প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ১৯ এপ্রিল ২০২৬ ১১:৩৪ এএম
মধ্যপ্রাচ্যের তেল বৈশ্বিক জ্বালানির নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে। ছবি: রয়টার্স
লাখ লাখ বছর ধরে চলা ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়া এই অঞ্চলটিকে বৈশ্বিক জ্বালানি কেন্দ্রে পরিণত করেছে। এ কারণেই বর্তমান যুদ্ধের (ইরান, ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র) মতো মধ্যপ্রাচ্যে বড় কোনো সংঘাত শুরু হলে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকট তৈরি হয়।
একজন পেট্রোলিয়াম ভূতত্ত্ববিদ হিসেবে এই অঞ্চলের বিষয়ে পড়াশোনা করে এখনও এখানকার হাইড্রোকার্বন মজুদের ব্যাপকতা দেখে আমি অবাক হয়ে যাই।
উদাহরণস্বরূপ পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে ৩০টিরও বেশি তেলসমৃদ্ধ এলাকা রয়েছে, যেগুলোকে ‘সুপারজায়ান্ট’ বলা হয়। এই এলাকার প্রত্যেকটিতে অন্তত পাঁচ বিলিয়ন বা ৫০০ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল রয়েছে।
এছাড়া এই অঞ্চলের তেলকূপগুলোতে প্রতিদিন যে পরিমাণ তেল উৎপাদন হয়, সেটি উত্তর সাগর বা রাশিয়ার সেরা তেলকূপগুলোর উৎপাদনের তুলনায় দুই-পাঁচ গুণ বেশি। সূত্র : বিবিসি
শেষ বরফ যুগের শেষে অর্থাৎ আজ থেকে প্রায় ১৪ হাজার বছর আগে বন্যার ফলে যখন পারস্য উপসাগর গঠিত হয়, তখনই হাইড্রোকার্বনের উপস্থিতি সম্পর্কে জানতে পারে মানুষ। এই অঞ্চলের অনেক এলাকায়ই নদী ও উপত্যকায় প্রাকৃতিকভাবেই অপরিশোধিত তেল ও গ্যাসের নিঃসরণ স্বাভাবিক ঘটনা।
যিশু খ্রিস্টের জন্মের আগেই মানুষ নৌকাকে পানিনিরোধক করতে এবং গাঁথুনির কাজে বিটুমিন ব্যবহার করত। যেটি এক ধরনের ভারী পেট্রোলিয়াম।
১৯০৮ সালে পশ্চিম ইরানের একটি সুপরিচিত প্রাকৃতিক তেলের উৎস থেকে আধুনিক যুগের প্রথম তেলের সন্ধান পাওয়া যায়। ১৯৫০ এবং ১৯৬০-এর দশকে, যখন তেল ও গ্যাসের অনুসন্ধান ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়, তখন এটি স্পষ্ট হয়ে যায় যে, বিশ্বের আর কোনো অঞ্চলেই এত বিশাল প্রাকৃতিক সম্পদের মজুদ নেই। তবে বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলেও তেল ও গ্যাস আবিষ্কার হয়েছে।
যেমন রাশিয়ার পশ্চিম সাইবেরিয়া এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের পারমিয়ান বেসিনে তেল ও গ্যাসের মজুদের সন্ধান পাওয়া গেছে। তবে এগুলোর কোনোটিই পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের মজুদ অথবা অপরিশোধিত তেল ও গ্যাসের উচ্চ উৎপাদন হারের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারে না। যেটি এই অঞ্চলকে ইউনিক বা অনন্য করে তুলেছে।
ভূতাত্ত্বিক অবস্থান
পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল এমন একটি স্থানে অবস্থিত, যেখানে দুটি বিশাল টেকটোনিক প্লেট মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়।
