প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ২০ এপ্রিল ২০২৬ ২২:৩১ পিএম
আপডেট : ২৪ এপ্রিল ২০২৬ ০০:০৯ এএম
ফেব্রুয়ারি মাসটি পাকিস্তানের সাম্প্রতিক ইতিহাসে অন্যতম রক্তক্ষয়ী সময় হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। তবে এই সহিংসতার জন্য কোনো বহিরাগত শক্তি নয়, বরং দেশের নিজস্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থার ব্যর্থতাকেই দায়ী করছেন বিশ্লেষকরা। একের পর এক হামলা, গোয়েন্দা ব্যর্থতা এবং নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারার অভিযোগের মধ্যেই দেশটির সামরিক নেতৃত্ব নতুন করে আফগানিস্তানের সঙ্গে উত্তেজনা বাড়িয়েছে।
গত ৬ ফেব্রুয়ারি ইসলামাবাদের একটি শিয়া মসজিদে আত্মঘাতী হামলায় অন্তত ৩৬ জন নিহত এবং ১৭০ জনের বেশি আহত হন। এর পরপরই বাজাউরে আরেক হামলায় ১১ জন সেনা নিহত হন এবং খাইবার পাখতুনখোয়ার বান্নু এলাকায় আরও বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন নয়, বরং একটি ধারাবাহিক নিরাপত্তা ব্যর্থতার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ইসলামাবাদ হামলার আগে গোয়েন্দা সতর্কতা থাকা সত্ত্বেও যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ বাড়তে থাকে এবং সামরিক বাহিনীর জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
এই প্রেক্ষাপটে ২১ ফেব্রুয়ারি রাতে পাকিস্তান বিমান বাহিনী আফগানিস্তানের নানগারহার, পাকতিকা ও খোস্ত প্রদেশে বিমান হামলা চালায়। পাকিস্তান দাবি করে, এসব হামলায় তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) এবং ইসলামিক স্টেট খোরাসান শাখার ঘাঁটি লক্ষ্যবস্তু ছিল। তবে আফগান কর্তৃপক্ষ জানায়, এসব হামলায় অন্তত ১৮ জন নিহত হন, যাদের মধ্যে নারী ও শিশুও রয়েছে। জাতিসংঘের একটি মিশনও বেসামরিক হতাহতের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এসব হামলা মূলত দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যর্থতা থেকে দৃষ্টি সরানোর একটি কৌশল। ইসলামাবাদে হামলার পর যখন নিরাপত্তা ব্যর্থতা নিয়ে সমালোচনা বাড়ছিল, তখনই সীমান্তের বাইরে সামরিক পদক্ষেপ নিয়ে একটি ‘বাহ্যিক শত্রু’ তৈরি করার চেষ্টা করা হয়েছে।
২৭ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান আনুষ্ঠানিকভাবে আফগানিস্তানের সঙ্গে “খোলা যুদ্ধ” পরিস্থিতির ঘোষণা দেয়। দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী জানান, তাদের ধৈর্যের সীমা শেষ হয়ে গেছে। পরবর্তীতে কাবুলসহ বিভিন্ন অঞ্চলে আরও হামলার অভিযোগ ওঠে। আফগান পক্ষ দাবি করে, এসব হামলায় সাধারণ মানুষের বাড়িঘর লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, এই সহিংসতা কেবল সীমান্তের বাইরে নয়, দেশের ভেতরেও দীর্ঘদিন ধরে চলমান। বেলুচিস্তানে জোরপূর্বক গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা এবং নির্যাতনের বহু অভিযোগ রয়েছে। ২০২৫ সালে এক হাজারের বেশি মানুষ নিখোঁজ হওয়ার তথ্য প্রকাশ করেছে স্থানীয় সংগঠনগুলো।
এছাড়া আফগান শরণার্থীদের প্রতিও কঠোর আচরণের অভিযোগ উঠেছে। গত কয়েক বছরে লাখ লাখ আফগান নাগরিককে জোরপূর্বক দেশত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে এবং তাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
সমালোচকরা বলছেন, দেশের ভেতরে রাজনৈতিক অস্থিরতা, নিরাপত্তাহীনতা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ বাড়তে থাকায় সামরিক নেতৃত্ব আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শক্ত অবস্থান দেখানোর চেষ্টা করছে। তবে এর ফলে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা আরও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে ইতোমধ্যেই বিক্ষোভ শুরু হয়েছে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে। পরিস্থিতি কোন দিকে গড়ায়, তা এখন আন্তর্জাতিক মহলের নজরেও রয়েছে।