প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ২২ এপ্রিল ২০২৬ ১০:০৪ এএম
আপডেট : ২২ এপ্রিল ২০২৬ ১০:০৫ এএম
যুদ্ধকে কেন্দ্র করে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল বিরোধিতা আরও বেড়েছে। তেহরানজুড়ে বিভিন্ন ধরনের প্রতিকৃতি আঁকা হয়েছে। ছবিতে মঙ্গলবার তেহরানের এক দেয়ালে আঁকা ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির প্রতিকৃতির সামনে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন দুই নারী। ছবি: এএফপি
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চলমান কূটনৈতিক আলোচনায় হরমুজ প্রণালি ইস্যুটি ক্রমেই কেন্দ্রীয় হয়ে উঠছে, যা উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর মধ্যে নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। আঞ্চলিক কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকদের মতে, এই আলোচনা যদি মূলত হরমুজের নিরাপত্তা ও ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তা দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা ঝুঁকি কমানোর পরিবর্তে ইরানের প্রভাবকে আরও সুসংহত করতে পারে।
সম্প্রতি দিমিত্রি মেদভেদেভ মন্তব্য করেন, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে আলোচনার বাস্তব ফলাফল সম্ভবত হরমুজ পুনরায় সচল রাখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে পারে। তার এই মন্তব্য উপসাগরীয় দেশগুলোর দীর্ঘদিনের আশঙ্কাকে আরও জোরালো করেছে যে, আঞ্চলিক উত্তেজনা প্রশমনের পরিবর্তে একটি সীমিত সমঝোতার দিকেই পরিস্থিতি এগোচ্ছে।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, আসন্ন আলোচনায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি বা আঞ্চলিক প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর কার্যক্রমের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পেতে পারে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ এবং হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ প্রশ্ন। উল্লেখ্য, বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই কৌশলগত জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়, যা বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
উপসাগরীয় কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন, এই ধরনের আলোচনার ফলে ইরানের প্রভাব কমানোর বদলে তা কার্যত স্বীকৃতি পেতে পারে। তাদের মতে, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে অগ্রাধিকার দিতে গিয়ে স্থানীয় নিরাপত্তা উদ্বেগগুলো উপেক্ষিত হচ্ছে। বিশেষ করে উপসাগরীয় দেশগুলো অভিযোগ করছে, তাদের সরাসরি সম্পৃক্ত না করেই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।
একাধিক সূত্রের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনায় এখন ‘ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ’ পদ্ধতি প্রাধান্য পাচ্ছে, অর্থাৎ সংঘাত পুরোপুরি নিরসন নয়, বরং তা সহনীয় পর্যায়ে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। এতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও আঞ্চলিক প্রভাবের মতো মৌলিক ইস্যুগুলো অনিষ্পন্নই থেকে যেতে পারে।
ইরানের নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করেন, হরমুজ দেশটির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরোধমূলক হাতিয়ার (ডিটারেন্ট) হিসেবে কাজ করছে। তাদের মতে, ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এই জলপথে প্রভাব বিস্তার ইরানকে কৌশলগত সুবিধা দেয়, যা সরাসরি সামরিক সংঘর্ষ ছাড়াই প্রতিপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে সক্ষম।
অন্যদিকে উপসাগরীয় দেশগুলোর বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি একটি নতুন বাস্তবতার ইঙ্গিত দিচ্ছে, যেখানে আন্তর্জাতিক নিয়মের পরিবর্তে শক্তির ভারসাম্যই নির্ধারক হয়ে উঠছে। এমিরেটস পলিসি সেন্টারের প্রেসিডেন্ট ইবতেসাম আল-কেতবি বলেন, বর্তমান প্রক্রিয়া কোনো স্থায়ী সমাধানের দিকে নয়, বরং দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতার ঝুঁকি তৈরি করছে।
তিনি উল্লেখ করেন, একটি কার্যকর চুক্তিতে ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি, আঞ্চলিক প্রক্সি এবং হরমুজÑ সবগুলো বিষয়ই অন্তর্ভুক্ত থাকা প্রয়োজন। কিন্তু বর্তমান আলোচনায় এসব ইস্যু সমান গুরুত্ব পাচ্ছে না বলে তিনি মন্তব্য করেন।
ইতোমধ্যে চলমান সংঘাত উপসাগরীয় অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলেছে। জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর হামলা, রপ্তানি ব্যাহত হওয়া এবং বীমা খরচ বৃদ্ধিÑ সব মিলিয়ে অর্থনৈতিক চাপ বেড়েছে। বিকল্প রুট ব্যবহারের খরচও বেশি, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে।
কূটনীতিকরা জানিয়েছেন, উপসাগরীয় দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রকে ধাপে ধাপে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার পরামর্শ দিয়েছে, যাতে ইরানের আচরণ পর্যবেক্ষণ করা যায়। তাদের মতে, সরাসরি বড় ধরনের ছাড় দেওয়ার আগে আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।
তবে সমালোচনা থাকা সত্ত্বেও অনেক উপসাগরীয় বিশ্লেষক স্বীকার করেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা এখন এই অঞ্চলের নিরাপত্তা ভারসাম্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবুও তারা সতর্ক করে বলছেন, একতরফা সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তা মিত্রদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি করতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ ঘিরে বর্তমান কূটনৈতিক সমীকরণ এখন আর কেবল আঞ্চলিক ইস্যু নয়; বরং এটি বৈশ্বিক অর্থনীতি ও নিরাপত্তার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ফলে এই আলোচনায় সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের অন্তর্ভুক্তি ও ভারসাম্যপূর্ণ সমাধানই হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার চাবিকাঠি।