এই দুই প্লেট হলো দক্ষিণ-পূর্বে অ্যারাবিয়ান প্লেট এবং পূর্ব ও উত্তরে ইউরেশীয় প্লেট। এই সংঘর্ষ প্রায় ৩৫ মিলিয়ন বা সাড়ে তিন কোটি বছর ধরে চলছে। এর ফলে তৈরি হয়েছে এক গতিশীল ভূপ্রকৃতি। যেখানে ভূগর্ভের তীব্র তাপ এবং চাপে শিলাস্তরগুলো দুমড়ে-মুচড়ে গেছে এবং রূপান্তরিত হয়েছে। উপসাগরের দুই তীরের ভূতাত্ত্বিক গঠন একেবারেই ভিন্ন।
ইরানের দিকে ১৮০০ কিলোমিটার জুড়ে জাগরোস পর্বতমালা যেটি ওমান উপসাগর থেকে তুরস্ক সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত। আল্পাইন-হিমালয় পর্বত ব্যবস্থার অংশ হিসেবে গত ৬০ মিলিয়ন বা ছয় কোটি বছরে ইউরেশিয়ার সঙ্গে আফ্রিকা, আরব ও ভারতের সংঘর্ষের ফলে এই ভাঁজ পড়া ও ফাটলযুক্ত জাগরোস পর্বতমালার সৃষ্টি।
উপসাগরের আরব উপকূলের শিলাগুলোতে এ ধরনের পরিবর্তন বা ভাঙন দেখা যায়নি।
এর পরিবর্তে প্লেটগুলোর সংঘর্ষে তৈরি হওয়া প্রবল চাপে ভূগর্ভের গভীরে থাকা শক্ত ও কঠিন শিলাস্তর (বেইজমেন্ট রক নামে পরিচিত), বেঁকে গেছে। এর ফলে তৈরি হয়েছে বিশাল গম্বুজাকৃতির কাঠামো, যা কয়েক ডজন বা শত শত বর্গকিলোমিটার জুড়ে বিস্তৃত।
পারস্য উপসাগরের নিচে রয়েছে একটি অববাহিকা, যেটি জাগরোস পর্বতমালার উত্থানের ফলে ক্ষয়ে যাওয়া পলি দিয়ে ভরাট হয়েছে। এই অববাহিকার গভীর অংশে এমন উচ্চ তাপমাত্রা এবং চাপ ছিল; যা তেল ও গ্যাস তৈরির জন্য প্রয়োজন। সংক্ষেপে বলতে গেলে এই অঞ্চলের ভূতাত্ত্বিক পরিবেশ বড় পরিসরে হাইড্রোকার্বন উৎপাদন এবং সংরক্ষণ করে রাখার জন্য খুবই উপযোগী।
অপরিশোধিত তেল উৎপাদনকারী শিলা
সামুদ্রিক জীব যেমন জুওপ্ল্যাঙ্কটন এবং ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটনের জৈব পদার্থ থেকে ক্রুড বা অপরিশোধিত তেল ও গ্যাস তৈরি হয়।
এই উপাদানগুলো প্রথমে কাদামাটিসমৃদ্ধ চুনাপাথর এবং অন্যান্য শিলার স্তরে ঘনীভূত হয় এবং পরে উচ্চ তাপমাত্রা ও চাপের সংস্পর্শে আসে।
যখন কোনো শিলায় অন্তত ২ শতাংশ জৈব পদার্থ থাকে, তখন সেটিকে তেল ও গ্যাস উৎপাদনের জন্য উচ্চমানের সোর্স রক বা শিলার উৎস হিসেবে ধরা হয়। বিশেষ করে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল এই ধরনের শিলাস্তরে সমৃদ্ধ। এর কিছু স্তর অত্যন্ত পুরু এবং জৈব পদার্থে সমৃদ্ধ।
আরব উপসাগরীয় উপকূলের হানিফা ও তুওয়াইক শিলাস্তর এর উদাহরণ, যা প্রায় ২০০ থেকে ১৪৫ মিলিয়ন বা ২০ কোটি থেকে ১৪ দশমিক ৫ কোটি বছর আগে জুরাসিক যুগে গঠিত। একইভাবে ইরানের খুজেস্তান শিলাস্তরটি প্রায় ১৪৫ থেকে ৬৬ মিলিয়ন বা ১৪ দশমিক ৫ কোটি থেকে ৬ দশমিক ৬ কোটি বছর আগে ক্রিটেসিয়াস যুগে তৈরি। এই শিলাস্তরগুলোতে জৈব পদার্থের পরিমাণ ১ শতাংশ থেকে ১৩ শতাংশ পর্যন্তÑ এমনকি কোথাও কোথাও এর চেয়েও বেশি।
তেল ও গ্যাস মজুদের গঠন
এই অঞ্চলের ভাঁজ পড়া ও ফাটলযুক্ত শিলাস্তর এবং গম্বুজাকৃতির কাঠামো হাইড্রোকার্বন আটকে রাখা ও সংরক্ষণের জন্য খুবই উপযোগী।
জাগরোস পর্বতমালার এই বাঁকগুলো চমৎকার গঠনের জন্য ভূতাত্ত্বিকদের কাছে বেশ পরিচিত, যা স্যাটেলাইট ছবিতেও স্পষ্টভাবে দেখা যায়। এখানে কয়েকশ বিলিয়ন ব্যারেল তেল এবং কয়েক ট্রিলিয়ন ঘনমিটার গ্যাস মজুদ রয়েছে।
