার চেষ্টা করবে।
জ্বালানি গোয়েন্দা সংস্থা ‘কেপলার’-এর তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই ইরানের তেল উৎপাদন কমতে শুরু করেছে। মার্চে দৈনিক উৎপাদন কমে দাঁড়ায় প্রায় ৩.৬৮ মিলিয়ন ব্যারেলে এবং এপ্রিল মাসে তা আরও কমে ৩.৪৩ মিলিয়ন ব্যারেলে নেমে আসতে পারে।
তবে অধ্যাপক লাইলাজ মনে করেন, অবরোধের বাস্তব অর্থনৈতিক প্রভাব এখনও সীমিত এবং এটি মূলত মানসিক চাপ সৃষ্টি করছে। ইনগ্রামের ভাষ্য অনুযায়ী, খার্গ দ্বীপে সংরক্ষণ সংকট বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে না। কারণ ইরান বিকল্প ব্যবস্থায় তেল সরিয়ে নিতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের অর্থনৈতিক কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ‘সহনশীলতা’। অতীতে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও দেশটি তেল রপ্তানির আয় কমে যাওয়ার ধাক্কা সহ্য করেছে। ফলে বর্তমান পরিস্থিতিতেও একই ধরনের স্থিতিস্থাপকতা দেখা যেতে পারে। অন্যদিকে এই উত্তেজনার মধ্যে চীনের মতো দেশগুলোর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। তারা মনে করছেন, দীর্ঘমেয়াদি চাপের ফলে বেইজিং তেহরানকে আলোচনায় বসতে উৎসাহিত করতে পারে।
আন্তর্জাতিক ক্রাইসিস গ্রুপের ইরান প্রকল্প পরিচালক আলি ভায়েজ বলেন, যুদ্ধের আগেই ইরানের অর্থনীতি দুর্বল ছিল, তবে দেশটির নেতৃত্ব দীর্ঘদিন ধরেই বহিরাগত চাপ মোকাবিলায় সক্ষমতা দেখিয়ে এসেছে। যদিও এর ফলে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ বাড়ে।
সব মিলিয়ে, বিশ্লেষকদের মতে বর্তমান পরিস্থিতি ‘পারস্পরিক ক্ষতির ভারসাম্য’-এর দিকে যাচ্ছে। ইরান যেমন অবরোধের চাপ মোকাবিলা করছে, তেমনি হরমুজ প্রণালীতে অস্থিরতা সৃষ্টি করে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও চাপ তৈরি করছে। ফলে সংকট দ্রুত সমাধান না হলে এর প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই নয়, বিশ্ব অর্থনীতিতেও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।