পারস্য উপসাগরের তেল ও গ্যাসক্ষেত্রের মানচিত্রের দিকে তাকালে দেখা যায়, উত্তর-পশ্চিম থেকে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে লম্বাটে বা সসেজের মতো দেখতে অনেকগুলো কাঠামো রয়েছে, যা এখানকার বিশাল ও বাঁকানো ভূপ্রকৃতির প্রতিফলন।
দক্ষিণ ইরান থেকে উত্তর-পূর্ব ইরাক পর্যন্ত বিস্তৃত এই কাঠামোগুলোর মধ্যে বিভিন্ন আকারের শত শত খনি বা রিজার্ভার রয়েছে। আরব প্লেটের বিশাল গম্বুজাকৃতির কাঠামোতে তেল ও গ্যাসের বিশাল মজুদ তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সৌদি আরবের ঘাওয়ার তেলক্ষেত্র, এটি বিশ্বের বৃহত্তম তেলক্ষেত্র। এখান থেকে ৭০ বিলিয়ন ব্যারেলেরও বেশি ক্রুড বা অপরিশোধিত তেল উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। একইভাবে সাউথ পার্স-নর্থ ডোম গ্যাসক্ষেত্র থেকে অন্তত ৪৬ বিলিয়ন ঘনমিটার গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। এটা শক্তির দিক থেকে ২০০ বিলিয়ন ব্যারেলেরও বেশি তেলের সমান। এই অঞ্চলের প্রধান রিজার্ভ শিলা হলো চুনাপাথর। এই পাথরের কিছু অংশ প্রাকৃতিকভাবেই দ্রবীভূত হয়ে গেছে, যেটি তেল ও গ্যাসের প্রবাহকে সহজ করে। জাগরোস খনিগুলোতে ভূতাত্ত্বিক প্লেটগুলোর সংঘর্ষের ফলে সৃষ্ট ফাটল দিয়ে তেল ও গ্যাস চলাচল করে।
সৌদি আরবের ঘাওয়ার তেলক্ষেত্রের আরব-ডি স্তর এবং জাগরোস সমভূমির সামারিটান চুনাপাথরই এ ধরনের উচ্চমানের রিজার্ভ শিলার উদাহরণ, যা শত শত বা এমনকি হাজার হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে আছে। পৃথিবী বা মহাসাগরের আর কোথাও এই স্কেলে ভূতাত্ত্বিক কাঠামো দেখা যায় না, যা পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের পেট্রোলিয়াম ভূতত্ত্বকে অনন্য ও অতুলনীয় করে তুলেছে।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
এসব কারণের সম্মিলিত প্রভাবে পৃথিবীর মাত্র ৩ শতাংশ ভূভাগের নিচে বিশ্বের প্রায় অর্ধেক তেল এবং ৪০ শতাংশ গ্যাস মজুদ রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার মতে, এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে উৎপাদন চলার পরও এই অঞ্চলে আরও বিশাল তেলের ভান্ডার আবিষ্কৃত হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে।
সংস্থাটির ২০১২ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অ্যারাবিয়ান পেনিনসুলা এবং জাগরোস পর্বতমালায় এর আগে আবিষ্কার হওয়া তেল, গ্যাসের বাইরেও আরও প্রায় ৮৬ বিলিয়ন ব্যারেল তেল এবং ৯ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ঘনমিটার গ্যাস থাকতে পারে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে ২০০০ এবং ২০১০-এর দশকে উদ্ভাবিত হরাইজন্টাল ড্রিলিং এবং ফ্র্যাকচারিংয়ের মতো প্রযুক্তির মাধ্যমে উৎপাদন আরও বাড়ানো সম্ভব।
সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের তেলক্ষেত্রগুলোতে এই পদ্ধতিগুলো পরীক্ষা করা হচ্ছে। তবে এই পদ্ধতিগুলো কতটা সফল হবে সেটি বলার সময় এখনও আসেনি।
যদিও গবেষণা বলছে, এর মাধ্যমে উৎপাদন আরও বাড়তে পারে।